Advertisement
E-Paper

লোকটা ছিল অন্য কেউ

ডা ক্তার গজানন তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। চেম্বারে রোগীদের সামনেই ধেই ধেই করে নেত্য শুরু করলেন। আর মুখে বলতে লাগলেন— আমার তখনই বোঝা উচিত ছিল। লোকটা অন্য কেউ। ‘অন্য কেউ’ মানে মানুষ নয়। ভূত! কিন্তু হঠাত্‌ কী ভাবেই বা একটা লোককে ভূত বলে সন্দেহ করা যায়। দেখতে আর পাঁচটা মানুষের মতোই। কথা বলছে স্বাভাবিক। তবে লোকটা একটু বেশি বিনয়ী ছিল।

শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৭ জুন ২০১৫ ০০:০৩
ছবি: ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য

ছবি: ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য

ডা ক্তার গজানন তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। চেম্বারে রোগীদের সামনেই ধেই ধেই করে নেত্য শুরু করলেন। আর মুখে বলতে লাগলেন— আমার তখনই বোঝা উচিত ছিল। লোকটা অন্য কেউ। ‘অন্য কেউ’ মানে মানুষ নয়। ভূত! কিন্তু হঠাত্‌ কী ভাবেই বা একটা লোককে ভূত বলে সন্দেহ করা যায়। দেখতে আর পাঁচটা মানুষের মতোই। কথা বলছে স্বাভাবিক। তবে লোকটা একটু বেশি বিনয়ী ছিল। কিন্তু এর জন্যে তো আর তাকে ভূত ভাবা যায় না। উফ্, অসহ্য! এমন ভাবতে ভাবতে ফের হঠাত্‌ চেঁচিয়ে উঠলেন— কোনও মানে হয়! লোকটাকে দাঁতটা পরিয়ে দিয়ে বললাম, যান, সামনে আয়নায় গিয়ে দেখুন কেমন লাগছে আপনাকে দেখতে।
গজানন দাঁতের ডাক্তার। বহু রকমের মডার্ন কাজ শিখে এসেছেন বিদেশ থেকে। সবাই সে জন্য ওঁকে সম্মানও করেন। বেশ ভিড় হয় চেম্বারে। দারুণ রোজগারও। দাঁতের ডাক্তারদের রোজগার ভাল। হবেই তো। ভগবান মানুষকে সবই দিয়েছেন মাত্র দু-একটা করে। দুটো চোখ, দুটো কান, দুটো হাত, দুটো পা। আর দাঁত? বত্রিশটা! ভাবা যায়! কিন্তু একটা লোক গোটা একটা ডেনচার লাগিয়ে চেম্বার থেকে উধাও হয়ে যাবে! কুড়ি হাজার টাকা দেবার কথা, সে কিনা একটা পয়সা না দিয়েই পালাল! কথাটা মনে পড়তেই ডাক্তার গজানন ফের জ্বলে উঠলেন তেলেবেগুনে। আর বলে উঠলেন ওই একটা কথা, ‘আমার তখনই বোঝা উচিত ছিল এ লোকটা অন্য কেউ, মানুষ না।’

লোকটা এসেছিল আর পাঁচটা রোগীর মতোই। নাম বলল, ‘ভোজন রসিক পুরকায়স্থ।’ নামটা শুনেই ডাক্তার হেসে ফেলেছিলেন। লোকটা কিছু মনে না করে বলল, হাসছেন যে!

— তোমার নামটা শুনে।

— ঠিক বলেছেন। আমার নাম রেখেছিল সোনামাসি। মায়ের বড় বোন। আমি নাকি জন্মেই আঙুল চুষতে শুরু করেছিলাম। তাই সোনামাসি বলেছিল, এ ছেলে অবশ্যই ভোজন রসিক হবে।

— তা তুমি কি সত্যিই ভোজন রসিক? গজানন জিজ্ঞাসা করলেন।

লোকটা বলল, আপনাকে লুকোব না। আমি সত্যিই খেতে খুব ভালবাসি।

— তা কী কী খাও?

— সব। যা পাই তাই।

গজানন বললেন, বটে! আর অমন খেয়ে খেয়ে নিজের দাঁতের মাথাগুলোও খেয়েছ। ডাক্তার তখন ভোজন রসিকের দাঁত পরীক্ষা শুরু করে দিয়েছেন। ডাক্তারের কথাটা শুনেই, ভোজন চমকে উঠে বলল, সব ক’টা গেছে?

ডাক্তার গজানন বললেন, হ্যাঁ, তোমার সব ক’টা দাঁতেই কেরিস।

— তার মানে?

ডাক্তার গজানন বললেন, তোমার টোটাল এক্সট্র্যাকশন লাগবে।

কথাটা শুনেই ভোজন হাসল।

ডাক্তারবাবু বললেন, হাসছ কেন?

— আগেও এক জন ডাক্তার একই কথা বলেছিেলন।

— তখন তুলিয়ে নিলেই পারতে?

— ঠিকই। কিন্তু বিশ্বাস করুন, পকেটে একটা পয়সাও ছিল না। তখন কাজ করতাম মিষ্টির দোকানে। আর রোজ মিষ্টি খেতাম চুরি করে...

— বলো কী?

— হ্যাঁ ডাক্তারবাবু, তখন জানতামই না বেশি মিষ্টি খেলে দাঁতে পোকা হয়। তবে তখন বেশি ভুগতে হয়নি। তার ক’দিন বাদেই তো...

ডাক্তার গজানন ফের কেঁপে উঠলেন। উফ্, লোকটা আমায় শুরুতেই বলেছিল কথাগুলো, অথচ আমি তার কোনও মানেই খুঁজে পাইনি। বলেছিল, ‘আগেও এক জন ডাক্তার বলেছিল’, ‘আগেও বলেছিল’ মানে কী? লোকটাকে কথাটা বলেছিল ওর আগের জন্মে। ও তখন বেঁচে। লোকটা বলেছিল, ‘আমি তখন কাজ করি মিষ্টির দোকানে।’ এই ‘তখন’ মানে কখন? যখন ও বেঁচে ছিল।

কথাগুলো সব মনে পড়ে যেতে লাগল ডাক্তারের। আসলে লোকটা বার বারই চেয়েছিল নিজেকে চেনাতে। কিন্তু আমি বুদ্ধু, তাই ওকে চিনতে পারিনি। গজানন মনে মনে ফের বলে উঠলেন— আমার তখনই বোঝা উচিত ছিল, লোকটা অন্য কেউ।

চেম্বারের দেয়ালে ঝোলানো আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল লোকটা, অথচ আয়নায় তার কোনও ছায়া পড়ল না! গজানন এ বার খেপে উঠলেন। আয়নায় ছায়া পড়ে না কাদের? একমাত্র ভূতেদের। ভূতেরা আয়নায় মুখ দেখতে পারে না। চুল আঁচড়ায় না। তাই ওদের চুলগুলো অমন খাড়া-খাড়া হয়। ভূতেরা মুখে পাউডার মাখে না, ক্রিম মাখে না, তাই ওদের মুখগুলো এমন দেখতে হয়। নোংরা, কুত্‌সিত।

আশ্চর্য! ভোজন রসিককে কিন্তু তেমন কুত্‌সিত দেখতে ছিল না। বলা চলে, লোকটাকে ভালই দেখতে। ছোটখাটো, হালকা চেহারা। গজানন অস্ফুট স্বরে বললেন, ভূতেদের মহিমা, বোঝে কার সাধ্যি! ভূত, তার মানে সুন্দর চেহারার হলেও হতে পারে।

ডাক্তার গজানন হঠাত্‌ খেপে উঠলেন, সুন্দর চেহারার হলেও তারা কখনওই সুন্দর স্বভাবের হয় না। এই যেমন ভোজন রসিকটা। দাঁত দেখানো হল। লোকটাকে পছন্দ হয়েছিল বলে গজানন সব ক’টা দাঁত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছিলেন, যত্ন করে।

ভোজন রসিক ছিল বড় খদ্দের। সব ক’টা দাঁত তুলতে খরচ চারশো টাকা। ওর মুখে ছিল টোটাল বারোটা কেরিস। তার পর ওকে দিতে হবে টোটাল ডেনচার। সেও বেশ দামি। একটা টোটাল ডেনচার বানাতে গজানন বিল করেন কুড়ি হাজারের। ভোজন রাজিও হয়েছিল কুড়ি হাজার দিতে। খালি জানতে চেয়েছিল, দাঁতটা পরে সব চিবিয়ে খেতে পারব তো?

— পারবে বইকি।

— মাংস, হাড়গোড় সব?

হ্যাঁ, সব। কোনও অসুবিধে হবে না। গজানন দিয়েওছিলেন ওকে বিদেশি মেটিরিয়ালের তৈরি ডেনচার। লোকটা কিনা সেই দাঁতটা পরে পালাল!

গজাননের এ বার যত রাগ গিয়ে পড়ল ওয়াশ বেসিনটার ওপর। এই ঘরটাকে চেম্বার করার জন্যে ভাড়া নিয়েই প্লাম্বারটাকে বলেছিলাম, ওয়াশ বেসিনটাকে সামনের দেওয়ালে ফিট করো। অথচ প্লাম্বারটা ওয়াশ বেসিনটাকে দিল ঘরের কোণে, পর্দার আড়ালে। আর তাতেই ঝঞ্ঝাট। উফ্! আজ সন্ধ্যায়, বারো দিন বাদে ভোজন রসিক এসেছিল ওর ডেনচারটা নিতে। আজই ছিল ডেলিভারির ডেট। গজাননের পকেটে পড়বে কড়কড়ে কুড়ি হাজার টাকা। সকাল থেকেই ছিলেন তোফা মেজাজে। ভোজন এল যথাসময়ে। ভোজন রসিকের দিকে তাকিয়েই গজানন মনে মনে বলে উঠলেন, কু-ড়ি-ই হাজার!

ডাক পড়তে ভোজন গিয়ে বসল ডেনটাল চেয়ারে। সব ক’টা দাঁত তুলে ভোজন রসিককে বিচিত্র দেখাচ্ছিল। যেন নব্বই বছরের বুড়ো। তার পর কিছুই তেমন খেতে পারছিল না। এই ক’দিনেই চেহারাটাও ভেঙে গিয়েছিল। ভোজনকে ডেকে গজানন বললেন, ‘পরো, তোমার নতুন দাঁত।’ ভোজন গোলাপজামুন গেলার মতন ডেনচার দুটোকে একে একে গিলে নিতেই তারা গিয়ে বসল ওর উপরের আর নীচের পাটির মেঝেতে। আর অমনি ভোজনের চেহারাটা পাল্টে গেল। ডাক্তার বললেন, চলো, তোমার চেহারাটা আয়নায় দেখিয়ে আনি। গজানন ভোজনকে নিয়ে ঢুকলেন পর্দার ওপারে, দেওয়ালের পিছনে। কিন্তু এ কী! ভোজন আয়নার সামনে দাঁড়াল। অথচ আয়নার ভেতরে তাকে দেখাই গেল না! ডাক্তার গজানন বললেন, এখানে লাইটটা বড় কম, তুমি বরং বাড়ি গিয়ে মুখের চেহারাটা দেখে নিয়ো।

কিন্তু এ কী! হাত ধুয়ে চেম্বারে ঢুকেই ডাক্তার গজানন আর কোথাও তাকে খুঁজে পেলেন না। লোকটা গেল কোথায়? আর সব রোগী বলল, কই, ওয়াশ-রুম থেকে লোকটা বেরোইনি তো! ডাক্তার গজানন দেখলেন, ডেন্টাল চেয়ারের নীচে তখনও পড়ে আছে এক জোড়া ছেঁড়া হাওয়াই চপ্পল। ওইটুকু বেঁটে-খাটো লোকটার পায়ের চটি জোড়ার দিকে তাকিয়ে ডাক্তার গজাননের মাথাটা কেমন ঘুরে গেল। নিজের চেম্বারটাকে ডাক্তারবাবুর ভীষণ অচেনা লাগল! খালি ডেন্টাল চেয়ার, মেঝেতে দুটো বিশাল মাপের চটি! ডাক্তারবাবু ঝপ করে চেয়ারে বসে পড়ে হাতল দুটোকে চেপে ধরলেন। ডাক্তার গজাননের মনে পড়ল, মানুষ নয়, অন্য কাউকে তিনি মুখের মধ্যে ডেনচার পরতে বলেছিলেন।

santanu bandyopadhyay story doctor ghost

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy