E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

বুড়ো গাছ

শৌনকের বৌ হয়ে এ বাড়িতে আসার পর থেকে দ্বৈতা কিন্তু ওই গাছে খুব বেশি আমের ফলন দেখেনি; হয়তো বয়সের ভারেই ধীরে ধীরে নিষ্ফলা হয়ে যাচ্ছে।

অরুণাভ দত্ত

শেষ আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০২৬ ০৭:৫৪
ছবি: প্রসেনজিৎ নাথ।

ছবি: প্রসেনজিৎ নাথ।

বুড়ো আমগাছটাকে নিয়ে খুব জ্বালা হয়েছে দ্বৈতার। বাড়ির দোতলায় তার ঘর। সেই ঘরের পশ্চিমে জানলার ঠিক বাইরেইআমগাছটা। প্রাচীরের মতো খোলা আকাশটাকে একেবারে আড়াল করে রেখেছে। দ্বৈতার বিয়ের পর এতগুলো বছর কেটে গেল, তার ছেলে ঋজু প্রাইমারি ছেড়ে হাই স্কুলে ভর্তি হল, তবু ওই গাছ এখনও পর্যন্ত দ্বৈতাকে ঘরের জানলা দিয়ে আকাশ দেখতে দিল না।

দ্বৈতার শ্বশুরমশাই এক বার বলেছিলেন, “এ বাড়ি হওয়ার আগে থেকে আমগাছটা ওখানে আছে। দেখতে দেখতে এই পরিবারের তিন প্রজন্ম দেখে ফেলল, ফলও দিয়েছে প্রচুর।”

শৌনকের বৌ হয়ে এ বাড়িতে আসার পর থেকে দ্বৈতা কিন্তু ওই গাছে খুব বেশি আমের ফলন দেখেনি; হয়তো বয়সের ভারেই ধীরে ধীরে নিষ্ফলা হয়ে যাচ্ছে।

আমগাছটা এ বাড়ির ঠিক পিছনে। যেন এক প্রকাণ্ড বুড়ো দৈত্য। চওড়া গুঁড়িটা রাস্তার দিকে সামান্য হেলে পড়েছে। মগডাল বাড়ির ছাদ ছাড়িয়ে উঠে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে ছাতার মতো। বাঁকাচোরা, শ্যাওলা ধরা পুরনো ডালপালার একাংশ ঝুঁকে পড়েছে দ্বৈতার ঘরের জানলার কাছে। গাছের ঘন পাতার আচ্ছাদন আলো-বাতাস আটকে ঘরটা অন্ধকার আর গুমোট করে রেখেছে।

দ্বৈতা জানলার সামনে দাঁড়িয়ে গাছটাকে বিরক্ত দৃষ্টিতে লক্ষ করে। বুড়ো মানুষের হাতের চামড়ার মতো রুক্ষ, ফাটাফাটা বাকল। বৃদ্ধ শরীরে জেঁকে বসা রোগের মতো বাকলের গভীর খাঁজে খাঁজে জমে আছে শ্যাওলা, পিঁপড়ের বাসা। এ বাড়ির কাছেপিঠে গাছের অভাব নেই। আমগাছটার তুলনায় তারা অনেকটাই তরুণ। ফল-ফুলও দেয় ভাল। কাজেই মেরুদণ্ড বেঁকে যাওয়া, নিঃস্ব, নিঃসঙ্গ বুড়ো গাছটাকে তারা যেন ধর্তব্যের মধ্যেই আনে না বলে মনে হয় দ্বৈতার। গাছটাকে দেখে তাই দ্বৈতার রাগও হয়, মায়াও হয়। মনে পড়ে যায় নিজের বৃদ্ধ বাবার কথা, যার অবস্থা অনেকটা ওই গাছেরই মতো—সঙ্গীহীন, অসহায়।

দ্বৈতার বাবা শুভঙ্করবাবু পেশায় ছিলেন ইলেকট্রিশিয়ান। একটা কারখানায় দৈনিক মজুরিতে মোটর আর প্যানেল সারাতেন। তাঁর পিএফ, পেনশন ছিল না। বুড়ো বয়সে তাঁর ক্ষয়ে যাওয়া হাঁটু আর কোমর সারা জীবন ঠায় দাঁড়িয়ে কাজ করার খেসারত দিচ্ছে; সঙ্গে সুগ্রীব দোসর হয়েছে সিওপিডি। মাসখানেক আগে তাঁর স্ত্রী প্রভা মারা গেছেন। সত্তরোর্ধ্ব অসুস্থ শুভঙ্করবাবু সাবেক জীর্ণ দোতলা বাড়িটায় এখন একা থাকেন। তাঁর লাঠি বলতে মেয়ে আর জামাই।

মা বেঁচে থাকতে দ্বৈতার চিন্তা ছিল না। এখন পরিস্থিতি অন্য রকম। প্রতিদিন বাঁশদ্রোণীর শ্বশুরবাড়ি থেকে নবদ্বীপের বাপের বাড়িতে যাতায়াত করে বাবার দেখাশোনা করা দ্বৈতার পক্ষে অসম্ভব। কারণ শাশুড়ির অবর্তমানে দ্বৈতার ঘাড়ে গোটা সংসারের দায়িত্ব। সাতসকালে উঠে শৌনকের ব্রেকফাস্ট আর অফিসের লাঞ্চ, ছেলেকে নাইয়ে-খাইয়ে ন’টার মধ্যে স্কুলবাসে তুলে দিয়ে এসে ঘরদোর পরিষ্কার; আবার বিকেলে গান শেখানোর ক্লাস, তার পর ছেলের হোমওয়ার্ক, রাতের রান্না। শৌনক ছুটির দিনে যতটা পারে দ্বৈতাকে সাহায্য করে, কিন্তু সে আর কতটুকু।

এখানে কাজের মেয়ের খুব আকাল। কাউকে পাওয়া গেলেও সে ক’দিন কাজ করার পর আকাশছোঁয়া মাইনে চেয়ে বসে, কখনও না জানিয়ে কাজ ছেড়ে দেয়। দু’-তিন বার এমন হওয়ার পর দ্বৈতা বিরক্ত হয়ে আর কাউকে রাখেনি।

এত ব্যস্ততার মধ্যেও দ্বৈতার মন পড়ে থাকে তার নবদ্বীপের বাড়িতে, যেখানে তার বাবা ঘরবন্দি জীবন কাটান। বাড়ির কাছাকাছি একটা হোম কিচেন থেকে তাঁর দু’বেলার খাবার আসে। শৌনকই ব্যবস্থা করেছে। এমনকি শুভঙ্করবাবুর পরিচর্যার জন্য সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত এক জন আয়াও রেখেছে। তার নাম সাধনা। শুভঙ্করবাবুকে সে চোখে চোখে রাখে, বাথরুমে নিয়ে যায়, সময় করে ওষুধ খাওয়ায়, বিকেলে ছাদে পায়চারি করায়।

তবে সাধনাকে নিয়ে শুভঙ্করবাবুর বিস্তর অভিযোগ। সে নাকি খুব উগ্র পারফিউম মাখে, সারা দুপুর শুভঙ্করবাবুর ঘরে টিভি চালিয়ে বস্তাপচা সিরিয়াল দেখে, মুড়ির কৌটো আর বেসিনের কল ভাল করে আঁটে না, আবার শুভঙ্করবাবু কিছু বলতে গেলে চ্যাটাং চ্যাটাং কথা শোনায়। শুভঙ্করবাবুর অভিযোগ দ্বৈতা চুপচাপ শুনে যায়, কোনও উচ্চবাচ্য করে না। কারণ সে জানে, বাবা বরাবরই খুঁতখুঁতে।

ছোট থেকেই দ্বৈতা মা-ভক্ত। রগচটা স্বভাবের জন্য বাবা কোনও দিনই তার প্রিয় ছিল না। তার পর বড় হয়ে সে যখন উপলব্ধি করল যে, বাবার কাছে তাঁর স্ত্রী-সন্তানের চেয়ে বোনেরা ও ভাগনেরাই বেশি আপন, তখন থেকে বাবাকে আরও বেশি অপছন্দ করতে শুরু করেছিল।

চিরকাল বিনা পারিশ্রমিকে দ্বৈতার পিসিদের বাড়ির ইলেকট্রিকের কাজ, বড় পিসেমশাইয়ের বেহাত হয়ে যাওয়া জমি পুনরুদ্ধার, ছোট পিসির বাড়ির লক্ষ্মীপুজোর বাজার কিংবা তার বাড়িতে মিস্ত্রি খাটানো— সব কিছুর দায়িত্ব বাবাকে আগ বাড়িয়ে নিতে দেখেছে দ্বৈতা। অথচ তার মায়ের সমস্যার বেলায় বাবা নির্বিকার। মা যদি কখনও বলতেন যে, বোনেরা স্রেফ শুভঙ্করবাবুর মাথায় হাত বুলিয়ে কাজ আদায় করে নেয়, তা হলেই বাড়িতে কুরুক্ষেত্র হত!

দ্বৈতা ভুলতে পারে না যে, তার মাধ্যমিক পরীক্ষা মিটলে তাকে দার্জিলিং নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে, শেষে ঘুরতে যাওয়ার টাকাটা ছোট বোনকে ফ্রিজ কেনার জন্য ধার হিসেবে দিয়ে দিয়েছিলেন শুভঙ্করবাবু। তার পর থেকে বাবার দেখানো স্বপ্নগুলোকে মনেপ্রাণে অলীক বলেই বিশ্বাস করেছে সে।

এখন বোনেরা তাঁর কোনও খোঁজখবর নেয় না বলে শুভঙ্করবাবু যখন আক্ষেপ করেন, তখন দ্বৈতার মুখ ফস্কে বেরিয়ে যায়, “ওরা তোমার উপকারের প্রতিদান দিচ্ছে!” শুনে শুভঙ্করবাবু শিশুর মতো ঠোঁট ফুলিয়ে জামার হাতায় চোখের জল মোছেন। দেখে দ্বৈতার ভিতরটাও মুচড়ে ওঠে যন্ত্রণায়।

বুড়ো আমগাছটার পিছনেই দ্বৈতার প্রতিবেশী রণজয় ঘোষালের বাড়ি। দুটো বাড়ির মাঝখানে পড়ে গিয়ে গাছটা দু’তরফেরই গলগ্রহ। গাছের পাতা ঝরে রণজয়দের ছাদের ড্রেনের মুখে আটকে যাওয়ায় বৃষ্টির জল ছাদে জমে থাকে। রণজয়ের স্ত্রী পাপিয়া ছাদ ঝাঁট দিতে এসে সেই নিয়ে গলা ফাটায়, “একটা বুড়ো আমগাছ, ফল-টল কিছু দেয় না, তাও বুকে ধরে রেখে দিয়েছে!”

দ্বৈতার মনে পড়ে, এক কালে এই গাছই ওদের কত প্রিয় ছিল। অনুমতি ছাড়াই ওরা নিজেদের ছাদ থেকে আঁকশি দিয়ে আম পেড়ে নিত। এমনকি ‘আমার গাছের আম’ বলে শ্বশুরবাড়িতে কিংবা অফিসে বিলিয়ে নাম কিনতেও ছাড়েনি রণজয়। কিন্তু এখন শৌনকদের জমিতে পাপিয়ার জঞ্জাল ফেলা নিয়ে দু’পক্ষের ঝগড়া হওয়ায় আমগাছটাও রণজয়দের শত্রু হয়ে গেছে।

পাপিয়ার চেঁচামেচিতে জেরবার দ্বৈতা শৌনককে বলে, “গাছটা কাটিয়ে ফেললে হয় না?”

“গাছটার সঙ্গে ছোট্টবেলার কত স্মৃতি জড়িয়ে... কাটিয়ে ফেলব বলছ?”

বুড়ো গাছটার প্রতি শৌনকের মায়া দ্বৈতার কাছে বিড়ম্বনা। তার ঘরে দুটো জানলা। একটার সামনে আলমারি থাকায় সেটা খোলা যায় না; অন্যটা খোলা না-খোলা দুই-ই সমান। দ্বৈতাকে দিনের বেলাতেও ঘরে আলো জ্বালতে হয়। আবার গোদের উপর বিষফোড়ার মতো গাছটার জন্য ঘরে পোকামাকড়ের উৎপাত বেড়েছে।

এ ঘর ছেড়ে দ্বৈতার যাওয়ারও উপায় নেই। কারণ একতলার দুটো ঘরই ভাড়াটেদের দখলে। দোতলায় তার শ্বশুর-শাশুড়ির ঘরে বেশ আলো-বাতাস ঢোকে, এমনকি সম্প্রতি বিধবা শাশুড়ি মারা যাওয়ায় ঘরখানি ফাঁকাই পড়ে আছে; কিন্তু ঋজু আজকাল ওই ঘরে থাকতে ভয় পায়, কান্নাকাটি করে। আবার দ্বৈতাও ছেলেকে ছেড়ে থাকবে না। তার কষ্ট দেখে শৌনক ঘরে এসি লাগিয়েছে। কিন্তু দ্বৈতার চাই খোলা আকাশ, রোদ্দুর, বাইরের হাওয়া।

দু’দিন হল ঋজু জন্ডিসে ভুগছে। এরই মধ্যে সাধনা দ্বৈতাকে ফোন করে বলেছে, “আমি কাজ ছেড়ে দেব দিদি।”

“কেন? কী হয়েছে?”

“মেসোমশাই কিছুতেই কোনও ওষুধ খাচ্ছেন না। জোরাজুরি করলে আমায় গালিগালাজ করছেন। নতুন ইনহেলারটা মনের ভুলে বালিশের তলায় রেখেছেন, তার পর খুঁজে না পেয়ে বলছেন, আমি নাকি ওটা চুরি করে বেচে দিয়েছি। আমার বংশটাই নাকি চোর! আপনি বরং ভাল বংশ দেখে কোনও আয়া খুঁজে নিন।”

দ্বৈতার তখন শিরে সংক্রান্তি। সে ভেবে পায় না যে, এখন অসুস্থ ছেলেকে সামলাবে, নাকি বাবার জন্য নতুন আয়া খুঁজতে বেরোবে। শুভঙ্করবাবুকে এ বাড়িতে এসে তার শাশুড়ির ঘরে থাকার প্রস্তাব দিয়েছিল দ্বৈতা। তিনি রাজি হননি। উল্টে আবদার করেছেন, “তোরা সবাই এখানে এসে থাক।”

“আর তোমার জামাইয়ের অফিস? ঋজুর স্কুল?”

শুনে শুভঙ্করবাবু অভিমান করে বলেছেন, “থাক! আমি একাই ভাল আছি। আর খবরদার! ফের যদি আয়া রাখিস, আমার মরা মুখ দেখবি!”

দ্বৈতা জানে যে, শুভঙ্করবাবুর জন্য ও বাড়িতে কোনও আয়ার টেকা মুশকিল। আবার তিনি একা থাকলে পাড়াপ্রতিবেশীরা বলতে ছাড়বে না যে, বিয়ের পর মেয়ে অসুস্থ বাবাকে দেখে না। তার উপর খবরের কাগজে এক অসহায় বৃদ্ধকে জখম করে তাঁর বাড়িতে ডাকাতির খবরটা পড়ার পর থেকে মনটা আনচান করছে তার।

ভিডিয়ো কল করার জন্য শুভঙ্করবাবুকে স্মার্টফোন কিনে দিয়েছিল শৌনক। কিন্তু বস্তুটি সম্পর্কে শুভঙ্করবাবু একেবারেই অনভিজ্ঞ। হামেশাই ফোন সাইলেন্ট করে ফেলেন। ফলে মেয়ের ফোন এলে জানতে পারেন না। দ্বৈতার উদ্বেগ বাড়ে। বার বার শুভঙ্করবাবুর প্রতিবেশীকে ফোন করে বাবার ফোন ঠিক করে দিতে বলতে তার সঙ্কোচ হয়।

রাতদুপুরে হঠাৎ শুভঙ্করবাবুর ফোন এলে রিংটোনটা অ্যাম্বুল্যান্সের সাইরেনের মতো লাগে দ্বৈতার। সে ফোন ধরে ভয়ার্ত গলায় “বাবা! বাবা!” বলে চিৎকার করে যায়। ফোনের ওপারে তখন নাক ডাকার শব্দ। দ্বৈতা বুঝতে পারে যে, বাবা ভুল করে মেয়ের নম্বর ডায়াল করে ঘুমিয়ে পড়েছেন।

কখনও পিসতুতো দাদা দ্বৈতাকে ফোন করে মেজাজ দেখিয়ে বলে, “মামার কি ভীমরতি হয়েছে? প্রতিদিন কাজের সময় আমাকে ফোন করে গুষ্টির খবরাখবর নেয়!”

দ্বৈতার মুখে আর কথা জোগায় না। শুধু তার ক্লান্ত চোখ দুটো স্থির হয়ে থাকে খোলা জানলার বাইরে। মনে মনে ভাবে, ‘সবাই ঠিকই বলে, বুড়ো বয়সে এ ভাবে কষ্ট পাওয়ার চেয়ে…’। তার পরই দ্বৈতা লক্ষ করে যে, বাইরে আমগাছটা প্রাণ ভরে রোদ খাচ্ছে। তার পাতায় পাতায় বইছে বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছে।

‘আশা’ ওল্ড এজ হোমের প্রস্তাবটা নিয়ে অনেক ভেবেছে দ্বৈতা। ঋজুর ক্লাসমেট উজানের মা জায়গাটার সন্ধান দিয়ে বলেছিল, “আমার মাসির অবস্থাও ছিল একদম কাকাবাবুর মতো। একমাত্র ছেলে ফ্যামিলি নিয়ে আমেরিকায়। মেসো মারা গেছে বহুদিন, মাসি ওর ফ্ল্যাটে একা। কাজের লোক, আয়া, কাউকে তাঁর বিশ্বাস নেই। আবার মনে একা থাকার ভয়ও ষোলো আনা। তাই কাগজে ‘আশা’-র বিজ্ঞাপনটা দেখে নিজেই ঠিক করে যে, সেখানে থাকবে। সত্যিই জায়গাটা খুব ভাল। আমিও দেখতে গেছি কয়েকবার।”

হোমটা দ্বৈতার বাড়ি থেকে খুব দূরে নয়। থাকা-খাওয়া-চিকিৎসার পরিপাটি ব্যবস্থা। দেখেশুনে দ্বৈতা সন্তুষ্ট। একটা অ্যাডমিশন ফর্মও নিয়ে এসেছে। ফর্মটা দেখে শৌনক গম্ভীর মুখে বলল, “বাবা কিন্তু আমাদের ভুল বুঝবেন।”

“কিন্তু এ ভাবে আর কত দিন শৌনক?”

সে বার সন্ধে থেকে শুরু হয়েছে তুমুল ঝড়-বৃষ্টি। বাইরে ঝড়ের গর্জনের মধ্যে হঠাৎ একটা মড়মড় শব্দ শুনে চমকে ওঠে দ্বৈতা। সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমের বন্ধ জানলার কাচের বাইরে একটা আলোর ঝলকানি, পরক্ষণেই গোটা পাড়া অন্ধকার।

দুর্যোগ থামলে দেখা গেল, রাস্তার দিকে হেলে পড়া বুড়ো গাছটা ঝড়ের দাপটে শিকড়সুদ্ধ উপড়ে রাস্তার উপরেই পড়েছে। ছিঁড়ে গেছে ইলেকট্রিকের তার। দ্বৈতাদের বাড়ির কোনও ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

ভোরের দিকে বিদ্যুৎ দফতর আর পুরসভার লোকজন তৎপর হয়ে উঠল। জানলার বাইরে করাত আর মেশিনের শব্দের সঙ্গে সঙ্গে দ্বৈতা শুনতে পেল শৌনক বলছে, “ঝড়টা আসায় দেখছি তোমার শাপে বর হল।”

বেলা বাড়লে পশ্চিমের জানলাটা খুলতেই দ্বৈতা অবাক। চোখের সামনে খোলা আকাশ। জানলা দিয়ে হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকছে দিনের আলো। আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে প্রতিবেশীদের বাড়ি, স্কুলের বিল্ডিং, পাড়ার পুজোপ্রাঙ্গণ। পুজোর সময় ঘরে বসেই মণ্ডপ দেখতে পাওয়ার আনন্দে ভরে উঠছে দ্বৈতার মন।

