চাঁদের বুকে আগামী ৫ অগস্ট সকালে (আমেরিকার সময়) আছড়ে পড়বে একটি রকেট। ঘণ্টায় তার গতি থাকবে ৮,৭০০ কিলোমিটার। স্পেসএক্সের ওই পরিত্যক্ত রকেট আছড়ে পড়ার ফলে চাঁদে তৈরি হতে পারে বিশাল গহ্বর। তাতে পৃথিবী বা চাঁদের যে খুব একটা ক্ষতি হবে, তা নয়। তবে মানুষের এ ধরনের কাজ নিয়ে একটা তর্ক-বিতর্ক তৈরি হয়েছে বটেই। প্রশ্ন, মানুষ কি আদৌ এ ভাবে চাঁদে মহাকাশ-বর্জ্য ফেলতে পারে? সেই অধিকার কি তার রয়েছে? এতে চাঁদের পরিবেশের কতটা ক্ষতি হবে?
২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে রকেটটি উৎক্ষেপণ করেছিল স্পেসএক্স। দু’টি বাণিজ্যিক লুনার ল্যান্ডার নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পাঠিয়ে রকেটের কাজ শেষ হয়েছে। পৃথিবীতে ফিরে আসার মতো আর জ্বালানি নেই তাতে। নিত্য কক্ষপথ পরিবর্তন করে ঘুরছিল সে। অবশেষে চাঁদের মাধ্যাকর্ষণের মধ্যে প্রবেশ করেছে। এ বার সেখানে আছড়ে পড়বে রকেটটি। আর তা দেখার জন্যই মুখিয়ে রয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
এর আগে অনেক ধূমকেতুই চাঁদে আছড়ে পড়েছে। কিন্তু তা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়নি বিজ্ঞানীদের। এ বার বিজ্ঞানীরা সেই সুযোগই পাবেন। চাঁদে ওই রকেট আছড়ে পড়লে কী হবে, তা প্রত্যক্ষ করবেন তাঁরা। রকেটের গতি হিসেব করে সেই সময়কালও ধার্য করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা দেখবেন, রকেটটি চাঁদে আছড়ে পড়লে কী ভাবে ধুলো (চাঁদের ধুলো রেগোলিথ নামে পরিচিত) ওড়ে, কী ভাবে গহ্বর তৈরি হয়। তাঁদের ধারণা, ২০ থেকে ৩০ মিটার গভীর গর্ত তৈরি হতে পারে।
চাঁদে পৃথিবীর মতো বায়ুমণ্ডল নেই। ফলে সেখানকার ভূপৃষ্ঠে কোনও দাগ তৈরি হলে তা মুছে যায় না। যেমন, প্রায় ৫০ বছর আগে চাঁদে অ্যাপোলো অভিযানের চিহ্ন আজও বর্তমান। কোনও হস্তক্ষেপ না হলে আগামী হাজার বছর তা থেকে যাবে। একই ভাবে ৫ অগস্ট চাঁদের বুকে রকেটের যে ক্র্যাশ ল্যান্ডিং হবে, তার চিহ্নও থেকে যাবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের আরও মহাকাশ বর্জ্য বা রকেটের ভগ্নাংশ চাঁদে আছড়ে পড়তে পারে। প্রশ্ন উঠছে, এই বিষয়টিকে নিয়ন্ত্রণ করবে কে? এ ধরনের বর্জ্য সেখানে ফেলে দেওয়ার অধিকার কি রয়েছে মানুষের? চাঁদের মানুষের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পৃথিবীতে কোনও আইনই নেই। তার ফল কি ভুগবে পৃথিবীর উপগ্রহ?
বিভিন্ন দেশের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা চাঁদে তাদের কেন্দ্র গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। চাঁদে খনিজ রয়েছে কি না, তা নিয়ে গবেষণা চালাতে চায় বেসরকারি বাণিজ্যিক সংস্থাগুলি। মোদ্দা কথা, বিভিন্ন গবেষণার লক্ষ্য হল চাঁদের বুকে মানুষের স্থায়ী বসতি গড়ে তোলা। চাঁদে এ ভাবে পরিত্যক্ত রকেট আছড়ে পড়তে থাকলে যে ধুলো উড়বে, তাতে ভবিষ্যতের গবেষণা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। চাঁদের উপরে নজর রাখছে এমন উপগ্রহেরও ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। বিজ্ঞানীদের একাংশের আশঙ্কা, উপগ্রহটি আছড়ে পড়ার কারণে ধুলো উড়ে চাঁদের মাটিতে মানুষের প্রথম পায়ের ছাপ মুছে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইতিহাস মুছে যাবে।
১৯৬৭ সালের ‘আউটার স্পেস চুক্তি’ অনুসারে পৃথিবীর কোনও দেশ একক ভাবে চাঁদের উপর সার্বভৌমত্ব ফলাতে পারে না। তবে ওই চুক্তিতে চাঁদের পরিবেশরক্ষার বিষয়ে কোনও নীতির কথা বলা নেই। মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রগুলি পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে চাঁদের যাতে কোনও ক্ষতি না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে সংশ্লিষ্ট দেশকেই। এ ক্ষেত্রে ইলন মাস্কের সংস্থা স্পেস এক্সের রকেট যে চাঁদে আছড়ে পড়ছে, তার দায় বর্তায় আমেরিকার উপরেই।
অনেক পরিত্যক্ত রকেটই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। নয়তো ঘুরে বেড়ায় পৃথিবীর কক্ষপথে। কিছু অংশ ঘুরে বেড়ায় মহাকাশে। তার পরে মহাজাগতিক বস্তুর সঙ্গে হয়তো ঘটে তার সংঘর্ষ। প্রশ্ন উঠছে, এ ভাবে মহাকাশ-বর্জ্য ক্রমে বাড়তে থাকলে পরিণতি কী? বিজ্ঞানীদের একাংশের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে কোনও মহাকাশযানের সঙ্গেও সংঘর্ষ হতে পারে তার। সেক্ষেত্রে বিপদ বাড়তে পারে। তাই তাঁদের মতে এই মহাকাশ-বর্জ্য পরিকল্পনা করে নিষ্কাশনের প্রয়োজন।