Advertisement
E-Paper

ধর তক্তা মার ফাঁসি

বইমেলার হুজুগকে পিছনে ফেলে দুনিয়ায় লেটেস্ট চলছে মৃত্যুদণ্ড অপেরা। এখন আবেগমথিত গলাবাজির সময়, অপরাধীদের পিটিয়ে তক্তা করে কবরে পাঠানোর ডাক দেওয়ার কাল। একদা ফিল্ম ফেস্টে ‘আ শর্ট ফিল্ম অ্যাবাউট কিলিং’ দেখে আবেগে মাখোমাখো হওয়া, ‘চোখের বদলে চোখ নিলে গোটা দুনিয়া এক দিন অন্ধ হয়ে যাবে’ বলে আপ্তবাক্য ঝাড়া এখন তামাদি, প্রত্নতত্ত্বের বিষয়।

সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০০:০০

বইমেলার হুজুগকে পিছনে ফেলে দুনিয়ায় লেটেস্ট চলছে মৃত্যুদণ্ড অপেরা। এখন আবেগমথিত গলাবাজির সময়, অপরাধীদের পিটিয়ে তক্তা করে কবরে পাঠানোর ডাক দেওয়ার কাল। একদা ফিল্ম ফেস্টে ‘আ শর্ট ফিল্ম অ্যাবাউট কিলিং’ দেখে আবেগে মাখোমাখো হওয়া, ‘চোখের বদলে চোখ নিলে গোটা দুনিয়া এক দিন অন্ধ হয়ে যাবে’ বলে আপ্তবাক্য ঝাড়া এখন তামাদি, প্রত্নতত্ত্বের বিষয়। আমাদের স্মৃতি সাড়ে তিন দিনের, আবেগ মূলত টাইম-কলের জল, অবস্থানের নাম যখন-যেমন-তখন-তেমন। টি-টোয়েন্টির ঠেলায় ক’দিন আগের ওয়ান-ডে সিরিজের কথাই বেমালুম ভুলে গেছি, ছ’মাস আগের ব্যাপম কেলেংকারি এখন বিস্মৃতির বিশ বাঁও জলের নীচে, তো সেই ক্লাস সিক্সের টেক্সট বইয়ের মানবাধিকার। দিন কতক আগে গ্রিসের উপকূলে ফুটফুটে আয়লানের পড়ে থাকা মৃতদেহ নিয়ে নাকের-জলে চোখের-জলে হওয়া এখন ইতিহাস, বরং জার্মানিতে উদ্বাস্তুরা শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটানোর পর প্রবাদপ্রতিম শার্লি এবদো ব্যঙ্গচিত্র ছাপছে, আয়লান কী ভাগ্যিস বাঁচেনি, কারণ বড় হলেই ব্যাটা নির্ঘাত ধর্ষক হত। হিউমার-টিউমারের আড়ালে বক্তব্য পরিষ্কার, শত্তুরের শেষ রাখতে নেই, অপরাধী এবং সম্ভাব্য অপরাধীদের ঝাড়েবংশে উচ্ছেদ করা হলেই চিরশান্তি। এখন দুনিয়া জুড়ে আমরা সব্বাই ধর-তক্তা-মার-পেরেক পন্থী। রণে বনে টেলিভিশনে, জলে জঙ্গলে ও শপিং মলে দেওয়াল লিখন পরিষ্কার: ঘৃণ্য অপরাধীদের কোনও মানবাধিকার নেই, তাদের ঝুলিয়ে দিয়ে সামনের সিট থেকে সিটি দেওয়াই সভ্যতার পরাকাষ্ঠা।

এই গলা-কাঁপানো লেকচারের স্রোতস্বিনী থেকে এতদ্দ্বারা যা বোঝা যাচ্ছে: এ দিন-দুনিয়ায় মানবাধিকার শুধু ভাল ভাল লোকেদের জন্য বরাদ্দ। সোজা ভাষায়, মানবাধিকার মানে শুধু আমার সুইট ছোটমেসো আর আদরের রাঙামাসির অধিকার, কারণ দুনিয়ার বাদবাকি সব বদ— যুক্তিপরম্পরা মূলত এই। ফলত আশা করা যাচ্ছে, ক্রমে ক্রমে অ্যাম্ফিথিয়েটার থেকে গ্যাস চেম্বার পর্যন্ত সব কিছু এক দিন মানবাধিকারসম্মত বলে প্রমাণিত হবে, কারণ কেউ না কেউ সমকালে নির্ঘাত ইহুদি বা গ্ল্যাডিয়েটরদের বদ ভেবেছে, নইলে আর মরতে পাঠাল কেন। অতঃপর যেখানে মোসায়েবদের জন্য আলাদা হিসেব-নিকেশ হয়, ক্লাসের লাস্ট বেঞ্চের বাঁদর ছেলের জন্য অধিকারের সংজ্ঞা বদলে যায়, মূর্খের জন্য বদলায় স্বাধীনতার মানে, সে জায়গাই নিঃসন্দেহে এক দিন হয়ে উঠবে মানবাধিকারের পীঠস্থান। আর, যারা আইন ভাঙে, তারা বিপ্লবীই হোক আর চোর-ডাকাত, এই আদর্শ স্বর্গরাজ্যে সে ব্যাটাদের জন্য বরাদ্দ হবে পাইকারি রেটে ফাঁসিকাঠের ওষুধ, গিলোটিনের রেশন ব্যবস্থা। বলা বাহুল্য, এই সব কেসে খুনের বদলে খুন মেনে নিয়ে আবেগের টাইম-কলে ভেসে গেলে মৃত্যুদণ্ডবিরোধিতার কোনও ক্ষতি নেই, কারণ আইনি ভাষায় এরা হল ‘বিরলের মধ্যে বিরলতম’, আর যেহেতু ব্যতিক্রমই নিয়মের প্রমাণ, তাই মানবাধিকার চর্চায় এর নাম মৃত্যুদণ্ডের আর্ষ প্রয়োগ।

bsaikat@gmail.com

saikat bandopadhay

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy