E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

মাফিয়া সমাচার

আর এক বার বাগসিকে বোঝাতে চায় সে, এই বলে কোনও মতে কার্টেলকে নিরস্ত করে নিউ ইয়র্কে ফিরে এল সে।

সুপ্রিয় চৌধুরী

শেষ আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০২৬ ০৭:৪৯
ছবি: অমিতাভ চন্দ্র।

ছবি: অমিতাভ চন্দ্র।

পূর্বানুবৃত্তি: আর্নল্ড ‘দ্য ব্রেন’ রথস্টেইনের কাছ থেকে ল্যানস্কি ও লুসিয়ানো অভিজাত জীবনযাপনের আদবকায়দা শেখে। রথস্টেইন, লুসিয়ানো, বাগসি ও ল্যানস্কি মিলে গড়ে তোলে ‘দ্য মার্ডার ইনকর্পোরেট’, অর্থের বিনিময়ে হত্যার অপরাধচক্র। মদ্যপানের উপর নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে মায়ার জুয়ার ব্যবসায় মন দেয়। সারাগোটায় বাগসিকে সঙ্গে নিয়ে বিশাল ক্যাসিনো গড়ে তোলে এবং লুসিয়ানো ছোট বেশ্যালয়গুলিকে বিলাসবহুল মধুচক্রে পরিণত করে। ঘুষ ও পেশিশক্তির সাহায্যে তাদের কারবার ছড়িয়ে পড়ে। এর পর ল্যানস্কি কিউবায় বাতিস্তার আমন্ত্রণে গিয়ে জুয়ার আড্ডা, ক্যাসিনো, নাইটক্লাব ও বেশ্যালয়ের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু ১৯৫৯ সালে ফিদেল কাস্ত্রো ও চে গেভারার বিপ্লবে মাফিয়াদের কিউবা ছাড়তে হয়। কিউবা পুনর্দখলের আশাও ব্যর্থ হয়। অন্য দিকে বাগসির উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনে ল্যানস্কি ও লুসিয়ানো বিরক্ত হয়ে ওঠে। লস এঞ্জেলেসে স্বাধীন ভাবে কাজ করার প্রস্তাবে ল্যানস্কি সম্মতি দেয়। সেখানে একটি পুরনো হোটেল কিনে বাগসি বিলাসবহুল ক্যাসিনো গড়ে তোলে এবং বিপুল সাফল্য পায়। এর পর তার লক্ষ্য নেভাডার এক ছোট শহরতলি।

শহরতলিটির নাম লা ভেগা। এখানে সে গড়ে তুলতে চায় তার বহুকাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের সৌধ। জগৎসেরা ভাগ্যক্রীড়া নগরী! এ রকম একটা রুক্ষ, ঊষর মরুভূমিবেষ্টিত এই অজ পাড়াগাঁও যে এক দিন হয়ে উঠতে পারে পৃথিবীর ‘নাম্বার ওয়ান গ্যাম্বলিং অ্যান্ড অ্যামিউজ়মেন্ট হাব’, এ ধরনের চরম দুঃসাহসিক স্বপ্ন সেই কবে দেখতে পেরেছিল এক জনই। মবস্টার বেঞ্জামিন ‘বাগসি’ সেগল।

বাগসির আত্মবিশ্বাসের উপর অগাধ আস্থা দেখিয়েছিল কার্টেলের অন্য কর্তারা। বাগসি আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ায় প্রচণ্ড খুশিও হয়েছিল তারা। ফলে ১৯৪৩ সালে বাগসি যখন লা-ভেগায় ‘এল-কোর্তে’ নামে পুরনো একটা সরাইখানাকে খোলনলচে বদলে বিলাসবহুল হোটেল-কাম-ক্যাসিনো বানানোর কাজে হাত লাগাল, তখন লুসিয়ানো ব্যক্তিগত ভাবে সেখানে ৬০,০০০ ডলার বিনিয়োগ করল এবং বন্ধুকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ভাবে কাজ করার সুযোগ দিয়ে ‘স্লিপিং পার্টনার’ হিসেবে থেকে গেল। আগের বারের মতো এ বারও বিপুল সাফল্যের মুখ দেখল বাগসির এই প্রকল্পও।

একের পর এক সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে ‘এল-কোর্তে’-র পাশেই ‘ফ্ল্যামেঙ্গো’ নামে আরও আধুনিক একটা ক্যাসিনো-কাম-নাইটক্লাব নির্মাণের কাজে হাত লাগাল বাগসি। কার্টেলের পরামর্শ না মেনে সহচরী ভার্জিনিয়ার প্ররোচনায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থব্যয় করতে শুরু করল। আগের দুই প্রকল্পের সম্পূর্ণ লভ্যাংশও লাগিয়ে দিল এই নতুন প্রকল্পের পিছনে, অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা পর্যন্ত না করে। বেহিসাবি জলের মতো অর্থব্যয় আর বাগসির বেপরোয়া, বিশৃঙ্খল জীবনযাপন— এই দুইয়ের ফলে এ বার বিপুল লোকসানের মুখে পড়ল নতুন প্রকল্প।

হাভানায় সিন্ডিকেটের মিটিংয়ে বিষয়টা নিয়ে কার্টেলের বাকি সদস্যদের তীব্র প্রশ্নবাণের সম্মুখীন হতে হল ল্যানস্কিকে। বিপুল এই লোকসানের কারণ একমাত্র বাগসি। তার চূড়ান্ত অবিবেচক মনোভাব আর ঔদ্ধত্যই এই লোকসানের কারণ, আর এর জন্যই তাকে এই মুহূর্তে ‘অন হুক’ (খতম) করা উচিত।

সিন্ডিকেটের এই প্রবল চাপের মুখেও বন্ধুকে বাঁচানোর একটা শেষ চেষ্টা করল মায়ার। আর এক বার বাগসিকে বোঝাতে চায় সে, এই বলে কোনও মতে কার্টেলকে নিরস্ত করে নিউ ইয়র্কে ফিরে এল সে। বাগসির সঙ্গে যোগাযোগ করে অবিলম্বে ফ্ল্যামেঙ্গো বেচে লোকসানের হাত থেকে বাঁচার প্রস্তাব দিল মায়ার। কিন্তু মরীচিকার পিছনে দৌড়নোর জেদ বাগসির নিয়তিতে পরিণত হয়েছে তত দিনে। সদম্ভে এবং চরম ঘৃণাভরে মায়ার, বলা ভাল, সমগ্র কার্টেলের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল সে। মায়ার হাভানায় ফিরে এল চূড়ান্ত হতাশ হয়ে। সব খুলে বলল লুসিয়ানো আর বাকি কার্টেল-সদস্যদের। আর সেই মুহূর্তেই দস্তখত হয়ে গেল ‘লিকুইডেট বাগসি’ হুকুমনামায়।

এর পর বাকিটুকু ছিল স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। ১৯৪৭ সালের মে মাস। মরুশহরের এক তীব্র গরমের দুপুরে তার বাংলোয় ড্রইংরুমে শীতাতপ যন্ত্রের আরামে নরম সোফায় আধশোয়া বাগসি। সামনে খোলা হিমশীতল বিয়ারের বোতল। ঠিক এই সময় জানলার কাচ গুঁড়িয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটে আসা স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্রের গুলির শব্দ! মুহূর্তে বুলেটে বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে সোফাতেই লুটিয়ে পড়ল বাগসি সেগলের নিথর দেহটা। দ্য ড্রিমার অব লা-ভেগা!

কাজ সেরে ধীরেসুস্থে বাংলো চত্বর ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল অজ্ঞাতপরিচয় আততায়ীরা। আর অত্যন্ত আশ্চর্যজনক ভাবে বাগসির দেহরক্ষীদের কারও দেখা মেলেনি সে দিন ঘটনাস্থলে।

বাগসি হত্যার পিছনে রয়েছে মায়ার ল্যানস্কির হাত— দীর্ঘ সময় ধরে অন্ধকার দুনিয়া আর পুলিশমহলে খুব ঘোরাফেরা করেছিল কথাটা। যদিও বাস্তবে প্রমাণিত হয়নি কিছুই। খোঁজ মেলেনি অজ্ঞাতপরিচয় আততায়ীদেরও। তবে ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যেই মায়ামি, নিউ ইয়র্কে মায়ারের ঘনিষ্ঠ দুই সহচর, মরিস রোজেন আর গাস গ্রিনবাম আসে ফ্ল্যামেঙ্গোয়। “আজ থেকে লা-ভেগায় ফ্ল্যামেঙ্গো-সহ বাগসির সব ব্যবসা কার্টেলের হাতে”— কথাটা খুব স্পষ্ট ভাবে ক্যাসিনোর সমস্ত কর্মচারীকে জানিয়ে দেয় তারা। যদিও বাগসি হত্যার পিছনে তার জড়িত থাকার অভিযোগ আজীবন অস্বীকার করে গিয়েছিল মায়ার।

প্রৌঢ়ত্বের মাঝামাঝি ধর্মকর্মে মতি হয়েছিল মায়ারের। ইহুদিদের চিরস্বপ্নের দেশ ইজ়রায়েল। গোঁড়া ধর্মবিশ্বাসী ইহুদি পরিবারের সন্তান মায়ার তার চিরকাঙ্ক্ষিত ‘প্রফেট’স ল্যান্ড’-এ যাতায়াত শুরু করেছিল নিয়মিত। ক্রমেই পরিচিতি বাড়ছিল ধনী ব্যবসায়ী আর উচ্চপদস্থ সরকারি মহলে। ইহুদি মাত্রই ইজ়রায়েলে স্বাগত এবং সে দেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য, এই ভরসায় বুক বেঁধেছিল মায়ার। কিন্তু বাদ সাধল দেশের সংবাদমাধ্যম। তারা আমেরিকায় মায়ারের সঙ্গে অপরাধ জগতের সম্পর্ক নিয়ে খবরের কাগজের প্রথম পাতায় বড় বড় সব কলাম লিখতে শুরু করল নিয়মিত। ইতিমধ্যে মার্কিন গোয়েন্দা বিভাগও একের পর এক মামলা রুজু করতে আদা-জল খেয়ে লাগল এই কুখ্যাত মবস্টারের নামে। তবে ইজ়রায়েলে মায়ারের নাগরিকত্ব প্রাপ্তির পথে মূল বাধা হয়ে দাঁড়াল একটি নাম। নির্বাচনে জয়লাভ করে দেশের প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসলেন শ্রীমতী গোল্ডা মায়ার। এমনিতেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির আঙিনায় আমেরিকার ‘ব্লু আইড বয়’ হিসেবে পরিচিত ইজ়রায়েল। তার মধ্যে আবার শ্রীমতী মায়ারের সঙ্গে আমেরিকান মিত্রদের সম্পর্কটা ইজ়রায়েলের বিগত প্রধানমন্ত্রীদের তুলনায় অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ। দায়িত্বভার গ্রহণ করেই তিনি ল্যানস্কিকে এ দেশ থেকে বিতাড়নের নির্দেশ দিলেন।

স্বপ্নের মাটিতে আর ফেরা যাবে না, অন্য দিকে হন্যে হয়ে তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে এফবিআই। এমতাবস্থায় গ্রেফতারি এড়াতে প্রথমে সুইৎজ়ারল্যান্ডের জুরিখ, অতঃপর লাতিন আমেরিকার দেশে দেশে পালিয়ে বেড়াতে লাগল ল্যানস্কি। তবে শেষরক্ষা হল না। প্যারাগুয়ে আশ্রয় দিতে অস্বীকার করল এই মব বসকে। শুধু তাই নয়, সরকারি একটি বিশেষ বিমানে চড়িয়ে সোজা মায়ামির পানামা সিটি এয়ারপোর্টে পাঠিয়ে দিল ল্যানস্কিকে। সেখানে তাকে ‘অভ্যর্থনা’ জানাতে লাউঞ্জ ঘিরে অপেক্ষা করছিল এফবিআই-এর বিশেষ তদন্তকারী দল।

প্রচুর নামী আইনজীবী নিয়োগ করে, নির্ধারিত বিপুল পরিমাণ জামিন অর্থের বিনিময়ে অধিকাংশ মামলা থেকে আপাত রেহাই মিললেও, একটি অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ মামলায় এগারো মাসের কারাবাস হয় এই ইহুদি বাহুবলীর।

মুক্তি পাওয়ার পর নিউ ইয়র্কে নিজের বাসস্থানে ফিরে আসে মায়ার। কিন্তু দীর্ঘ আইনি লড়াই, কোর্টের দৌড়ঝাঁপ, দেশ থেকে দেশে পালিয়ে বেড়ানোর ধকল, ‘প্রমিসড ল্যান্ড’-এ আর কখনওই ফিরতে না পারার হতাশা, সব কিছু প্রচণ্ড প্রভাব ফেলেছিল সত্তরোর্ধ্ব এই কার্টেল লর্ডের শরীরে। স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছিল খুব দ্রুত। অবশেষে ১৫ জানুয়ারি ১৯৮৩ সাল, নিউ ইয়র্কের হাড় কাঁপানো শীতসন্ধ্যায় চিরঘুমে চলে যায় মার্কিন অপরাধদুনিয়ারএই মহাতারকা।

অগুনতি অপরাধের নায়ক। কুখ্যাত মব বস। গোঁড়া ধর্মবিশ্বাসী। অজস্র প্রতিবন্ধকতা, প্রতিকূলতা সত্ত্বেও কার্টেলে ড্রাগের কারবার ঢুকতে দেয়নি কখনও। সর্বদা কেতাদুরস্ত পোশাকআশাক আর আদব কায়দায় চূড়ান্ত আধুনিক। অতি মার্জিত কথাবার্তা। রুচিসম্মত ব্যবহার। নিজের মর্জিতে বাঁচা। সব মিলিয়ে ‘সুভদ্র, অভিজাত একই সঙ্গে দুর্ধর্ষ এক মাফিয়া ডন’ হিসেবে আমেরিকার অপরাধজগতে চিরখ্যাত হয়ে গেছে মায়ার ল্যানস্কির নাম।

ঝুপড়ি থেকে হোয়াইট হাউস

স্যাম জিয়ানকানা। জন্ম ১৯০৮ সালে, পশ্চিম শিকাগোর চরম দারিদ্রপূ্র্ণ এক ইটালিয়ান ‘ঘেটো’ বা ঝুপড়ি বস্তিতে। স্যামের দু’বছর বয়সে মারা যায় ওর মা। বছরখানেক পর ফের বিয়ে করে স্যামের বাবা আন্তোনিও জিয়ানকানা। প্রতিদিন নিয়ম করে ছেলেকে বেধড়ক ঠ্যাঙানো, আর থেকে থেকেই উপোসে রাখাটা রুটিনের মধ্যেই পড়ত স্যামের বাবা আর সৎমায়ের। সঙ্গে অকথ্য গালিগালাজ ও অভিসম্পাত বর্ষণ। এ রকম পারিবারিক পরিবেশে মাত্র ১৪ বছর বয়সেই ইশকুলের পাট চুকিয়ে দেয় স্যাম। যোগ দেয় এলাকার অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেপুলেদের অপরাধচক্র, কুখ্যাত ‘ফর্টিটু’ গ্যাং-এ, এবং অনতিবিলম্বেই প্রসিদ্ধি অর্জন করে দু’টি বিষয়ে। প্রথমত, সম্পন্ন গৃহস্থের অনুপস্থিতিতে তার বাড়ি ঢুকে সর্বস্ব হাতিয়ে সরে পড়া। দ্বিতীয়ত, গাড়ি চুরি। এই দুই কাজেই স্যামের বিশ্বস্ত সঙ্গী ছিল নিজের তৈরি এক টুকরো প্যাঁচানো তারের একটা ‘মাস্টার কি’। দরজার তালা বা গাড়ির লক, খুলে ফেলতে স্রেফ এক মিনিট! ওই কিশোর বয়সেই পাকা ড্রাইভারও হয়ে উঠেছিল স্যাম।

ক্রমশ

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
digital essay

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy