E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

সুচিত্রা-স্মরণে রবীন্দ্রগান

প্রথম গান ‘প্রথম আদি তব শক্তি’। মূল গান ‘প্রথম আদি শিবশক্তি’ ভেঙে সোহিনীতে বেঁধেছিলেন রবীন্দ্রনাথ এ গান।

সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:৩৮
অনুষ্ঠানে শিল্পীরা।

অনুষ্ঠানে শিল্পীরা।

গত ১৯ সেপ্টেম্বর রবীন্দ্রগানের কিংবদন্তি শিল্পী সুচিত্রা মিত্রের জন্মদিন উপলক্ষে কলকাতার রাজ্য সঙ্গীত আকাদেমিতে আয়োজিত হয়েছিল রবীন্দ্রগান এবং পাঠে সঙ্কলিত একটি অনুষ্ঠান। আয়োজক ‘আমরা ক’জন’— সুচিত্রা মিত্রের কাছে গানের পাঠ এবং সান্নিধ্য পাওয়া শিল্পীদের একাংশ। অনুষ্ঠানের শুরু ‘আজি এ আনন্দসন্ধ্যা সুন্দর বিকাশে’ গানে। তেওড়া তালে পুরবী-নিবদ্ধ ভাঙাগান। মূল গান ‘বহুর বজাও বন্‌শী’। গানটি সমবেত কণ্ঠে সুন্দর ভাবে পরিবেশিত হয়। মূল পর্ব শুরুর আগে রবীন্দ্রনাথের ‘শাপমোচন’ থেকে অংশবিশেষ পাঠ করেন অমানিতা সেন ও সুরজিৎ সেন।

‘আজি তোমায় আবার’ শীর্ষক মূল পর্বের আয়োজনে মোট ২৪টি গানের পরিবেশনা ছিল। সঙ্গে পাঠ। অঞ্জলি ভট্টাচার্য ও সুরজিৎ সেনের পাঠ মূলত গানগুলির নির্মিতি বিবরণ এবং সুচিত্রা-সান্নিধ্যের চুম্বক-কথার। যে গানগুলি নির্বাচন করা হয়েছিল এই আয়োজনে, তা প্রধানত রবীন্দ্রনাথের ভাঙাগান।

প্রথম গান ‘প্রথম আদি তব শক্তি’। মূল গান ‘প্রথম আদি শিবশক্তি’ ভেঙে সোহিনীতে বেঁধেছিলেন রবীন্দ্রনাথ এ গান। সুরফাঁকতালের ধ্রুপদাঙ্গ গানটি সমবেত কণ্ঠে পরিবেশিত হয়। পরের গান ‘আমারে কর জীবনদান’ গাইলেন মনীষা বসু। মূল গান ‘ইয়া জগ ঝুঠ’। চৌতাল-নিবদ্ধ শঙ্করা। পরের গান চৌতাল-নিবদ্ধ, গুর্জরী টোড়ি আশ্রিত ধ্রুপদাঙ্গ ‘প্রভাতে বিমল আনন্দে’। মূল গান ‘নাদ নগর বসায়ে’। গাইলেন শুভ্রা সাহা। পরে সমবেত কণ্ঠে পরিবেশিত হল ‘নূতন প্রাণ দাও, প্রাণসখা’। নাচারি টোড়িতে বাঁধা ধামার। মূল গান ‘সোতন মদ মাত’। পরের গানটিও নাচারি টোড়িতে বাঁধা— ‘আজি এনেছে তাঁহারি আশীর্বাদ’। ঝাঁপতালে বাঁধা গানটি পরিবেশন করলেন মধুমিতা গঙ্গোপাধ্যায়। ‘হে মন, তাঁরে দেখো’ পরের গান। রূপক-বিলাবলে বাঁধা গানটি তৈরি হয়েছিল ‘এ মনকে আঁখ’ ভেঙে। গাইলেন রূপা ঘোষ।

পরবর্তী গান ‘আলোয় আলোকময় করে’। ভৈরব-নিবদ্ধ, তাল তেওড়া। গাইলেন অর্পিতা গঙ্গোপাধ্যায়। সমবেত কণ্ঠে পরিবেশিত হল ‘আমার প্রাণে গভীর গোপন মহা-আপন সে কি’। বৃন্দাবনি সারং, তেওড়া। শুভ্রা সাহা গাইলেন ‘আমারেও করো মার্জনা’। মিশ্র যোগিয়ার ঝাঁপতাল। মধুমিতা গঙ্গোপাধ্যায় গাইলেন ‘আমি হেথায় থাকি শুধু গাইতে তোমার গান’। পরজ-বসন্তে বাঁধা, তাল তেওড়া। এই গানের পরে অঞ্জলি ভট্টাচার্য ও অর্পিতা গঙ্গোপাধ্যায়ের দ্বৈত কণ্ঠে পরিবেশিত হল ভাঙা গান ‘বহে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা’— নিশাসাগ বা লচ্ছাসার বিলাবলে বাঁধা, ঝাঁপতাল। মূল গান তুলসীদাসের দেবীস্তূতি ‘দুসহ দোষ-দুখ দলনী’।

মূল গান ‘তনু মিলন দে’ অবলম্বনে শ্রী-নিবদ্ধ তেওড়ায় রবীন্দ্রনাথ বেঁধেছিলেন ‘কার মিলন চাও বিরহী’। গাইলেন শ্রাবণী চট্টোপাধ্যায়। ‘আর কত দূরে’— তেওড়া তালে হাম্বীর-কেদারায় বাঁধা গানটি পরিবেশিত হল সমবেত কণ্ঠে। পরের গান ‘আমার বিচার তুমি করো তব আপন হাতে’— কেদারা-নিবদ্ধ তেওড়া তালের গান। গাইলেন মৌসুমী ঘোষ। ‘কী ভয় অমৃতধামে’ পরিবেশিত হল সমবেত কণ্ঠে। মূল গান ‘নিডর ডর’, শঙ্কর-বিভাসের আঙ্গিকে বাঁধা ঝাঁপতালের গান। রূপা ঘোষ গাইলেন ‘ডুবি অমৃতপাথারে’— চৌতাল ললিতে বাঁধা অজ্ঞাত রচনা অনুসৃত। পরের গান ‘শক্তিরূপ হেরো’— চৌতালে ইমনকল্যাণ-নিবদ্ধ ভাঙা গান। মূল গান ‘সপ্ত সুর তিন গ্রাম’। পরিবেশিত হল সমবেত কণ্ঠে।

‘মধুর রূপে বিরাজ’ গাইলেন মৌসুমী ঘোষ। তিলক-কামোদে বাঁধা ঝাঁপতাল। মূল গান ‘কৌন রূপ বনে হো’ অনুসৃত। এর পরে ‘আজি বহিছে বসন্তপবন’ পরিবেশিত হল সমবেত কণ্ঠে। বাহার-নিবদ্ধ তেওড়া তালের ভাঙা গান। মূল গান ‘আজু বহত বসন্তপবন’। ‘মুরলীধুন শুনি’ অবলম্বনে রবীন্দ্রনাথের কাফি-ঝাঁপতালে বাঁধা ‘চরণধ্বনি শুনি তব’ পরিবেশন করলেন অর্পিতা গঙ্গোপাধ্যায়। এর পরে মধুমিতা গঙ্গোপাধ্যায়, রূপা ঘোষ ও মৌসুমী ঘোষ পরিবেশন করলেন ‘নিবিড় ঘন আঁধারে’— নবতালে সাহানা-নিবদ্ধ গান। শুভ্রা সাহা গাইলেন ‘শূন্য হাতে ফিরি, হে নাথ’— কাফিতে বাঁধা সুরফাঁকতালের ভাঙা গান। মূল গান ‘রুমঝুম বরখে’। ‘তব প্রেমসুধারসে মেতেছি’ বেহাগগন্ধি পরজে বাঁধা খেয়াল-অঙ্গের ভাঙা গান। মূল গান ‘কারি কারি কমরিয়া’। গাইলেন মনীষা বসু। শেষ গান ‘বিপুল তরঙ্গ রে’ পরিবেশিত হল সমবেত কণ্ঠে। ভীমপলশ্রীতে বাঁধা তেওড়াবদ্ধ গানটি ‘নাচত ত্রিভঙ্গ’ অনুসরণে রচিত।

মূল পর্বের আয়োজনের ২৪টি গানই শ্রুতিসুন্দর এবং স্পষ্ট উচ্চারণ-বিভূষিত। কোনও ক্ষেত্রেই মূল গান গাওয়া হয়নি এবং ভাঙা গান হওয়ার দায়ে মূল গানের মার্গচলনও আরোপিত হয়নি। এই সূত্রেই রবীন্দ্রসৃষ্টির অমিয় সুবাস সুস্পষ্ট হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ নানা আঙ্গিকের গান থেকে যে ক’টি গান নিজের মতো করে বেঁধেছেন, তার প্রতিটিতেই নানা রসায়ন নিয়েছেন। কখনও সুরের অনুসৃতি, কখনও ভাবের। কিন্তু প্রতি ক্ষেত্রেই তারা তাঁর গান হয়ে উঠেছে এবং সবার আগে হয়ে উঠেছে অভূতপূর্ব কাব্যগীতি। এ সন্ধ্যার আয়োজনে সেই বিজ্ঞান স্পষ্ট ভাবে তুলে ধরেছেন শিল্পীরা। পাশাপাশি, যাঁর জন্মদিন উপলক্ষে এই অনুষ্ঠান, তাঁর গায়কির সুঠাম ছটা ঘিরে থেকেছে আয়োজনের বহু শিল্পীর পরিবেশনায়। সব পরিবেশনাই সুন্দর। তবু তার মধ্যে শুভ্রা সাহার গাওয়া ‘প্রভাতে বিমল আনন্দে’ এবং ‘শূন্য হাতে ফিরি’, মৌসুমী ঘোষের ‘আমার বিচার তুমি করো’ ও ‘মধুর রূপে বিরাজ’, রূপা ঘোষের ‘ডুবি অমৃতপাথারে’, সমবেত কণ্ঠে ‘আজি বহিছে বসন্তপবন’ এবং ‘বিপুল তরঙ্গ রে’ বিশেষ ভাবে সমীহের দাবি রাখে। তালবাদ্যে সব্যসাচী চন্দ্র এবং সিন্থেসাইজ়ারে দেবাশিস ভট্টাচার্যের সঙ্গত সুন্দর ও যথাযথ।

অনুষ্ঠান

অন্নপূর্ণার চরিত্রে কনীনিকা ।

অন্নপূর্ণার চরিত্রে কনীনিকা ।

  • দেবীপক্ষের শুরুতে উত্তম মঞ্চে অনুষ্ঠিত হল সৈকত সামন্ত প্রযোজিত ও অঙ্গিকা নিবেদিত আগমনী আনন্দসন্ধ্যা। আনন্দধারা, গৌড়ীয় সুরেশ্বরী এবং নিক্কণ ডান্স অ্যাকাডেমির নিবেদন ওই সন্ধ্যার সুর বেঁধে দেয়। সৈকত সামন্তের ভাবনা ও নির্দেশনায় নৃত্যালেখ্য কল্যাণসুন্দরিকা মুগ্ধ করে দর্শককে। ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন অনির্বাণ মণ্ডল। অভিনেত্রী কনীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয়ে অন্নপূর্ণা, সৈকত সামন্তের ভদ্রকালী, পারমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সতী, নির্মাল্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিব, শুভজিৎ কুশ দাসের কালভৈরব, দীপায়ন ঘোষের দক্ষ প্রজাপতি আর হৃদয় ভক্তের বীরভদ্র বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন অর্পণ মল্লিক। এই অনুষ্ঠানের সহ-প্রযোজক ছিল সেঞ্চুরি প্লাই ও প্যাটন।
  • শকুন্তলা পার্ক ছায়া কালচারাল সোসাইটির উদ্যোগে এবং কল্যাণী রায় মেমোরিয়াল ট্রাস্টের সহযোগিতায় বেহালায় অনুষ্ঠিত হল দু’দিনের শাস্ত্রীয় সঙ্গীত সম্মেলন। প্রথম দিনের উদ্বোধনী শিল্পী ছিলেন বিশেষ ভাবে সক্ষম (দৃষ্টিহীন) আদিত্য নির্মল। তিনি প্রথমে রাগেশ্রী এবং পরে একটি চতুরঙ্গ পরিবেশন করেন। অর্ণব ভট্টাচার্য সরোদে ঝিঁঝোটি ও গোরখ কল্যাণ বাজান। পম্পা মুখোপাধ্যায় গাইলেন কলাবতী, দেশ এবং পিলু। বাঁশিতে সুদীপ চট্টোপাধ্যায় পেশ করলেন কৌশিক ধ্বনি এবং তিলক কামোদ রাগ। শেষে ভৈরবী ঠুমরি। প্রথম দিনে তবলা সহযোগিতায় ছিলেন রাজনারায়ণ ভট্টাচার্য এবং সুপ্রিয় রায়। হারমোনিয়ামে সুরজ শর্মা। সঞ্চালনায় সুজাতা গঙ্গোপাধ্যায়। দ্বিতীয় দিনে অনুষ্ঠান শুরু হয় অনুপমা হালদারের নজরুলগীতি, ভজন এবং বাংলা রাগপ্রধান গান দিয়ে। এর পর দেবার্ঘ্য রায়ের কণ্ঠসঙ্গীতে পুরিয়া কল্যাণ এবং রাগ মেঘ। সেতারে সপ্তর্ষি হাজরা সংক্ষিপ্ত পরিবেশনায় বাজান রাগ সাহানা এবং পিলু বারওয়া। শেষ শিল্পী কৌশিক ভট্টাচার্যের নিবেদন ছিল প্রথমে মিঁয়া মল্লার ও শেষে একটি কাজরী। এ দিনের অনুষ্ঠানে তবলায় ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ হালদার, অরবিন্দ ভট্টাচার্য এবং পিনাকী চক্রবর্তী। হারমোনিয়ামে দিলীপ কুমার বিশ্বাস। সঞ্চালনায় অর্ঘ্য ঘোষাল।


এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Cultural Program

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy