Advertisement
E-Paper

মঙ্গলে ধাক্কা খেয়ে ধ্বংস হবে তার উপগ্রহ? এগোচ্ছে সে দিকেই, লাল গ্রহে মিলল আরও এক চাঁদের মৃত্যুর প্রমাণ!

বর্তমানে মঙ্গলের দু’টি উপগ্রহ রয়েছে— ফোবোস এবং ডিমোস। বিজ্ঞানীদের দাবি, অতীতে দু’টি নয়, মঙ্গলের একটিই বড়সড় উপগ্রহ ছিল। তা ধ্বংস হওয়ার পর দু’টি তুলনামূলক ছোট উপগ্রহ তৈরি হয়েছে।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ৩১ জুলাই ২০২৬ ০৯:০৪
ধ্বংসের পথে এগোচ্ছে মঙ্গলের উপগ্রহ!

ধ্বংসের পথে এগোচ্ছে মঙ্গলের উপগ্রহ! —প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।

পৃথিবীর পড়শি গ্রহ মঙ্গলে একসময় টলটলে জল ছিল, উথালপাথাল করত সমুদ্র— বিজ্ঞানীরা আগেই সে কথা বলেছেন। তার একাধিক প্রমাণও মিলেছে। কিন্তু মঙ্গলের এক হারানো উপগ্রহ নিয়ে সম্প্রতি বিজ্ঞানীদের কৌতূহল বেড়েছে। শুধু তা-ই নয়, বর্তমান উপগ্রহগুলির একটিও অতীতের দেখানো সেই হারিয়ে যাওয়ার পথেই হাঁটতে চলেছে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা। মঙ্গলের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে তা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে আগামী কয়েক কোটি বছরের মধ্যেই।

বর্তমানে মঙ্গলের দু’টি উপগ্রহ— ফোবোস এবং ডিমোস। বৃহত্তর ফোবোসের ব্যাস মেরেকেটে ২২ কিলোমিটার। মঙ্গল গ্রহ থেকে ছ’কিলোমিটার দূরে নিজস্ব কক্ষপথে তা ঘুরে চলেছে। মঙ্গলকে প্রদক্ষিণ করতে ফোবোসের আট ঘণ্টারও কম সময় লাগে। এ ছাড়া, দ্বিতীয় উপগ্রহ ডিমোস ১৫ কিলোমিটার ব্যাসবিশিষ্ট এবড়োখেবড়ো একটি পাথরখণ্ড মাত্র। ২৩ হাজার কিলোমিটার দূরের কক্ষপথ ধরে মঙ্গলকে প্রদক্ষিণ করতে ডিমোস সময় নেয় ৩০ ঘণ্টা। বিজ্ঞানীদের দাবি, অতীতে দু’টি নয়, মঙ্গলের একটিই বড়সড় উপগ্রহ ছিল। তা ধ্বংস হওয়ার পর দু’টি তুলনামূলক ছোট উপগ্রহ তৈরি হয়েছে। মঙ্গল থেকে সংগৃহীত একাধিক নমুনা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এই ধারণায় পৌঁছেছেন।

চাঁদের হারিয়ে যাওয়া উপগ্রহের কথা প্রথম বলেছিলেন তিন বাঙালি বিজ্ঞানী। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর অধীন অহমদাবাদের ফিজ়িক্যাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি (পিআরএল) থেকে মঙ্গলের শিলাস্তর, গেল ক্রেটারের খুঁটিনাটি নিয়ে গবেষণা করেন প্রিয়ব্রত দাস, অমিত বসু সর্বাধিকারী এবং রঞ্জন সরকার। তাঁরাই প্রথম দেখিয়েছিলেন, লাল গ্রহের শিলাস্তরে জোয়ার-ভাটার চিহ্ন রয়েছে। সেখানেই লুকিয়ে হারানো গ্রহের রহস্য।

মঙ্গলের খুঁটিনাটি অন্বেষণের উদ্দেশ্যে আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা সেই গ্রহে পাঠিয়েছিল কিউরিওসিটি রোভার। তার পাঠানো তথ্য বিশ্লেষণ করেই হারিয়ে যাওয়া গ্রহের তত্ত্বে কার্যত সিলমোহর দেন বিজ্ঞানীরা। সুইৎজ়ারল্যান্ডের বার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নিকোলাস টমাস, গ্রহবিজ্ঞানী জোল বেকারেলি এবং ইগনেটিয়াস আর্গাডেস্টিয়ার নেতৃত্বে সম্প্রতি মঙ্গলের জল, নদী, সমুদ্র সংক্রান্ত প্রামাণ্য উপাদান নিয়ে আরও একটি গবেষণা হয়েছে। তার ফল প্রকাশিত হয়েছে গত জানুয়ারিতে, এনপিজে স্পেস এক্সপ্লোরেশন জার্নালে। তাঁরাও প্রাচীন মঙ্গলকে প্রদক্ষিণকারী উপগ্রহের কথা মেনে নিয়েছেন। বিজ্ঞানীদের দাবি, প্রায় ৩০০ কোটি বছর আগে মঙ্গলে প্রচুর জল ছিল। নির্দিষ্ট অংশে ব-দ্বীপের মতো চিহ্নও আবিষ্কার করা হয়েছে।

মঙ্গলের নিরক্ষরেখার ঠিক দক্ষিণে, যেখানে দক্ষিণের উচ্চভূমি উত্তরের সমভূমির সঙ্গে মিলিত হয়েছে, সেখানে রয়েছে বিশাল এক গর্ত— গেল ক্রেটার। নাসার রোভারটি সেখানে দীর্ঘদিন ঘুরে বেড়িয়েছে। ২০১৭-১৮ সালে কিউরিওসিটি গেল ক্রেটারের ভিতরে অবস্থিত মাউন্ট শার্পের নিচু ঢালে টানা চার দিন কাটিয়েছিল। সেখানে ‘ভেরা রুবিন রিজ’ নামের একটি শিলাস্তর অন্বেষণ করে চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া গিয়েছে। দেখা গিয়েছে, ওই অঞ্চলের পাথর সুশৃঙ্খল কিছু স্তরে বিন্যস্ত। সেই বিন্যাস বার বার ফিরে এসেছে পাথরের গায়ে। এই শিলাস্তর বিশ্লেষণ করেই পৃথিবীর জোয়ার-ভাটার সঙ্গে তার সাদৃশ্য পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন, একসময়ে মঙ্গলে শুধু সমুদ্রই ছিল না, বরং সেখানে পৃথিবীর মতোই নিয়মিত জোয়ার-ভাটাও হত! প্রিয়ব্রত এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘আমরা গবেষণায় এমন কিছু শিলার অংশ খুঁজে পেয়েছি, যাতে বিশেষ এক ধরনের পাললিক কাঠামো রয়েছে। মঙ্গলে এটা আগে কখনও দেখা যায়নি। এগুলোর সঙ্গে পৃথিবীর জোয়ার-ভাটার অনেক মিল। শিলাগুলিতে স্পষ্ট, গাঢ় স্তরায়ন রয়েছে। পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটার ক্ষেত্রে এই বিন্যাস খুব স্বাভাবিক।’’

পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটার নেপথ্য চালক চাঁদ। চাঁদের আকর্ষণেই নদী বা সমুদ্রের জল কখনও ফুলে ওঠে, কখনও নেমে যায়। কিন্তু তা সম্ভব হয় শক্তিশালী উপগ্রহের কারণেই। মঙ্গলে জোয়ার-ভাটা ঘটানোর মতো কোনও শক্তিশালী উপগ্রহই নেই। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন, ফোবোস বা ডিমোসের পক্ষে মঙ্গলের প্রাচীন সমুদ্রের জলে কোনও প্রভাব খাটানো সম্ভব নয়। সেখান থেকেই তাঁদের ধারণা, অতীতে এমন কোনও উপগ্রহ মঙ্গলকে প্রদক্ষিণ করত, যা পৃথিবীর চাঁদের মতো শক্তিশালী। তার প্রভাবেই লালগ্রহের সমুদ্রের জল কখনও জোয়ারে ফুলে উঠত, কখনও ভাটায় নেমে যেত।

সুইস গবেষণায় দাবি, মঙ্গলের প্রাচীন সমুদ্রটি ছিল পৃথিবীর উত্তর মেরুসাগরের মতো। গ্রহের উত্তর গোলার্ধের অধিকাংশ জুড়ে ওই সমুদ্রের অস্তিত্ব কল্পনা করা হয়। বর্তমানে যাকে গেল ক্রেটার বলা হচ্ছে, সেখানে প্রাচীন এক হ্রদ ছিল বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা। জোয়ার-ভাটায় সেখানেও জলের অবিরাম ওঠানামার প্রমাণ মিলেছে। গবেষকদের মতে, এই ধরনের জোয়ার-ভাটা ঘটাত যে উপগ্রহ, তার ভর ফোবোসের ভরের অন্তত ১৫ গুণ বেশি হওয়া উচিত। মঙ্গল থেকে সম্ভবত তার দূরত্ব ছিল প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার। আমেরিকার লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক সুনীতি করুণাতিল্লেকে মার্কিন জিওফিজ়িক্যাল ইউনিয়নের বার্ষিক সম্মেলনে এই সংক্রান্ত গবেষণা উপস্থাপন করেছিলেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘‘মঙ্গলের শিলাস্তরে আমরা যে সমস্ত বৈশিষ্ট্য দেখতে পাচ্ছি, তা কেবল ফোবোস বা ডিমোসের কাজ নয়। আরও বড় কোনও মহাজাগতিক বস্তু এর সঙ্গে জড়িত ছিল। তা টুকরো টুকরো হয়ে আজকের দুই উপগ্রহ তৈরি করেছে।’’

মঙ্গলের সেই বৃহত্তর উপগ্রহ তা হলে গেল কোথায়? কী ভাবে তা হারিয়ে গেল? এ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে লাল গ্রহের উপগ্রহচক্র সম্বন্ধেও বিশেষ তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। বিজ্ঞানীদের দাবি, জোয়ার-ভাটার টানেই ধীরে ধীরে বৃহত্তর উপগ্রহটি মঙ্গলের কাছে এগিয়ে এসেছিল। গ্রহের মহাকর্ষের প্রভাবে একসময় তা ভেঙে যায় এবং সেই ধ্বংসাবশেষের বলয় থেকে পরে ছোট ছোট দু’টি উপগ্রহ তৈরি হয়। ফোবোস, ডিমোসের মধ্যেই সেই ধরনের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। আসলে মঙ্গলের উপগ্রহগুলি স্থায়ী হয় না। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ফোবোস ধীরে ধীরে মঙ্গলের কাছে এগিয়ে যাচ্ছে। আগামী কয়েক কোটি বছরের মধ্যে তা মূল গ্রহের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যেতে পারে। তার বিপরীতে ডিমোস আবার ধীরে ধীরে দূরে সরছে। একসময় তা মঙ্গলের মহাকর্ষের পরিধি ছাড়িয়ে বেরিয়েও যেতে পারে। কোনও সম্ভাবনাই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। পড়শি গ্রহে আরও অভিযান বিজ্ঞানীদের পরিকল্পনায় রয়েছে। জাপান থেকে ২০২৬ সালের শেষ দিকে মঙ্গলে পাঠানো হবে মহাকাশযান। ‘মার্শিয়ান মুন্‌স এক্সপ্লোরেশন’ নামের সেই অভিযানের কেন্দ্রে থাকবে মঙ্গলের উপগ্রহদ্বয়। সেখান থেকেও বিবিধ নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

mars Space Science Scientific Research Moon

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy