বলকে পোষ মানানোর অসামান্য জাদুতে তিনি কখনও ফুটবলের ঈশ্বর, কখনও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু— আর্জেন্টিনার মানুষের হৃদয়ে আজও অমলিন তাঁর উপস্থিতি। ফুটবল-রাজপুত্র মারাদোনার মতো বিস্ময়কর প্রতিভার জীবন, যেন ফুটবলের সঙ্গে তাঁর অবিচ্ছেদ্য প্রেমের কাহিনি। সুমিত ঘোষ
শেভ্রোলে ক্যামারো জ়েড-২৮ গাড়ির টেস্ট ড্রাইভ চলছে ক্যালিফোর্নিয়ার রাস্তায়। যিনি বিক্রি করবেন, স্টিয়ারিং ছেড়ে দিলেন ১৯ বছরের তরুণের হাতে। এ বার সম্ভাব্য নতুন মালিক চালিয়ে দেখবেন। মুহূর্তে যেন ঝড় উঠল। ইঞ্জিনের প্রবল গর্জনে মনে হল যেন ফর্মুলা ওয়ানে মাইকেল শুম্যাখারের গাড়ি ছুটছে। সাঁ সাঁ বেগে রাস্তার পাশের ল্যাম্পপোস্ট, গাছগাছালি অদৃশ্য হতে থাকল। কম্পিত বিক্রেতা কাকুতি-মিনতি করতে থাকলেন, “দয়া করে আস্তে চালান।” বিলাসবহুল গাড়ি নিয়ে তিনি যতটা না চিন্তিত, তার চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন নিজের জীবন নিয়ে।
বয়সে অনেক বড় আরও দু’জন গাড়ির পিছনের সিটে বসে। এঁদের এক জন আন্দ্রে ক্যান্টর। আর্জেন্টিনার বিখ্যাত ক্রীড়া পত্রিকা ‘এল গ্রাফিকো’-র জনপ্রিয় লেখক। অন্য জন স্টিয়ারিং হাতে থাকা সেই তরুণের এজেন্ট জর্জ সাইটার্জ়সপিলার। দু’জনেই বিক্রেতার অবস্থা দেখে হাসছেন। এ বার চালক ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনের সিটে বসা দু’জনের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, “ওকে বলে দাও আমি যদি ক্যামারো কিনি, তা হলে নিশ্চয়ই ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার বেগে হামাগুড়ি দেওয়ার জন্য কিনব না। আমাকে তো দেখে নিতে হবে, এই গাড়িটার আমার গ্যারাজে ঢোকার দম আছে কি না।”
বক্তার নাম? দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা। ওই কিশোর বয়স থেকেই গতি যাঁর সঙ্গী। যেমন ঝোড়ো হাওয়ার মতো এসেছিলেন, যেমন মাঠের মধ্যে রুদ্ধশ্বাস তুফান তুলেছিলেন তেমনই দ্রতগতিতে সব কিছু ফেলে রেখে চলে গেলেন! গত শুক্রবার ৬৬তম জন্মদিন গেল মারাদোনার। যে রকম আবেগ, শ্রদ্ধা, ভালবাসার বলয়ে তাঁকে এখনও ঘিরে রেখেছে আর্জেন্টিনা, অবিশ্বাস্য! দেখে মনে হবে, লোকটা চিরতরে কোথাও যায়ইনি। কোথাও একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন। দ্রুতই স্বমহিমায় ফিরবেন। বুয়েনস আইরেসের অভ্যন্তরে ভিলা ফিয়োরিতোর যে বস্তিতে তিনি বেড়ে উঠেছেন, সেই বাড়ির নামকরণ করা হয়েছে ‘ঈশ্বরের ঘর’। মৃত্যুর ছয় বছর পরেও একই রকম ধুমধামের সঙ্গে সেখানে এবং সর্বত্র তাঁর জন্মদিন পালিত হয়।
অনন্য প্রতিভা হিসেবে তাঁকে বর্ণনা করায় এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে আর্জেন্টিনার এক বিখ্যাত সাংবাদিক সঞ্চালককে শুধরে দিয়েছিলেন, “অনন্য প্রতিভা নয়, বলুন অনন্য প্রতিভার সংজ্ঞা যিনি নতুন করে লিখে দিয়েছেন, তাঁর নাম দিয়েগো মারাদোনা।” তেমনই এক প্রাক্তন ফুটবলার মাঝপথে থামিয়ে দিয়েছিলেন এক বিশেষজ্ঞকে, “মারাদোনা বল কন্ট্রোল করত বলবেন না। বলুন বলকে পোষ মানাত।” কী রকম পোষ মানাতেন তা শুনিয়েছেন মারাদোনার প্রাক্তন সতীর্থ জর্জ ভালদানো। বার্লিনে খেলতে গিয়েছে আর্জেন্টিনা। কোচ কার্লোস বিলার্দো দলকে বলেই চলেছেন, “আর্জেন্টিনার ফুটবলার মানে তার ধ্যানজ্ঞান সবই ফুটবল। বল ছাড়া তার জীবনই হয় না। সকাল, দুপুর, বিকেল, রাত্রি, সারাক্ষণ তার তো একটাই সঙ্গী— বল।” মারাদোনার বোধ হয় একদিন মনে হল, ঢের হয়েছে। তিনি কী করলেন? এক রাতে হোটেলের ঘর থেকে বেরোলেন বল নাচাতে নাচাতে। ওই ভাবে বল জাগলিং করতে করতে লিফ্টে উঠলেন, লিফ্ট থেকে বেরোলেন, ডাইনিং হলের দিকে এগোলেন। ডাইনিং টেবিলে বিলার্দো বসা। তাঁর দিকে একবার আড়চোখে তাকালেন বলটা মাটিতে পড়তে না দিয়ে, বল নাচাতে নাচাতে পাউরুটির টুকরো তুলে নিয়ে মুখে পুরে দিলেন! বিলার্দো উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে বলে উঠলেন, “সবাই দ্যাখো, এই কারণেই ও দিয়েগো মারাদোনা।”
এই ভালদানোই সবচেয়ে কাছাকাছি ছিলেন মেক্সিকো বিশ্বকাপে মারাদোনা সেই অমর গোলটি করার সময়। ‘হ্যান্ড অব গড’-এর চার মিনিট পরে যেটা করেন। ভালদানোর মুখে সেই গোলের বর্ণনাও একই রকম অমর হয়ে রয়েছে— “প্রথমে আমি ভেবেছিলাম, দিয়েগোর পাশাপাশি আমারও ছোটা দরকার কারণ ওর তো সাহায্য লাগতে পারে। সেই দৌড় আমি থামাইনি কিন্তু দ্রুতই আবিষ্কার করি, এই অভিযানে আমার ভূমিকা শুধুই দর্শকের। এটা দিয়েগোর ব্যক্তিগত অ্যাডভেঞ্চার। দিয়েগোর ব্যক্তিগত গোল। দিয়েগোর ব্যক্তিগত শিল্প প্রদর্শনী। আমরা সবাই দর্শক। মুগ্ধ হয়ে যে দেখতে পারছি, এটাই আমাদের সৌভাগ্য আর আমার পরম সৌভাগ্য কারণ থিয়েটারে সেরা সিটটা আমারই।” নিজেদের অর্ধে ধরা বলটা চুম্বকের মতোই সেঁটে থাকল তাঁর পায়ে। পিটার রিড তাঁকে ধরতে পারেননি দেখে মারাদোনা বুঝে যান, ইংল্যান্ড রক্ষণ কাঁপতে শুরু করেছে। এর পর ক্যালিফোর্নিয়ার রাস্তায় ক্যামারোর গর্জন করে ওঠার মতোই গতি তুললেন তিনি। বাঁদিকে মোচড়, গ্যারি স্টিভেন্স কেটে গেলেন। পরের ঝটকায় পতন টেরি বুচারের। ফেনউইক কনুই দিয়ে গুঁতিয়ে ফেলে দিতে গেলেন কিন্তু বজ্রকে কেউ থামাতে যায়! টেরি বুচার মরিয়া চেষ্টা করলেন। সব বৃথা। এর পর শিলটনকেও বোকা বানিয়ে বল জড়িয়ে দিলেন জালে।
রুদ্ধশ্বাস এক চলমান কাব্যের সামনে অসহায় ইংল্যান্ড। ম্যানেজার ববি রবসন, যিনি ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন, তিনিই শতাব্দীর সেরা গোল নিয়ে বলেছিলেন, “আমাদের কোনও ভুল ছিল না। শৃঙ্খলায় অভাব ছিল না। শুধু এক জন ফুটবলারের অবিশ্বাস্য একক দক্ষতার কাছে আমরা হেরে গিয়েছি। যে কি না আমাদের অর্ধেক দলকে ধরাশায়ী করে সেরা গোলটা করে গেল।” তার আগে যখন ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলটি হয়, ইংল্যান্ডের অনেকেই বুঝতে পেরেছিলেন মাথা নয় হাত ব্যবহার করেছেন মারাদোনা। এই রবসনই সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে ভেবেছিলেন, লাইন্সম্যান নিশ্চয়ই পতাকা তুলবেন, রেফারি গোল নাকচ করবেন। কিন্তু সকলে সেন্টার লাইনের দিকে যাচ্ছে দেখে চমকে ওঠেন এবং মাথায় হাত দিয়ে চিৎকার করতে থাকেন, এটা কী করে গোল দিয়ে দিল? ওদিকে আর্জেন্টিনার কোচ বিলার্দো উল্লাস করতে থাকেন। চতুর মারাদোনা হাত দিয়ে গোলটা করে কাউকে অন্য কিছু ভাবার সুযোগই দেননি। এখনকার মতো প্রযুক্তির সাহায্য না থাকার সম্পূর্ণ ফায়দা তোলেন তিনি। এমন নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে উৎসব করার ভঙ্গিতে দৌড়তে থাকেন যে, অনেকে ভাবতেই পারেনি, হাত দিয়ে গোল করেছেন! বুঝলেও কি কিছু এসে-যায় মারাদোনার? টেরি বুচারের সঙ্গে তো তাঁর বন্ধুত্ব ছিল। বুচার মাঠের মধ্যেই জিজ্ঞেস করেছিলেন দিয়েগোকে, গোলটা কি হাত দিয়ে করেছ? মারাদোনা হাল্কা হেসে আঙুল দিয়ে মাথার দিকে দেখান। ডোপ কেলেঙ্কারির কালিমালিপ্ত বেন জনসনকে নিয়ে এসে কেরিয়ারের শেষদিকে ট্রেনিং করেছিলেন! জনতার প্রতিক্রিয়ার তোয়াক্কা করলে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন? নিজে ডোপিংয়ের দায়ে বিশ্বকাপ থেকে নির্বাসিত হওয়ার পরেও!
মেক্সিকো বিশ্বকাপ চিহ্নিত হয়ে আছে মারাদোনা-কাপ হিসেবে। অথচ একাধিক সমস্যায় জর্জরিত হয়ে মেক্সিকোয় খেলতে গিয়েছিলেন তিনি। বান্ধবী ক্রিস্টিয়ানা সিনাগ্রা যে সন্তানসম্ভবা এবং তিনি সেই সন্তানের বাবা, সেই খবর প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। মেক্সিকোয় পৌঁছনোর পরে নাপোলি থেকে ক্রিস্টিয়ানার এক বন্ধুর ফোন যায় ক্লাব আমেরিকা হোটেলে। যেখানে আর্জেন্টিনা দল উঠেছিল। পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়, তিনি যদি পিতৃত্বের কথা স্বীকার না করেন তা হলে সংবাদপত্রে ফলাও করে ক্রিস্টিয়ানার বিবৃতি প্রকাশ করা হবে। কোচ বিলার্দো ছিলেন মারাদোনার ত্রাতা। আটাত্তরের বিশ্বকাপে লুই সিজ়ার মেনোত্তি তাঁকে বাদ দেন। তা নিয়ে সারাজীবন রক্তক্ষরণ ঘটেছে তাঁর মধ্যে। বিলার্দোর চাণক্যের চাল ছিল, ছিয়াশি বিশ্বকাপে মারাদোনাকে অধিনায়ক বানিয়ে দেওয়া। কোচ নিযুক্ত হওয়ার পরেই বার্সেলোনায় উড়ে গিয়ে মারাদোনাকে অধিনায়ক হওয়ার প্রস্তাব দেন বিলার্দো। এবং, মেক্সিকো বিশ্বকাপে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেন নতুন অধিনায়ককে। না হলে খুব যে ঐক্য ছিল আর্জেন্টিনা দলের মধ্যে, তা নয়। ড্যানিয়েল পাসারেল্লার সঙ্গে সম্পর্ক ভাল ছিল না মারাদোনার। ১৯৭৮ বিশ্বকাপে মেনোত্তি যখন মারাদোনাকে বাদ দেন, সামান্য আপত্তিও তোলেননি তখনকার অধিনায়ক পাসারেল্লা। শোনা যায় মেক্সিকো বিশ্বকাপের আগে একবার মারাদোনার ঘরে উন্মত্ত পার্টি চলছিল, তার মাঝে দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ে পাসারেল্লা চিৎকার করে ওঠেন, “তুমি যদি আর্জেন্টিনার অধিনায়কই হবে তা হলে অধিনায়কের মতো আচরণ করছ না কেন?” দলাদলি, ব্যক্তিগত সমস্যাকে দূরে সরিয়ে মারাদোনার মেক্সিকো অভিযান তাই থেকে যাবে অমর মহাকাব্য হিসেবে।
আর তাঁর বলকে পোষ মানানোর কাহিনি ঘুরতে থাকবে লোকের মুখে-মুখে। গ্যারি লিনেকার যেমন একটি গল্প প্রায়ই শোনান। একটি প্রীতি ম্যাচ খেলতে গিয়ে সকলে হাল্কা মেজাজে আড্ডা দিচ্ছেন। মারাদোনা এলেন। হাই-হ্যালো করে বল নাচাতে শুরু করে দিলেন। তার পর ওই ভাবে বল নাচাতে নাচাতে মাঠের মাঝখানে চলে গেলেন। এর পর কিক করে বলটাকে আকাশের দিকে পাঠিয়ে দিলেন প্রায় পঞ্চাশ ফুট উচ্চতায়। লিনেকার বলছেন, “বলটা একদম সোজাসুজি পঞ্চাশ ফুট উচ্চতায় উপরে উঠল আর ঠিক একই সরলরেখা ধরে নীচে নেমে এল।” নীচে নেমে এসে সোজা এসে মারাদোনার পায়ে যেন চুম্বকের মতো সেঁটে গেল। মারাদোনা বলটা রিসিভ করে ফের একই ভাবে কিক করে পঞ্চাশ ফুট উপরে পাঠিয়ে দিলেন। আবার পোষ মানা বল নেমে এসে চুম্বকের মতো আটকে গেল তাঁর পায়ে। অন্তত আট-দশ বার তিনি এ রকম করলেন। দেখে সকলে বিস্মিত!
যদিও বল জাগলিং নতুন কিছু নয় তাঁর কাছে। স্কুলে যাওয়ার সময় কমলালেবু বা কাগজ দিয়ে তৈরি গোলাকার বস্তু নাচাতে নাচাতে রাস্তা দিয়ে হাঁটতেন। এমনকি রেলের ব্রিজ় পেরনোর সময়েও সেই কৃত্রিম বলকে মাটিতে পড়তে দিতেন না। বাবা মাঝির কাজ করতেন, মা বাড়ি-বাড়ি কাজ করে আয় করতেন। ছোটবেলায় মারাদোনা বড়লোকদের জন্য গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে কিছু পয়সা উপার্জন করতেন। রাস্তায় পড়ে থাকা লোহালক্কড় জড়ো করে বিক্রি করে দু’-চার পয়সা জুটত। ফেলে দেওয়া সিগারেটের প্যাকেট তুলে নিয়ে তার থেকে রাংতা বার করে দোকানে ফেরত দিলে বিনিময়ে হয়তো কিছু পাওয়া যেত। জীবনের রাস্তায় ঘোর দুর্যোগের মধ্যেও কখনও ছাড়েননি একটা জিনিস— ওই গোলাকার বস্তুটি। তিন বছর বয়সে প্রথম ফুটবল উপহার পান কাকার কাছ থেকে। সেই যে সারারাত জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়েছিলেন, কখনও সেই বন্ধন আলগা করেননি। বল ও মারাদোনার সম্পর্ক ছিল পোষ্য ও প্রভুর মতো।
পোষ্য বলটা নিশ্চয়ই তাঁকে খুঁজে বেড়ায়, পায় না আর মন খারাপ করে ভাবে— প্রভু কোথায় চলে গেলেন! পায়ের জাদু দেখানোর জন্য আর তো ডাকেন না!