E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

ঝড়

মফস্সল শহরের মানুষ আমরা। সামুদ্রিক ঝড় থেকে দূরে বসে ঝড় নিয়ে কথা বলতেই বেশি ভালবাসি। সন্ধেবেলা হারানকাকার চায়ের দোকানের আড্ডায় ঝড়ের কথাই চলছিল।

পার্থ দে

শেষ আপডেট: ১০ মে ২০২৬ ০৭:৪২
ছবি: প্রসেনজিৎ নাথ।

ছবি: প্রসেনজিৎ নাথ।

আজ একটা ঝড় আসার কথা। গত সাত দিন ধরে একটু একটু করে নিম্নচাপ তৈরি হয়েছে বঙ্গোপসাগরে, সেটাই ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নিয়েছে। খবরে বলেছে, মাঝরাতের আগেই নাকি ল্যান্ডফল। পূর্ব মেদিনীপুর আর দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার উপকূলবর্তী অঞ্চলে সব কিছু লন্ডভন্ড হয়ে যেতে পারে। সমুদ্রে যারা মাছ ধরতে যায়, তাদের জন্য টিভি-রেডিয়োতে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।

কলকাতার দক্ষিণ প্রান্তে আমাদের শহরতলি। বিকেল থেকেই একটু-আধটু এলোমেলো হাওয়া ছেড়েছে। রাস্তাঘাটে লোকজন আর গাড়িঘোড়া অন্য দিনের চেয়ে কম হলেও এই সন্ধেবেলাতেও বেশ কিছু দোকানপাট খুলেছে।

মফস্সল শহরের মানুষ আমরা। সামুদ্রিক ঝড় থেকে দূরে বসে ঝড় নিয়ে কথা বলতেই বেশি ভালবাসি। সন্ধেবেলা হারানকাকার চায়ের দোকানের আড্ডায় ঝড়ের কথাই চলছিল। ঝড়ের গতিবেগ কত হতে পারে, কোথা দিয়ে যাবে, গতিপথ বাংলাদেশের দিকে বেঁকে গেলে আমাদের ক্ষতি কম হবে— এই সব। আলোচনায় আশঙ্কার আভাস যত না ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল এক ধরনের আমোদের সুর। নিরাপদ দূরত্বে বসে বিপদ নিয়ে আলোচনা আর টিভিতে ঝড়ের তাণ্ডব দেখা আমাদের এক ধরনের বিনোদন!

দিলীপ’স হেয়ার কাটিং সেলুনের ভিতর থেকে গলা বাড়িয়ে দিলীপদা উৎকণ্ঠিত গলায় বলল, “ঝড়টা কখন আসবে ভাই জিতু?”

সন্ধে থেকে এই নিয়ে লোকটা ষোলো বার একই প্রশ্ন করল। কলকাতা-ঘেঁষা শহরতলিতে বসে ঝড় নিয়ে কেউ এতটা উৎকণ্ঠিত হতে পারে, ভাবা যায় না!

জিতু উত্তর দিল না। আমিই গলায় বিরক্তি ঝরিয়ে বললাম, “কী ব্যাপার বলো তো দিলুদা! ঝড় কি তোমার সেলুনের পাকা ঘরটা উড়িয়ে নিয়ে চলে যাবে নাকি! তখন থেকে এক প্রশ্ন করে চলেছ!”

উত্তর শুনে মুখের উদ্বেগ গেল না দিলুদার। পাশ থেকে অন্তু ফিসফিস করে বলল, “মনে হয় দেশের বাড়ির কথা ভেবে চিন্তিত হয়ে পড়েছে।”

আমি বললাম, “ধুস! দেশের বাড়িতে ওর আছেটা কে?”

নামখানায় দেশের বাড়ি হলেও কম বয়স থেকেই দিলীপদা কলকাতায় এসে হেয়ার কাটিং শিখে সেলুনে কাজ করতে শুরু করেছিল। পরে এই সেলুনটা কিনে নেয়। এখন বয়স বাহান্ন ছুঁয়েছে। শুনেছি বৌ-ছেলেমেয়ে নিয়ে প্রফুল্ল কলোনিতে থাকে।

সেলুনটাও এত দিন ভালই চলছিল, তবে ইদানীং কম্পিটিশন বেড়েছে। এলাকায় বেশ কয়েকটা কেতাদুরস্ত ব্র‍্যান্ডেড সেলুন চালু হওয়ার পর ওর খদ্দেরের সংখ্যায় ভাটা পড়েছে। নতুন প্রজন্মের ছেলেরা এদিকে ঘেঁষে না। কয়েক জন বুড়োমানুষ আর আমাদের মতো কলোনির নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলেরাই এখানে চুল-দাড়ি কাটতে আসে। তবে হারানকাকার চায়ের দোকান লাগোয়া সেলুন বলে বেশ একটা আড্ডার মেজাজ আছে এখানে। আমরা ক্ষুদিরাম কলোনির কয়েক জন হারানকাকার চায়ের দোকানের বেঞ্চিটা রোজ সন্ধেবেলা গরম করে তুলি। আসন্ন ঝড়ের ভয়ে আজও আড্ডাধারীরা গুটিয়ে যায়নি। একটা বেঞ্চে জিতু, অন্তু, বুরুন আর আমি। অন্য বেঞ্চে মণিজেঠা, নিখিলকাকু, বিজনকাকুরা বসেছেন। দোকানের ভিতর দিকে প্রতিমাদি কাচের গ্লাস ধুচ্ছে এক পাশে। মাসখানেক হল মহিলাটি হারানকাকার দোকানে কাজে লেগেছে, তার নীরব উপস্থিতি টেরই পাওয়া যায় না।

দুলাল দত্ত নামে এক মাঝবয়সি ভদ্রলোকও ইদানীং হারানকাকার চায়ের দোকানে আসা-যাওয়া শুরু করেছেন। অল্পবিস্তর কথাবার্তা হয়, তবে এখনও চেনা-পরিচয় সেভাবে হয়নি। শুনেছি, রথতলা মাঠের পাশে যে নতুন ফ্ল্যাটবাড়িটা উঠেছে, ওখানেই এসেছেন ভদ্রলোক। এক মাস ধরে দেখছি। সন্ধেবেলা চা খেতে আসেন, তার পর হারানকাকার সঙ্গে গুজগুজ করে দু’-চারটে কথা বলে চলে যান। আজও এসেছেন ভদ্রলোক। আয়েশ করে একটা দামি সিগারেট ধরিয়ে সকালের কাগজটা উল্টোচ্ছেন। দেখেশুনে পয়সাওয়ালা মানুষ বলেই মনে হয়।

গত চার-পাঁচ দিন ধরে টিভি-সংবাদপত্রে হট টপিক সুপার সাইক্লোন। মহাঝঞ্ঝা নাকি সমুদ্র ছেড়ে একটু একটু করে এগোচ্ছে তটের দিকে। কেউ বলছে ঝড় ওড়িশার উপকূলে ধাক্কা খাবে, কেউ বলছে বাংলাদেশের দিকে ঘুরে যাবে। রাত না গড়ালে বলা মুশকিল এদিকেই ধেয়ে আসবে কি না!

বুরুন আকাশের দিকে মুখ তুলে বলল, “ঝড়-টড় কিস্যু হবে না। সে বার মনে নেই, রাত্তিরে ঝড় আসবে বলে এল না, কোন দিকে যেন চলে গেল। কী ঠকান ঠকিয়েছিল মাইরি!”

আমাদের আলোচনার মধ্যে বার বার দিলীপদা সেলুনের ভিতর থেকে উদ্বিগ্ন হয়ে তাকাচ্ছে, হাতঘড়ি দেখছে, ঘুরেফিরে একই প্রশ্ন করছে— ঝড়টা কি আসবে? একটা অস্বস্তি আর আশঙ্কা ওর মনের ভিতর কোথাও গেঁড়ে বসেছে। সন্ধে থেকে বহু বার বোঝানোর চেষ্টা করেছি, কলকাতার কাছে আমাদের মফস্সল শহরে ও-সব ঝড়-টড় কিছু হবে না, আবহাওয়া দফতর বলেছে বড়জোর ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। তবুও যেন লোকটা ঠিক ভরসা পাচ্ছে না। কিসের আশঙ্কায় যেন বার বার কেঁপে উঠছে!

সেলুনটা ছোট। খদ্দের বসার সিট মাত্র দুটো। দিলীপদা নিজে তো চুলদাড়ি কাটেই, তবু কাটিংয়ের জন্য আর একটা ছেলেও রেখেছে। ছেলেটার নাম ভজু, অবিশ্যি দিনকয়েক ধরে ওকে দেখা যাচ্ছে না। জিতু এক বার জিজ্ঞেস করেছিল ভজুর কথা। মনে হল দিলীপদা যেন প্রশ্নটা শুনতেই পায়নি। কে জানে, হয়তো ছুটিছাটা নিয়ে ভজু দেশের বাড়ি গেছে!

ছোটবেলায় যখন বাবার সঙ্গে চুল কাটতে আসতাম, তখন থেকেই দিলীপদাকে চিনি। শুনেছি ওর প্রথম বৌটা নাকি বিয়ের তিন-চার বছরের মধ্যেই মারা গিয়েছিল, ছেলেপুলে হয়নি। দ্বিতীয় বার এক স্বামী-পরিত্যক্তা মহিলাকে বিয়ে করেছিল। হারানকাকা কয়েক দিন আগে মণিজেঠাকে বলছিল, “দিলীপের কপালটাই খারাপ। প্রথম বৌটা জন্মরোগী ছিল, বিয়ের পর থেকেই ভুগে ভুগে মরল। আর দ্বিতীয় বার যেটাকে ঘরে তুলল সেটা বাছুর-সুদ্ধ গাই! সারা দিন ঢুঁসোচ্ছে! বেচারার মনে এতটুকু শান্তি নেই!”

সেদিন হারানকাকার মুখে ‘বাছুর-সুদ্ধ গাই’ লব্জটা শুনে বুঝতে পারিনি বলে পরে অন্তুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। ও দাঁত বার করে বলেছিল, “আরে দিলীপদা তো দ্বিতীয় পক্ষকে ছেলেমেয়ে সমেত বিয়ে করেছিল। ওর ছেলে ঘন্টু আর মেয়ে শেফালি তো ওর বৌয়ের আগের পক্ষের।”

অন্তুর এ-সব ব্যাপারে দারুণ নলেজ। কলোনির সবার হাঁড়ির খবর রাখে। আমাদের গ্রুপে ওর রোজগার সবচেয়ে বেশি, সকালে বাজারে মাছ কাটে। মাছ বটিতে ছোঁয়ালেই মিনিমাম দশ টাকা। আমি আর জিতু সকালে বাড়ি-বাড়ি কাগজ দিই। আমাদের ইনকাম কম, চা-বিড়িটা অন্তুর উপর দিয়ে চলে বেশির ভাগ দিন। ওর মুখেই শুনলাম দিলীপদার ছেলে ঘন্টু হাড়বজ্জাত, পাড়ার প্রোমোটার সত্যেন সামন্তর রাইট হ্যান্ড। আর মেয়েটা সারা দিন বাড়ির উঠোনে নেচে নেচে রিল বানাচ্ছে।

রাত গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে গুমোট ভাবটা যেন বেড়েই চলেছে। বিকেলের দিকে তাও খানিক এলোমেলো হাওয়া ছিল, এখন একেবারে স্তব্ধ। বড় ঝড়ের আগে প্রকৃতি এমন গুম মেরে থাকে, যেন অন্ধকারের ভিতর হাওয়া-বাতাসের সঙ্গে কোনও গোপন ষড়যন্ত্রে মেতেছে। হয়তো খানিক ক্ষণের মধ্যেই ঝোড়ো হাওয়ার চাবুক আছড়ে পড়বে আমাদের গায়ে।

নিখিলকাকা বললেন, “হারান, আকাশের ভাবগতিক ভাল দেখছি না রে, আর একটু চা চাপা দেখি, এক কাপ খেয়ে বাড়ি চলে যাই।”

আমরাও নিখিলকাকার কথায় সম্মতি জানাই। এক বার ঝড়টা চলে এলে বাড়ি ফেরা মুশকিল হবে।

নিখিলকাকার কথায় প্রতিমাদি এমন ভাবে কেঁপে উঠে তাকাল, যেন বৃষ্টির ফোঁটা পড়েছে গায়ে। হারানকাকার দোকানে বাসনকোসন হাতে হাতে মেজে দেয় প্রতিমা নামের এই চল্লিশ-ঘেঁষা স্বামী পরিত্যক্তা মহিলাটি। শুনেছি সুভাষ কলোনিতে নতুন এসে ঘর ভাড়া নিয়েছে।

দোকান বন্ধ করার আগে শেষ দফার চা বসাল হারানকাকা। স্টোভ থেকে কেটলি নামতেই প্রতিমাদি একটা থালায় চা-ভরা কাচের গ্লাসগুলো তুলে নিয়ে আমাদের হাতে হাতে দিয়ে দিলীপদার সেলুনে ঢুকল। থালা থেকে গ্লাসটা তুলে নেওয়ার সময় দিলীপদা ফের উৎকণ্ঠা-ভরা চোখে প্রতিমাদিকে দেখল এক বার।

আচমকা একটা দমকা হাওয়া ছাড়ল। আশপাশের গাছের ডালপালা সজোরে দুলে উঠল, রাস্তার ব্যানার-ফ্লেক্সগুলো হাওয়ার তাড়নায় ফরফর করছে। দিলীপদা সেলুনঘর থেকে থমথমে মুখ বার করে বলল, “ঝড় কি এসে পড়েছে?”

দিলীপদার প্রশ্নের উত্তর দিতে যাব, তখনই মেঘগর্জনের মতো গুড়গুড় শব্দ তুলে দোকানের সামনে হাজির হল একটা মোটরবাইক। চালকের আসনে একটা ষণ্ডামার্কা অমার্জিত চেহারার ছেলে। আমাদের মতোই সাতাশ-আটাশ বছর বয়স। ঘাড় আর কানের পাশের চুলে ক্ষুর চালানো। এমন চুলের ছাঁট আর্মির লোক ছাড়াও কিছু তোলাবাজ গুন্ডাদের হয়। ছেলেটার পিছনে ব্যাকসিটে পঞ্চাশ-ছোঁয়া এক মাঝবয়সি মহিলা। মুখখানা দেখে মনে হল রাগে ফুঁসছে।

মণিজেঠা ফিসফিসিয়ে বললেন, “দিলীপের দ্বিতীয় পক্ষ। কিন্তু ধম্মের ষাঁড় ঘন্টুটা এখানে কেন?”

ততক্ষণে ছেলেটা মোটরবাইক থেকে নেমে মারমুখী ভঙ্গিতে দিলীপদার সেলুনে ঢুকে পড়েছে। মহিলাটিও শাড়ির আঁচল কোমরে জড়িয়ে পিছন পিছন ঢুকেছে। আমরা হারানকাকার দোকানে বসে দেখছি, ঘন্টু জবাব চাওয়ার ভঙ্গিতে অশ্রাব্য ভাষায় দিলীপদার সামনে তড়পাচ্ছে, “অ্যাই বুড়ো ভাম, তুই কী করেছিস!”

মহিলাটিও দিলীপদার জামার কলার চেপে ধরেছে। প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে বলছে, “এই ঘন্টু, সাধনদাকে এখুনি ডাক। এই মিনসের বজ্জাতি আজ শেষ করব!”

সাধনদা, মানে সাধন সামন্ত, এলাকার বড় প্রোমোটার। ঘন্টু তার শাগরেদ। এলাকার যত ডিসপিউটেড জমির দখল নিতে সাধন সামন্ত ঘন্টুকে ব্যবহার করে। শাসক দলের উপরমহলে সাধন সামন্তর খুঁটি বাঁধা।

কিন্তু আমরা ভেবে অবাক হচ্ছিলাম, দিলীপদার মতো গোবেচারা মানুষ কী এমন করল যে, তার দ্বিতীয় পক্ষের বৌ-ছেলে এমন মারমুখী হয়ে তাকে তড়পাচ্ছে।

ইতিমধ্যে ঘন্টু চেয়ার, বেঞ্চি, চুলদাড়ি কাটার সরঞ্জাম হাটকে পাটকে লন্ডভন্ড করতে শুরু করেছে। যেন দোকানের ভিতর এক ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব শুরু হয়েছে। দিলীপদার দ্বিতীয় পক্ষের বৌটিও রণচণ্ডী মূর্তি ধারণ করেছে। দেখে মনে হচ্ছে দু’জনে এক্ষুনি দিলীপদাকে ছিঁড়েখুঁড়ে শেষ করবে। দিলীপদা ওদের সামনে বলির পাঁঠার মতো ঠকঠক করে কাঁপছে, একটা কথাও বলছে না।

দেখতে দেখতে হারানকাকার চায়ের দোকান লাগোয়া দিলীপদার সেলুনকে কেন্দ্র করে পাবলিকের ভিড় জমে গেল। নিজের বৌ-ছেলের হাতে দিলীপদাকে নিগৃহীত হতে দেখে ভিড়ের মধ্যে ঢেউয়ের মতো প্রশ্ন জেগে উঠছে, “কী হল? কী হয়েছে?” অথচ আমরা কেউ জানি না, এ-সব কেন হচ্ছে!

মণিজেঠা আমাদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ, এগিয়ে গিয়ে বললেন, “হ্যাঁ রে ঘন্টু, হলটা কী? বাপটাকে পিটিয়ে মেরে ফেলবি নাকি!”

“আপনি জানেন না দাদা, এই মিনসে তলে তলে আমাদের কত বড় সর্বনাশ করে বসে আছে!” দিলীপদার দ্বিতীয় পক্ষ ঘন্টুর মা চেঁচিয়ে উঠল।

চমকে উঠলাম আমরা। দিলীপদার মতো নির্বিবাদী মানুষ কোনও দিন কারও ক্ষতি করতে পারে বলে আমাদের ধারণা ছিল না। অথচ এরা মা-ছেলে দু’জন মিলে কী সব অভিযোগ করছে! নিরীহ লোকটা আক্রমণের মুখে পড়ে একটা কথাও বলছে না, শুধু অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

ঘন্টু এদিকে উন্মত্তের মতো দোকানের ভেতরটা ভাঙচুর করে চলেছে। যে লোকটা দাড়ি কামাতে এসেছিল, ভয়ের চোটে সে চেয়ার ছেড়ে পালাল।

তাণ্ডবের কার্যকারণ বুঝতে না পেরে আমরা যখন মুখ চাওয়াচাওয়ি করছি, তখন হারানকাকার দোকানের বেঞ্চি ছেড়ে দুলাল দত্ত নামের সেই ভদ্রলোক এগিয়ে এসে বলল, “আপনারা এখানে এভাবে ভাঙচুর করতে পারেন না, এই সেলুন আমি কিনে নিয়েছি। কালই পজ়েশন নেব।”

দিলীপদার বৌ আর ছেলে ঘন্টুর মুখেচোখে বিস্ময়। ঘন্টু ভাঙচুর থামিয়ে এগিয়ে এল, “ও! তালে আপনি কিনেছেন? কিন্তু কিনেছেন বললেই তো হবে না, আমাদের না জানিয়ে ওই বুড়ো ভাম বিক্রি করেছে, আমরা সেলুন দেব না।”

দুলালবাবু শিরদাঁড়া টান-টান করে দাঁড়ালেন। তাঁর দাঁড়ানোর ভঙ্গি দেখেই বোঝা যাচ্ছে তিনি সহজ মানুষ নন। “শোনো ভাই, এ-দোকানের কাগজপত্র উকিলকে দিয়ে যাচাই করিয়ে, তার পরে নগদ এগারো লক্ষ টাকা দিয়ে দিলীপবাবুর কাছ থেকে দোকানটা কিনেছি। দলিল আমার কাছে আছে। তা ছাড়া কাউন্সিলার, থানার দারোগা মায় তোমার মনিব সাধন সামন্ত পর্যন্ত কাটমানি খেয়েছে। সেলুন তুলে দিয়ে আমি এগ রোল, চাউমিনের দোকান করব। এখানে দাঁড়িয়ে একদম পেঁয়াজি করবে না। এক্ষুনি আমার দোকান থেকে বেরোও।”

আমরা সবাই হাঁ করে তাকিয়ে আছি, যেন সামনের মঞ্চে এক টান-টান নাটক অভিনীত হচ্ছে। শেষ অঙ্কের এই তীব্র নাটকীয় মোচড় আমরাও হজম করতে পারিনি। দিলীপদা তলে তলে এ-দোকান বিক্রি করে দিয়েছে আর আমরাকেউ ঘুণাক্ষরেও তা জানতে পারিনি! অন্তুর মতো এলাকার গেজ়েটও ফেল মেরে গেল!

কিন্তু দিলুদা দোকানবেচল কেন? ইদানীং সেলুনটা খুব একটা লাভজনক না থাকলেও ঢিকিয়ে ঢিকিয়ে চলত, আয়ও তো হত যৎসামান্য!

দুলালবাবুর নাটকীয় ঘোষণার পর যখন আমরা ভাবছি নাটক সমাপ্তির যবনিকাপাত হয়ে গেল বুঝি, চাপা গুঞ্জন তুলে আমোদগেঁড়ে মানুষের ভিড়টাও যখন ধীরে ধীরে হালকা হয়ে আসছিল, তখনই ঘটল এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা যাএই দৃশ্যশ্রাব্য নাটকীয় কাহিনির অন্তিম মোচড়!

অক্ষম রাগে ঘন্টু আর তার মা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল দিলীপদার উপর। গোবেচারা মানুষটা যখন এলোপাথাড়ি লাথি-চড়-কিল-ঘুসির বর্ষণে চোখেমুখে অন্ধকার দেখতে শুরু করেছে, তখনই অন্য একটি কান্না-জড়ানো তীব্র মেয়েলি কণ্ঠ ছিটকে বেরিয়ে এল, “তোমরা কেউ ওরে মারবা না, মানুষটার কোনও দোষ নাই গো।”

আমরা সবিস্ময়ে দেখলাম, হারানকাকার দোকান থেকে প্রতিমাদি ছুটে এসে দিলীপদাকে জড়িয়ে ধরেছে। প্রবল প্রহারের হাত থেকে বাঁচাতে চাইছে মানুষটাকে। দিলীপদার পাওনা মারগুলো নীরবে পিঠ পেতে গ্রহণ করছে এই মহিলা!

আমরা হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। ভাবছি, জীবন-নাটকের এই তীব্র মোচড় এই দু’জনে মিলে কবে লিখে ফেলল! দিলুদা কি তবে জীবনে শুধুই একটু ভালবাসার ছোঁয়া চেয়েছিল, তাই সেই স্নিগ্ধ স্পর্শের টানে এই মাঝবয়সে এসে জীবনের সমস্ত পাকা হিসেব-নিকেশ তুচ্ছ করে দিতে পারল! একটা ভয়ঙ্কর ঝড়ের সামনে দাঁড়াতে হবে জেনেও এতটুকু দ্বিধা করল না!

ধীরে ধীরে প্রতিমাদি দিলীপদাকে মাটি থেকে তুলে তার মুখে মাথায় বুলিয়ে দিল শাড়ির আঁচল। দিলীপদার চোখে জল, প্রতিমাদিও অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলছে, “চলো, আমরা আমাদের ঘরে ফিরে যাই গো।”

সকলের ফ্যালফেলে দৃষ্টির সামনে দিয়ে ওরা দু’জনে ধীরপায়ে হেঁটে চলেছে সুভাষ কলোনির দিকে। আমরা বুঝতে পারছি, ঝঞ্ঝাবিধ্বস্ত দিলীপদার ত্রাণ নিয়ে আগেই প্রস্তুত ছিল এই নারী। ওদের পারস্পরিক সমবেদনার সম্পর্ক কবে যে ভালবাসায় পল্লবিত হয়েছে, আমরা জানতেও পারিনি। সম্ভবত এভাবেই বঙ্গোপসাগরের ভিতর কোথাও সবার অলক্ষ্যে নীরবে কোনও ঝড়ের জন্ম হয়। সেই ভয়ঙ্কর ঝড়ের জন্মের গোপন কাহিনির হদিস কে আর পায়!

ফের দমকা হাওয়া ছেড়েছে। দিলীপদার ডান হাত ত্রাণকর্ত্রীর ছোট কাঁধখানি আঁকড়ে ধরেছে, যেভাবে ঘর-হারানো মানুষ নতুন করে খড়কুটো আঁকড়ে ধরে বাঁচে।


এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Bengali Short Story Short story

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy