প্রাণীজগতে বুদ্ধির জোর কি একমাত্র মানুষেরই? শিম্পাঞ্জি, ডলফিন, হাতির মতো প্রাণীরা আগেই সেই ধারণায় জল ঢেলেছে। এ বার বুদ্ধিমানদের তালিকায় যোগ হল আরও এক নাম— জিরাফ! বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে শুধু তাদের বুদ্ধিই নয়, গণিতবিদ্যায় ‘পারদর্শিতা’র পরিচয়ও পেয়েছেন।
সম্প্রতি জিরাফের বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষা হয় স্পেনের একটি গবেষণায়। বিজ্ঞানীদের দাবি, জিরাফ অঙ্কের প্রাথমিক ধাপ, অর্থাৎ সরলতম যোগ নিজেরাই করতে পারে। মনে মনে সংখ্যার সঙ্গে সংখ্যা জুড়ে যোগফলের একটি ধারণা তারা করে নেয় সহজেই। তবে বিয়োগে আবার তারা বেশ কাঁচা।
ঠিক কোন ধরনের পরীক্ষা থেকে জিরাফের এই আচরণ এবং গণিতবিদ্যা সম্পর্কে নিশ্চিত হলেন বিজ্ঞানীরা? স্পেনের বার্সেলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইকের লয়ডির নেতৃত্বে একদল গবেষক পরীক্ষাটি করেছেন। তাঁদের গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্ট্স’ নামক জার্নালে। পরীক্ষামূলক ভাবে তাঁরা চারটি জিরাফের সামনে একটি নিচু টেবিলে তিনটি পাত্র রেখেছিলেন। তিনটিতেই ছিল গাজরের টুকরো। পাত্রগুলি এমন ভাবে রাখা হয়েছিল, যাতে জিরাফগুলি সরাসরি পাত্রের ভিতরের উপাদান দেখতে না পায়।
আরও পড়ুন:
প্রথম দু’টি পাত্রের ঢাকনা খুলে পাঁচ সেকেন্ডের জন্য জিরাফগুলিকে দেখানো হয়েছিল ভিতরের গাজর। তার পর তৃতীয় পাত্র থেকে তিনটি গাজর বার করে প্রথম পাত্রে ঢেলে দেওয়া হয়। পাত্রগুলি এর পর এগিয়ে দেওয়া হয় জিরাফদের সামনে। দেখা যায়, পাঁচ সেকেন্ডের সেই স্মৃতি ধরে রেখেই জিরাফগুলি প্রথম পাত্রটিকে বেছে নিয়েছে, যেখানে বেশি সংখ্যক গাজর রয়েছে। এক বার নয়, বার বার তাদের বাছাইয়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। দুই- তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রেই জিরাফেরা সঠিক পাত্রটিকে বেছে নেয়। গবেষকদের দাবি, এটি শুধুমাত্র আন্দাজ নয়। তিনটি গাজর মনে মনে যোগ করে নিয়েছিল তারা। এর আগে কোনও জিরাফের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা করে দেখা হয়নি। তবে বানর বা শিম্পাঞ্জিদের এই ধরনের পারদর্শিতার প্রমাণ মিলেছে। খুরযুক্ত কোনও স্তন্যপায়ী প্রাণীই এই গণনার পরীক্ষায় পাশ করতে পারেনি এর আগে।
তবে একই জিরাফের ক্ষেত্রে উল্টো পরীক্ষায় কিন্তু ফলাফল ভিন্ন। যোগ করার পরিবর্তে যখন পাত্র থেকে তিনটি গাজর তুলে নেওয়া হল, তখন আর সঠিক পাত্রটি তারা খুঁজে নিতে পারল না। অর্থাৎ, বিয়োগে তারা একেবারেই সড়গড় নয়। এ ক্ষেত্রে মানবশিশুর সঙ্গে জিরাফের কিছুটা মিল পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। সাধারণত, যোগের চেয়ে বিয়োগ করা তুলনামূলক কঠিন। শিশুরা যখন অঙ্ক শেখে, প্রথমে যোগ শেখানো হয়। বিয়োগ শিখতে তুলনামূলক বেশি সময় লাগে। বিজ্ঞানীদের দাবি, স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়াকরণের পরিবর্তে মস্তিষ্কের ধীর বিবেচনার সঙ্গে যুক্ত অঞ্চলগুলির উপর বিয়োগ নির্ভর করে। জিরাফদের সেই অংশ বিকশিত নয়। লয়ডির কথায়, ‘‘মানুষের ক্ষেত্রে আমরা যা দেখি, তার সঙ্গে জিরাফের গবেষণার এই ফলাফলগুলি সাদৃশ্যপূর্ণ। সংখ্যার সমস্যা সমাধানে মানুষের ক্ষেত্রেও ব্যক্তিবিশেষে পার্থক্য রয়েছে। সাধারণ ভাবে আমাদের কাছে যোগের চেয়ে বিয়োগ বেশি কঠিন।’’
আরও পড়ুন:
লয়ডিদের পরীক্ষা নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন, জিরাফগুলি আদৌ মনে মনে গাজরের সংখ্যা যোগ করেছিল? না পাত্রের উপর মানুষের হাতের স্পর্শ অনুসরণ করছিল? এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে একাধিক পাত্র স্পর্শ করেছিলেন গবেষকেরা। প্রতি ক্ষেত্রেই বেশি গাজর সম্পন্ন পাত্রটি জিরাফেরা বেছে নিয়েছে।
জিরাফদের মধ্যে এই সংখ্যাগত দক্ষতার বিকাশ ঘটল কেন? মূলত আফ্রিকার সাহারা মরুভূমি সংলগ্ন এলাকাই জিরাফদের স্বাভাবিক বাসস্থান। লয়ডিদের ব্যাখ্যা, বনে-জঙ্গলে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে বাস করে জিরাফ। সেই দল কখনও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, কখনও আবার একত্রিত হয়। সাভানা তৃণভূমি জুড়ে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা গাছপালা, বিশেষত বাবলা গাছ তাদের প্রধান খাদ্য। সংখ্যা এবং খাবারের পরিমাণের মোটামুটি হিসাব রাখার প্রয়োজনে জিরাফের মধ্যে গণনার ক্ষমতা বিকশিত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে স্পেনের গবেষকদের মতে, জিরাফ ছাড়াও অন্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা করে দেখা দরকার। জিরাফের দক্ষতা পরখ করার জন্য নিত্যনতুন আরও গবেষণা প্রয়োজন বলেও তাঁরা মনে করেন। জিরাফদের সংখ্যাবোধ কত দূর পর্যন্ত বিস্তৃত, নতুন গবেষণা থেকে সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যেতে পারে।