ঋজু এখন সুস্থ। সেদিন তাকে স্কুলবাসে তুলে দিয়ে এসে শাড়ি বদলাচ্ছিল দ্বৈতা। হঠাৎ তার খেয়াল হল, পশ্চিমের জানলাটা আধখোলা রয়ে গেছে। আর সেই খোলা অংশ দিয়ে দ্বৈতার অর্ধনগ্ন শরীরটা চোখ দিয়ে বুভুক্ষুর মতো গিলে খাচ্ছে রণজয়দের ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা জোয়ান মিস্ত্রিটা।

কয়েক মুহূর্ত মাথার ভিতরটা বিলকুল শূন্য হয়ে গেছিল দ্বৈতার। পরক্ষণেই সে বিদ্যুদ্বেগে জানলার সামনে থেকে সরে গিয়ে দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়াল। তার গলা শুকিয়ে কাঠ। হাত-পায়ের পেশিগুলো অসাড়। মাথার ভিতর ঘুরপাক খাচ্ছে তার নিজেরই কণ্ঠস্বর, ‘ছিঃ! কী করে ভুলে গেলাম যে, জানলার বাইরে এ ঘরের আব্রুটা আর নেই!’

এখন পশ্চিমের জানলা খোলা দেখলেই দ্বৈতার বুক কাঁপে। সন্ধেবেলায় জানলা দিয়ে চারপাশের বাড়ির অন্ধকার ছাদগুলো দেখলে দ্বৈতার মনে হয়, যেন অনেক জোড়া চোখ নিঃশব্দে নজর রাখছে তাদের একান্ত পরিসরে। আবার বেলা দুপুর হলেই পশ্চিমের কড়া রোদ এসে তাতিয়ে দিচ্ছে ছাদ, ঘরের দেওয়াল, মেঝে। ২১-২২ ডিগ্রিতে এসি না চালালে ঘর ঠান্ডা হয় না। লাফিয়ে বাড়ছে ইলেকট্রিসিটি বিল, সঙ্গে শৌনকের রক্তচাপও।

সন্ধের মুখে জানলার কাছে দাঁড়িয়ে দ্বৈতা দেখছিল, আকাশের উত্তর-পশ্চিম কোণে মেঘ জমছে। খবরে বলেছে, আজ প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি হতে পারে। জানলার বাইরেটা বড্ড খালি-খালি লাগছে তার। এতকাল রোদের গনগনে তাপ, ঝড়ের দুরন্ত বেগ, সব বুক পেতে নিয়ে আমগাছটা এ বাড়ির ঢাল হয়ে ছিল— ঠিক যেন বাড়ির কর্তা।

জানলার উপর দেওয়ালে টাঙানো আছে দ্বৈতার বিয়ের ছবি। তার বিয়ের বেনারসির রং, সোনার কানপাশা, চিক কিংবা চুড়ের ডিজাইনের খুব তারিফ করেছিল তার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়রা। ছবিতে নিজের শাড়ি, গয়নাগুলো দেখতে দেখতে দ্বৈতার হঠাৎ মনে পড়ে যায় তার অষ্টমঙ্গলার দিনের একটা ঘটনা। সেদিন শুভঙ্করবাবুর অনুপস্থিতিতে দ্বৈতার মা নিজের ভাইয়ের কাছে গর্ব করছিলেন, “সারা জীবন শুনে এসেছি, মানুষটা গরিব, অপদার্থ, ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ায়। এখন সে-ই মেয়ের বিয়েতে ঢেলে খরচ করে সবার মুখ বন্ধ করে দিয়েছে। অথচ না এক পয়সা ধার করেছে, না হাত দিয়েছে আমার গয়নায়!” আড়ালে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল দ্বৈতা।

ঝড় উঠেছে। জানলা দিয়ে দমকা হাওয়া এসে এলোমেলো করে দিচ্ছে দ্বৈতার ঘর। পড়ার টেবিলে রাখা একটা বইয়ের ভিতর থেকে আলগা হয়ে ঝুলছে ‘আশা’-র অ্যাডমিশন ফর্মটা। দেখতে পেয়ে ঋজু বলে, “মা, কাগজটা যে উড়ে যাবে।”

খোলা আকাশের গায়ে চোখ রেখে দ্বৈতা উত্তর দেয়, “উড়ে যাক।”


এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
story Short Stories

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy