E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

দুই পরিচালকের চোখে দুই শিল্পী

বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের অন্তর্গত প্রশান্তি সত্যজিৎ রায়কে যেমন টেনেছিল, তেমনই রামকিঙ্করের অস্থির, প্রথাভাঙা শিল্পসত্তায় ঋত্বিক ঘটক খুঁজে পেয়েছিলেন আত্মার অনুরণন। দুই তথ্যচিত্র, দুই অগ্রজ শিল্পীর জীবনচিত্র কি আসলে দুই মহৎ চলচ্চিত্রকারেরই আত্মজীবনীর গোপন পৃষ্ঠা?

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০২৬ ০৮:০৯
ছবি: কুনাল বর্মণ।

ছবি: কুনাল বর্মণ।

বৈপরীত্যের কী অবাক করা বন্ধনী! এও এক অপরূপকথা! প্রায় অলৌকিক সমাপতন যে, চলচ্চিত্রস্রষ্টা সত্যজিৎ রায় ও ঋত্বিক ঘটক গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের প্রথম ভাগেই সহসা লিপ্ত হয়ে পড়েন দু’টি জীবনচিত্র নির্মাণে। সত্যজিৎ সম্পন্ন করেন বিশ্বভারতীর কলাভবনে তাঁর মাস্টারমশাই বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের উপর একটি অসামান্য তথ্যচিত্র ‘দি ইনার আই’ (১৯৭২)। তার ঠিক তিন বছর পর, ঋত্বিক ঘটক জীবনের অন্তিম স্বাক্ষর রেখে যান আপাত-অসমাপ্ত ‘রামকিঙ্কর’ পর্যবেক্ষণে। আইজ়েনস্টাইন এক বার বলেছিলেন, তাঁর নিসর্গচিত্রসমূহই চিত্রকর এল গ্রেকো-র শ্রেষ্ঠ আত্মপ্রতিকৃতি। আসলে সব মহৎ শিল্পীই শেষ পর্যন্ত যা করে থাকেন, তা হল অনিঃশেষ আত্মাবলোকন। কেন যেন মনে হয়, ইতিহাসের তরঙ্গভঙ্গে আমাদের দুই চলচ্চিত্রকার তাঁদের পূর্বজ স্রষ্টাদের দেখার ছলে এক ধরনের অন্তর্গমন বেছে নিয়েছিলেন। বিনোদবিহারী ও রামকিঙ্করের নিরিখে তাঁরা দু’জনেই কি নিজেদের স্বীকারোক্তি পেশ করেননি?

কেন রামকিঙ্করে আকৃষ্ট হয়েছিলেন ঋত্বিক ঘটক? এমন কি হতে পারে যে, সত্যজিৎ রায় অল্প কিছু দিন আগে বেছে নিয়েছিলেন বিনোদদাকে— যেখানে স্থিতির সুষমা; বিপ্রতীপে ঋত্বিক তাই কিঙ্করদাকেই সঙ্গে নিলেন তাঁর ফ্রেমে, গতির নৈরাজ্যে। বিনোদবিহারীর অন্তর্গত প্রশান্তি মুগ্ধ করেছিল সত্যজিৎকে, আর ঋত্বিককে টেনেছিল রামকিঙ্করের অভ্যন্তরীণ অশান্তি। বস্তুত এই তথ্যচিত্রদু’টি পরীক্ষা করলেই দেখা যায়, বাস্তববাদ বিষয়ে, শিল্পের উৎস ও আকাঙ্ক্ষা বিষয়ে, সত্যজিৎ ও ঋত্বিকের ধারণাগত মিল ও অমিল।

এক জন চলচ্চিত্রকারও যে-হেতু মূলত দৃশ্যশিল্পী, বিনোদবিহারীর মধ্যে সত্যজিৎ রায় পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন দৃশ্যভাষার মাত্রা ও অনুষঙ্গসমূহ। চল্লিশের দশকের শুরুতে যে চিত্রকরকে তিনি মাস্টারমশাই হিসেবে পেয়েছিলেন, তিনি ও সত্তর দশকের বিনোদবিহারীর মধ্যে মূলগত পার্থক্য আছে। একদা তিনি ক্ষীণদৃষ্টি ছিলেন। পরে তিনি দৃষ্টিহীন হয়েছেন। সুতরাং সত্যজিতের পক্ষে উৎসুক হয়ে ওঠাই স্বাভাবিক যে, দৃশ্যের বস্তুগত দিক এক জন শিল্পীর পক্ষে কতটা প্রয়োজনীয়। মনে রাখা দরকার যে, ‘পথের পাঁচালী’ থেকেই সত্যজিৎ বাস্তবতাকে মিলিয়ে দিতে চাইছিলেন অনুভূতির অন্য মাত্রায়, হয়তো সঙ্গীতে। নিজেরও প্রাথমিক ভিত্তি ‘স্পেস’ বা স্থান বলেই সত্যজিৎ বুঝতে চেয়েছিলেন, তাঁর দৃষ্টিহীন মাস্টারমশাই স্থানকে কী ভাবে বুঝতে চান। এই ছবিতেই বিনোদবিহারী তাঁকে জানান— “স্পেস সম্পর্কে একটা নতুন চেতনা হয়। স্পেসটা হয়ে যায় একটা ঘনবস্তু— যেটাকে হাত দিয়ে সরিয়ে সরিয়ে সামনে এগোতে হয়। যে জিনিসটা স্পর্শ করছি সেটা ছাড়া আর কোনও কিছুর অস্তিত্ব থাকে না। তোমরা চেয়ার দেখলেই বুঝতে পারছ সেটা আছে, আমি চেয়ারে বসলে পরে তবে বুঝছি সেটা আছে।... এছাড়া আবার আর একটা দিকও আছে। এই যে চায়ের গ্লাসটা হাতে নিলুম— কাচ জিনিসটার স্পর্শগত অনুভূতি কোনও দিন আগে এভাবে ফিল করিনি।” অর্থাৎ সত্যজিৎ রায় নিজেকে বোঝাতে চাইছেন যে, বাস্তবতার সম্পর্কে প্রচলিত সংস্কারের সীমানা পার হওয়া জরুরি। এক জন দৃষ্টিহীন চিত্রকরেরও চক্ষুষ্মান হওয়ার অধিকার আছে শর্তসাপেক্ষে। বোদল্যেয়ার যাকে ‘করেসপন্ডেন্স’ বলেন। সেই অনুভূতির জগতে অভিজ্ঞতাকে অনুবাদ করে দিলেই বিনোদবিহারী দৃষ্টিহীনের বাস্তবতা খুঁজে পান। আমি শুধু এটুকুই বলব, প্রথম এই বাস্তবতা বঙ্কিমচন্দ্র খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর দৃষ্টিহীন ফুলওয়ালি রজনীর মধ্যে; যখন সেই কিশোরী প্রথম পুরুষস্পর্শে কুসুমের ঘ্রাণ খুঁজে পায়। বিনোদবিহারীর কাজ প্রমাণ করে যে, প্রাপ্ত বাস্তবতা কোনও মতেই শিল্পীর নয়। তাঁকে বাস্তবের পুনর্সংগঠনে জোর দিতে হয়। সত্যজিৎ রায় নিজেও যখন তাঁর ক্যামেরা দিয়ে প্রকৃতি বা মানুষকে দেখেন, তাতে যে আলোর মলাট থাকে, তা তাঁর নিজস্ব। এটাই ‘অন্তশ্চক্ষু’। বস্তুত ছানি কাটার একটি ব্যর্থ অস্ত্রোপচারে বিনোদবিহারী দৃষ্টি হারালে অন্য চলচ্চিত্রকার হয়তো প্রদোষকালীন কোনও রাগ, হয়তো পূরবী, জুড়ে দিতেন। কিন্তু সত্যজিৎ, প্রতিভাবশত, প্রয়োগ করেছেন সকালের রাগ আশাবরীর একটি অলৌকিক মুহূর্ত। বিনোদবিহারী নয়, বিনোদবিহারীকে উপলক্ষ করে সত্যজিৎ রায় নিজেকেই বোঝাতে চাইছেন, প্রাথমিক গ্রহণযোগ্যতার উপরে নির্ভরশীল নয় শিল্পীর বাস্তব। এই জন্যই কোনার্কের মৃদঙ্গবাদিনীর পাথরের স্তন আজও রক্তমাংসের।

‘দি ইনার আই’, অতএব, বাস্তব-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন। কিন্তু বিশেষ ভাবে আমি বলতে চাই, সত্যজিৎ রায়ের বাস্তব সম্পর্কিত ধারণার, প্রধানত দৃশ্যভাষার উন্মোচনের অন্যতম উৎস হয়তো বিনোদবিহারী। এখন আমরা অবগত হয়েছি, তথাকথিত ‘ওরিয়েন্টাল আর্ট’ প্রসঙ্গে সত্যজিতের অবজ্ঞার কথা। তিনি যে ঠাকুরবাড়ির আঙিনা থেকে উঠে আসা ছবি আঁকার ধরন নিয়ে খুব উৎসাহী ছিলেন, এমন নয়। এই সব তিনরঙা হাফটোন আর্ট প্লেট-এর মধ্যে এক নন্দলাল বসুর আঁকা ছাড়া আর কারও ছবি তেমন আমল দেওয়ার যোগ্য বলে মনে হয়নি। ওয়াল পেন্টিং জিনিসটা জোলো বলে মনে হত। ছবির বিষয়বস্তু ও অঙ্কনরীতিতে একটা পেলব ভাবালুতার ইঙ্গিতে মন বিরোধী হয়ে উঠত। অথচ নিয়তির এমনই কৌতুক যে, শান্তিনিকেতন কলাভবনে পৌঁছনোমাত্র সামনে বারান্দার সারা সিলিং জুড়ে এমন একটি ছবি তিনি দেখলেন। দেখলেন, আর এমন মুগ্ধ হলেন যে, সারা জীবন আর সেই মুগ্ধতা তাঁকে ছেড়ে গেল না। গাছপালা, বাংলা পল্লিপ্রকৃতির একটি সাধারণ ছবি। বীরভূমের গ্রাম। কিন্তু কোথাও সম্ভবত একটা চলমান কথকতা ছিল। আবার সত্যজিৎ রায়কেই উদ্ধৃত করি, “দৃশ্য না বলে ট্যাপেস্ট্রি বলাই ভাল। অথবা এনসাইক্লোপিডিয়া। এই ছবি এমনই ছবি যার সম্বন্ধে ওরিয়েন্টাল আর্ট সম্পর্কে আমার মন-বিষোনো কোনও সংজ্ঞাই প্রয়োগ করা চলে না।”

উপলব্ধি করি যে, সত্যজিৎ রায় স্থিরচিত্রের বিন্যাসে মন্তাজের মহিমা খেয়াল করেছেন। ‘দি ইনার আই’ ছবিতে বিশ্বভারতীর হিন্দিভবনের দেওয়ালে বিনোদবাবুর অসামান্য মুরাল, যাতে মধ্যযুগের সাধুসন্তদের জীবন বর্ণনা করা হয়েছে, তাকে অনুপুঙ্খ ভাবে খেয়াল করেছেন সত্যজিৎ। চলচ্চিত্র যেমন একটি মুহূর্তে নানা সময়ের বিবরণ দিতে পারে, সত্যজিৎ অনুমান করেন, ভিন্ন মাধ্যমে বিনোদবিহারী তা পারেন। আর তাই হয়তো পরিণত ছাত্র মাস্টারমশাইকে প্রণাম করার সুযোগ পেয়ে যান সত্তরের দশকের শুরুতে।

কী অসামান্য লাগে, যখন সত্যজিৎ রায় তাঁর প্রিয়, অতিপ্রিয় দশাশ্বমেধ ঘাটের কথা টেনে আনেন। তিনি নিজে ‘অপরাজিত’ ও ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এ, আর ভারতীয় সিনেমা অজস্র বার এই ঘাটটিকে নজরে এনেছে। কিন্তু বিনোদবিহারী শুধু রেখার সংহতিতে বুনে ফেলেছিলেন দশাশ্বমেধের বাস্তবতা। এই অনুষঙ্গ শুধু স্থিরচিত্র গতিচিত্রের তুলনার মুহূর্ত নয়, সত্যজিতের আত্মপক্ষের বিবৃতি যে, বাস্তবের বর্ণনাও এক ঘন সংহতি দাবি করে। বিনোদবিহারী আরও নানা দিক থেকে তাঁকে বাস্তবতার ‘ভারতীয়ত্ব’ ও বৈশিষ্ট্য বিষয়ে ধারণা দেন। এই যে সত্যজিৎ আদি যৌবনে মনে করতেন ‘ওরিয়েন্টাল আর্ট’ কোনও না কোনও ভাবে শিল্পের মানচিত্রকে ছোট করে দেয়, বিনোদবিহারী তাঁকে প্রায় হাত ধরে এই ধারণার বাইরে নিয়ে আসেন। শান্তিনিকেতনে স্বল্পকালীন ছাত্রজীবনে তিনি যে অজন্তা-ইলোরা যাওয়ার সুযোগ পান, তা তাঁকে প্রথম ভারতীয় প্রতিমা সম্পর্কে, বাস্তবে সুস্পষ্ট চিহ্নায়ন বিষয়ে নির্দেশ দেয়। অজন্তা ও ইলোরার গুহাচিত্রে তিনি বুঝতে পারেন, ইউরোপের দেখা, অন্তত ফ্রেসকোর প্রসঙ্গে, মূলত জানলা দিয়ে দেখা যা পরিপ্রেক্ষিতের সঙ্গে সঙ্গে ছোট বা বড় হয়ে যায়। অন্য দিকে ভারতীয় দেখা অনেক সংরক্ত, সেই চিত্র দর্শকের সঙ্গে কথা বলতে সতত অপেক্ষায় থাকে।

মিশরীয় শিল্প হয়তো প্রকৃতিতে ভিন্ন, কিন্তু সম্পূর্ণ শাস্ত্রীয়। ভারতীয় ছবি, ছাত্র সত্যজিতের মনে হয়েছিল, অনেক মানবিক। পরিণত বয়সে যখন তিনি বিনোদবিহারীকে খুঁটিয়ে দেখলেন দেওয়ালে, তখন তিনি ইতিহাসবিদের সঙ্গে শিল্পীর পার্থক্য বুঝতে পারলেন। যৌবনের সূচনায় হয়তো ইলোরায় তিনি খেয়াল করেছিলেন কী ভাবে বৌদ্ধ চিত্রকলা, ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র ও জৈন ভাবধারা সহাবস্থান করে, কিন্তু বিনোদবিহারীর চর্চায় সবিস্ময়ে সেই ঐতিহ্যের একটি প্রামাণ্যরূপ পেলেন। স্বয়ং বিনোদবিহারীই তাঁকে জানালেন, সময়ের এই নানা অধ্যায় ইতিহাসকারের কাছে জরুরি, শিল্পীর পক্ষে নয়। শিল্পী বরং সময়ের ডালপালায় লুকোচুরি খেলতে পারেন। সত্যজিৎ হয়তো এই বক্তব্য থেকেও ইশারা পান যে, এক জন চলচ্চিত্রকার কী ভাবে বাস্তবের টুকরো সময় জুড়ে জুড়ে এক বিমূর্ত, অনুমিত ও অ-বাস্তব সময় তৈরি করেন।

বিনোদবিহারীকে উপলক্ষ করে সত্যজিৎ আসলে মন্তব্য করে চলেছেন দৃশ্যশিল্প ও আধুনিকতার করমর্দন বিষয়ে। এই যে তিনি পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি একটি তুচ্ছ গ্রামের তুচ্ছতর জীবনযাত্রাকে শিল্পের বিষয় করে তুললেন, ভারতীয় চলচ্চিত্রে তা অদৃষ্টপূর্ব। আমাদের সিনেমা সামাজিক জীবন বলতে দূর ও কাছের নানা তীর্থ সমাজের সদরে ও অন্দরে দেখতে পেত। কিন্তু একটি শিশিরবিন্দু দেখার জন্য তাকে ‘পথের পাঁচালী’-র শরণাপন্ন হতেই হল। এরই সঙ্গে প্রতিতুলনা করতে পারি বিনোদবাবুর। তিনি কিন্তু শান্তিনিকেতনের আশপাশের পল্লিপ্রকৃতিকেই তার ল্যান্ডস্কেপের উপজীব্য ভেবেছিলেন। বৃষ্টির কল্পনার জন্য তাঁকে মেঘদূতের কাছে অথবা সুদূর রাজপুতানা কিংবা মোগল আমলের কাছে হাত পাততে হয়নি। একটি সাঁওতাল গ্রামকে তিনি পৌঁছে দিতে পারতেন মহাকাব্যের আঙিনায়। বিনোদবিহারী জাপানে গেছেন, নেপালে গেছেন ও সে-সব ভ্রমণ তাঁকে সমৃদ্ধ করেছে। কেননা রেখা আর রঙের বিষয়ে তার অধমর্ণ হতে কোনও আপত্তি ছিল না। অবনীন্দ্রনাথ, প্রায়ই নন্দলালও একটি নির্দিষ্ট প্রকরণের মধ্যে ভারতীয়ত্ব আবিষ্কার করতেন। অপর দিকে বিনোদবিহারী অবনীন্দ্রনাথের আওতায় থাকা সত্ত্বেও স্বদেশকে সীমামুক্ত করতে পেরেছিলেন, তাঁর মুরালে তাই ক্লাসিক ঘরানার সঙ্গে মিলেমিশে আছে যুগপরম্পরা। ছবি আঁকার সময় বিনোদবিহারীর কাছে উদাত্ত বা সুগভীর বিষয়ের কোনও মূল্যই ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন, খোয়াইয়ের নিঃসঙ্গ তালগাছটিও একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে। সত্যজিতের ছবিতে এই খোয়াই আর তাঁর ‘সলিটারি তালগাছ’ আছেও। গুরুর অনুরোধক্রমেই আছে। এমনকি মুরাল তৈরি করার সময়ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিনোদবিহারী নিতান্ত অনুমানের ভিত্তিতে সমগ্র রচনার টেনশন তৈরি করেন জীবনের রোজনামচা দিয়ে— “হ্যাঁ, সবই আমার দেখা জিনিস। জানা জিনিস। দেখলে তো— চানাচুরওলা, কাঁধে বাঁক নিয়ে যাচ্ছে লোক, মেয়ের মাথার ঝুড়ি, বৈষ্ণব-বৈষ্ণবী— সব নিজের চোখে দেখা সাধারণ ব্যাপার। ওসব অ্যাবস্ট্রাকশনের যান্ত্রিক ব্যাপারে আমার কোন ইন্টারেস্ট নেই। বাড়ির বাইরে থাকবে মিউরাল, সামনে দিয়ে লোক চলাচল করবে, দেখে অন্তত বুঝতে পারবে এগুলো মানুষ।”

সত্যজিৎ রায়ও কিন্তু তাই। ‘পথের পাঁচালী’ থেকে বাস্তবের যে প্রতিরূপায়ণ শুরু হল, তা আমাদের রোজকার চেনা বাস্তব। তাকে আমরা শনাক্ত করতে পারি, তাতে দূরের পাহাড়ের সম্ভ্রম অথবা সমুদ্রতলের হাতছানি নেই। তা আমাদের এতই চেনা যে, সত্যজিৎ না দেখালে হয়তো চিনতেই পারতাম না। তিনি ইটালীয় নব-বাস্তবতার সৌজন্যে রোজনামচাকে ইতিহাসের পর্যায়ে উন্নীত করতে চান। একটি পরিবারের জীবনবৃত্তান্ত হয়ে দাঁড়ায় ঔপনিবেশিকতার আড়ালমুক্ত স্বাধীনতাপ্রাপ্তির ইতিহাস— আদানপ্রদানের এই আগ্রহও হয়তো উস্কে দিয়েছিল বিনোদবিহারীর ক্লাস করার অভিজ্ঞতাই। বিনোদবাবু যে তথাকথিত ‘প্রাচ্যরীতি’ পরিহার করেন, তিনি যে ভাবে জাপান মিশরীয় অথবা পশ্চিমি চিত্রকলার সঙ্গে ভারতীয় রীতির আপাত কোনও ঝগড়া আছে বলে মনেই করেন না, বরং চান একটি সমন্বিত মনোভাব গড়ে তুলতে, সত্যজিৎ রায়ও তেমনি পৌরাণিকতা অথবা দেশপ্রেমের আবহ থেকে ভারতীয় ছবিকে মুক্তি দেন। আজীবন যে ডিটেল-প্রীতির জন্য সত্যজিৎ রায় বিখ্যাত, তার সঙ্গেও তো বিনোদবিহারীর কোথাও একটা সাদৃশ্য আছে। সত্যজিতের বলা গল্পটি এই— এক বার তাঁর মাস্টারমশাই বাইরে বসে এক পাল মোষের ছবি আঁকছেন, কয়েকটি সাঁওতাল মেয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাঁ করে দেখছে। হঠাৎ তারা মন্তব্য করে, এতগুলো মোষ আর একটাও বাছুর নেই! হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো বিনোদবিহারীর সামনে জীবনরহস্যের পাতা খুলে যায়। সত্যজিৎ নিজেও যখন দৃশ্য নির্মাণ করেন, তখনও মনুষ্যেতর প্রাণী, বিড়ালশিশু, কুকুরের লেজ বা জলপিপি তাঁর নজর এড়ায় না, কারণ মনোযোগী এই ছাত্রটি জানেন, সব বাস্তবেরই কিছু আটপৌরে গয়নাগাঁটি থাকে। চোখের খুব সামনে থেকে দেখা প্রকৃতি বা মানুষ, এক জন চলচ্চিত্রকার হিসেবে সত্যজিৎ কি অভিজ্ঞতাটি মিলিয়ে নেবেন না? দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর বিনোদবিহারী রেখার বদলে যে ভাবে বস্তুর ঘনত্বে আস্থা রাখতে শুরু করেন, আমার মনে হয় ‘চারুলতা’-র বিখ্যাত প্রথম সিকোয়েন্স-এর চারু সে ভাবেই ধনীগৃহে আসবাবপত্রের নীরন্ধ্র ঘনত্ব খুঁজে পায়। ‘দি ইনার আই’ তথ্যচিত্রের শেষে সত্যজিৎ বিনোদবিহারীকে উদ্ধৃত করেছেন যে, অন্ধতা হল এক নতুন অনুভূতি, এক নতুন অভিজ্ঞতা, অস্তিত্বের এক নতুন স্তর। পিকাসো ভিন্নতর পরিপ্রেক্ষিতে বলেছিলেন, ছবি আঁকা হল অন্ধত্বের শিল্প। সত্যজিৎ রায় হয়তো জানতেনই না, মাস্টারমশাইয়ের জীবনচিত্র আঁকতে গিয়ে তিনি আত্মজীবনীর সংযোজনই তৈরি করছেন। ক্যামেরায় লুক-থ্রু করলে বাস্তবের বাইরের দিকটা দেখা যায়, ভিতরের দিকটি থাকে প্রতিভার রান্নাঘরে। ‘অন্তরে আজ দেখব, যখন আলোক নাহি রে’— এই তো শিল্পীর চরম এপিটাফ।

হর্হে লুই বোর্হেসের একটি আখ্যায়িকা আছে যে, জনৈক শিল্পী নানা ধরনের ছবি আঁকছেন— প্রাসাদ, ভূদৃশ্য, নারী, প্রান্তর, সমুদ্র, গ্রাম ও নগর। জীবনপ্রান্তে এসে উপলব্ধি করলেন যে, সব আলেখ্যই আত্মপ্রতিকৃতিতে পরিণত হয়েছে। ‘রামকিঙ্কর’ তথ্যচিত্রটি আসলে স্রষ্টা রামকিঙ্করের জীবন ও কর্ম বিষয়ে অনুজপ্রতিম ঋত্বিক ঘটকের স্বগতোক্তি। যখন তিনি নিজেও টের পেয়ে গেছেন দিনাবসানের হাতছানি, যখন রক্তের গহনে বেজে উঠেছে ভাঙা খেয়ালের টুকরো— ‘পূজাফুল না ফুটিল দুঃখনিশা না ছুটিল না টুটিল আবরণ’, তখন ঋত্বিক দেখতে পেলেন এমন এক শিল্পীকে, যিনি সমবেত আশ্রমিকদের মধ্যে চূড়ান্ত ব্রতহীন, আর তাই তাকেই ঋত্বিক বন্দনা করলেন আলোকের এই ঝর্নাধারায়, যার নাম চলচ্চিত্র। ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বর মাসের প্রথম রবিবার, ঋত্বিক জনৈক আগ্রহী ক্রেতাকে সে দিন ‘রামকিঙ্কর’ তথ্যচিত্রের ‘রাশ’ দেখাবেন, তখনও শব্দ সংযোজিত হয়নি, ঋত্বিককুমার ঘটক প্রথম সারিতে ভদ্রলোকের সঙ্গে, মহেন্দ্র কুমার-সহ আমি ও কবি অনন্য রায় তাঁর পিছনের সারিতে। গ্যেটে এক বার বলেছিলেন, পৃথিবীর সব কবিই নিজেদের সঙ্গে কথা বলেন, আমরা আড়ি পেতে শুনে ফেলি। আমি সেদিন দেখছিলাম রামকিঙ্কর বেজ ও ঋত্বিক ঘটক কী নিঃশব্দে পরীক্ষা করে চলেছেন দৃশ্যকলার রূপকথা। হঠাৎ আমার চোখে পড়ে সেই অলৌকিক মুহূর্ত, ঋত্বিক ঘটককে ঈষৎ উত্তেজিত দেখায়, তিনি সোজা হয়ে বসেন, তাঁর তর্জনী পর্দার দিকে নির্দিষ্ট, আলোর অবিশ্বাস্য বিন্যাস এসে রামকিঙ্করের ক্লোজ-আপ গঠন করেছে, রক্তমাংসের রামকিঙ্কর যেন ক্রমে প্রস্তরীভূত হয়ে গেলেন। একেই তো রদ্যাঁ বলেছিলেন শ্রাব্য-আয়তন বা অডিব্‌ল স্পেস। আর রবীন্দ্রনাথ বেঠোভেনের প্রসঙ্গে, শব্দহীন সুরের জগৎ। প্রকৃত অর্থেই ঋত্বিক রামকিঙ্করের মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন আগুনের বীজসমূহ, ধ্বংসের উৎস— যা নিজেকে প্রথা থেকে সরিয়ে নেয় অনিয়মে, প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্র থেকে কেবলই দূরে নিয়ে যায় পরিধির প্রান্তিকতায়। সকল নিয়ে যিনি বসে আছেন সর্বনাশের আশায়, শান্তিনিকেতন যাঁকে নিরাপত্তা দিতে পারে না, ওই তপোবনে যিনি পবিত্র অসঙ্গতি, তাঁকে ঋত্বিক অর্ঘ্য নিবেদন করেন ওই হন্তারক ক্লোজ়-আপে।

ফরাসি মনীষী আঁদ্রে মালরো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে জানিয়েছিলেন, দস্তয়েভস্কির কারমাজ়ভ-পরিবারের প্রকৃত বাসস্থান হতে পারে শিল্পী ফ্রান্সিসকো গোইয়া-র ‘কিন্তা দেল সরদো’ অর্থাৎ বধির মানুষের কুটির। আমাদের হাতের সামনে আছে বধির বেঠোভেনের নবম সিম্ফনি। আধুনিকতার স্রোত-প্রতিস্রোতে এই সব চিহ্নমালা উৎকীর্ণ থাকে। ঋত্বিক তাঁকেই দেখেছিলেন শান্তিনিকেতনের বাইরে, রামকিঙ্করের ওই টালির ঘরে। ঋত্বিক জানতেন, জানতেন বলেই ঋত্বিকের ক্যামেরা ক্রমাগত জোর দিতে থাকে রামকিঙ্করের আধিভৌতিক প্রাণিচিত্রে; আর ঋত্বিক বিশ্বাস করেন যে, নিম্নবর্গীয় রামকিঙ্কর সভ্যতার অধিকবয়সি ও আদিম বলেই সভ্যতার অসম্পূর্ণতা বিষয়ে রায় দিতে পারেন। আশিরপদনখে সভ্যতার বিচারক হওয়াই তাঁর নিয়তি। এই জন্যই ষাটের দশকের শুরুতেই সাঁওতাল রমণীদের পায়ের তালে তালে এগিয়ে আসার অনুষঙ্গে ‘সুবর্ণরেখা’র রামকিঙ্করের চালকলের ডাকনামের শিল্পকর্মটিকে চকিত বিদ্যুল্লতার মতো উপহার দেন তিনি। রামকিঙ্কর যে অন্তরতমকে একা দেখার জন্যই মদ ও নারীকে বেছে নিয়েছিলেন, তা ঋত্বিকের নজর এড়ায়নি। আমাদের চোখের সামনেই তো কলকাতার সস্তা পানশালাগুলি এই চলচ্চিত্রকারেরও বিদায়গাথা রচনা করে দিচ্ছিল। সকল লোকের মাঝে বসে একান্ত যে দুঃসাহস, রাবীন্দ্রিক পরিশীলনের হাস্যকর পরিমণ্ডল থেকে সুদূর হয়ে যাওয়ার যে কারুবাসনা রামকিঙ্করকে আলাদা করে দিয়েছিল, তা ঋত্বিকের ঈর্ষা ও অনুধ্যানের বিষয় ছিল। রামকিঙ্করকে হঠাৎ করে তিনি তথ্যচিত্রের প্রয়োজনে পাঠ্য ভাবেননি। রামকিঙ্করের রেখায় যে উন্মাদ ও বঙ্কিম সীমা ছড়ানোর ডাক, যা বোলপুরের নিজস্ব নিসর্গচিত্র, তাকে ঋত্বিক প্রাণাধিক আদরে চিনতে পেরেছিলেন। ‘অযান্ত্রিক’ ছবিতে, ‘মেঘে ঢাকা তারা’-য় যে প্রকৃতি তা মানুষ-নিরপেক্ষভাবে সংযুক্ত, আইজ়েনস্টাইনের ভাষায় ‘নন ইনডিফারেন্ট নেচার’ যা গূঢ়ার্থে মানুষের সম্প্রসারণ, রামকিঙ্করের পটে ঋত্বিক সেই দ্বৈততার প্রবণতাকে পুনরাবিষ্কার করেন। ছবিতে আমরা স্থির নিথর বুদ্ধদেবকে দেখতে পাই, কিন্তু এই বুদ্ধ শিল্পীর আরাধ্য, সঙ্কল্পবদ্ধ, গায়ে শ্রমবিন্দু। কোনও ‘মার’, পার্থিব প্রলোভন, খ্যাতির ইশারা সেই বুদ্ধকে বিচলিত করতে পারে না। তা রামকিঙ্কর বা ঋত্বিককেও টলাতে পারেনি।

যে নারী-পুরুষ ও শিশুটিকে আমরা দেখি ভাস্কর্যায়িত, তাতে গতির তরঙ্গ, আলোর অপেরা। কিন্তু আমরা খেয়াল করিনি, ঋত্বিকের ক্যামেরা অনুপুঙ্খে এই উৎফুল্ল দম্পতিকে না চেনালে হয়তো অজানাই থাকত পাথরের এই সঙ্গীত, যে সকালে সদ্যস্নাতা এই রমণীর কাপড় শুকিয়ে নেওয়ার অছিলা, বাস্তব থেকে মুহূর্তে বাস্তবাতিরিক্ত অথবা পুরাণে পৌঁছে যাওয়া আর সেখান থেকে আবার মাটির পৃথিবীতে অবতরণ— এ তো ঋত্বিকের প্রথম প্রণয়পত্র। আর রামকিঙ্কর কী অবলীলায় কী অবহেলায় দিনের পর দিনসানন্দে তাকে বর্ণনা করে গেছেন চিত্রে ও ভাস্কর্যে।

সুইস পার্কে সেদিন ছবির শেষে ঋত্বিক পিছন ফিরে তার ভক্তদ্বয়কে তাচ্ছিল্যভরে জানিয়েছিলেন, “কিঙ্করদার কাছে তো একটাই জিজ্ঞাসা, আর্ট কোথা থেকে হয়?”

রামকিঙ্কর কী জবাব দিয়েছিলেন আমাদের জানা নেই, কিন্তু আমরা স্পষ্টই দেখতে পাই তাঁর চোখ আর্য-স্থাপত্যকে ছাড়িয়ে উঁকি দিচ্ছে প্রাচীন আসিরীয়, দ্রাবিড় ও মিশরীয় অভিজ্ঞানে। রামকিঙ্করের রবীন্দ্রনাথকে ঋত্বিক যে ভাবে যে ভাবে ক্যামেরায় ধরেন, তাতে দেখা যায়, বাস্তব ক্রমশ ত্বকের বদলে আত্মায় হাত রাখতে চায়। এত বিষণ্ণ, গম্ভীর ও নির্জন, এত পরিত্যক্ত কবিকে কখনও আমরা দেখেছি কি? রামকিঙ্কর মৃত্তিকার সন্তান, তার স্তনদায়িনীকে তিনি শনাক্ত করেন। কিন্তু একই সঙ্গে সভ্যতার অধিক বয়সি তার কেশরাশিতে, তাঁর মুখের বলিরেখায় প্রাক্-পৌরাণিক স্মৃতি। ঋত্বিকের ক্যামেরা কি প্রফুল্ল চিত্তে নারীদেহের উদ্বেলতা চিনে ফেলে, আর গান্ধীকে ইতিহাস-পুরুষ হিসেবে বর্ণনা করে দেয়। সমধর্মী এক অগ্রজের কাছে তিনি প্রার্থনা করেন জীবনের লুপ্ত সঙ্কেতসমূহ, কিংবদন্তির শক্তির নৃত্য যেন, স্থির কেন্দ্রে অপ্রতিহত, ঋত্বিক তেমন ভাবেই আকুল হয়ে দেখেন রামকিঙ্করের পাথর। ঋত্বিকের ফ্রেম ও রামকিঙ্করের পট— উভয়ই বাস্তবের সীমাবদ্ধতাকে যুগপৎ ঠাট্টা ও স্বীকার করে চলে।

ঋত্বিকের ‘সুবর্ণরেখা’য় যে রামায়ণকথা, তা সমাজের তলানি থেকে উঠে আসা। তাঁর রামচন্দ্র ঘাটশিলার ছাতিমপুর স্টেশনে প্লাটফর্মে যে মাতৃবন্দনা করে, যে কৌশল্যাকে সে আবিষ্কার করে, সে কোনও উচ্চবর্ণসম্ভূতা রাজমাতা নয়, সামান্য বাগদি বৌ। রামকিঙ্করের যক্ষিণীও নীচের তলার মানুষ। তার শ্রোণিযুগ ও নিম্নোদর দেখলেই বোঝা যাবে। কান্তিতত্ত্বের মুদ্রা নয়, কোন প্রান্তসীমার রমণীর গোপন প্রদেশ। দু’জনেই অনার্য, দু’জনই ব্রাত্য। ঋত্বিক ও রামকিঙ্কর আসলে ক্রমাগত নিজেদের আত্মার সম্প্রসারণ ঘটান ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে।

আরও কয়েক বছর পর তাঁর ‘স্বপ্ন’ পর্যায়ের একটি ছবিতে ‘টুপি’ পরিহিত উন্মাদ ভ্যান গখের কাকেরা ফ্রেমের বাঁধন ছাড়িয়ে উড়ে গিয়েছিল। কুরোসাওয়া চাইছিলেন ছবির স্থিরতা মুক্তি পাক সঙ্গীতের চলমানতায়। ঋত্বিক ঘটক মূলত চলমান চিত্রমালায় নিবেদিত বলেই তিনি রামকিঙ্করের মধ্যে প্রতিমুহূর্তেই চিহ্নিত করেন সম্ভাব্যতার উৎসব। যা কিছু অ-সম্ভব, যা কিছু অ-বাস্তব, রামকিঙ্করের সৌজন্যে রেখা আর রঙের পর্বত যে কী করে বৈশাখের নিরুদ্দেশ মেঘ হতে পারে, তা এই চলচ্চিত্রকার জানার সুযোগ পান তাঁর কাছে। রামকিঙ্কর বিপরীতের মিলন, মার্ক্সবাদী দ্বান্দ্বিকতার একটি মূর্ত দৃষ্টান্ত। ঋত্বিক ঘটক হয়তো রামকিঙ্করকে পরতে পরতে দেখতেও চাননি, যতটা সত্যজিৎ চেয়েছিলেন বিনোদবিহারীকে। নিজে প্রধানত বক্তব্যধর্মী বলেই তাঁর উদ্দেশ্য, রামকিঙ্কর নামক সন্দর্ভকে নিবেদন করা। তিনি যতটা তথ্যচিত্রের আড়ালে ইতিহাসকার ও দার্শনিক, ততটা মানতেই হবে আখ্যানপ্রণেতা নন। কিন্তু এক জন শিল্পী কি আদৌ অপর কাউকে দেখতে পান? তিনি তো পিকাসোর ছবির মতোই ‘আয়নার সামনে নারী’। হয়তো দু’জনেই দেখতে চেয়েছিলেন অগ্রজ দুই শিল্পীকে, আর শেষ পর্যন্ত দু’জনই জীবনীর বদলে যা নথিভুক্ত করে গেছেন, তা প্রকারান্তরে আত্মজীবনী।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Satyajit Ray Ritwik Ghatak Ramkinkar

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy