বিজ্ঞানের সহজ রূপ এবং তার মানবিক প্রয়োগের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বড়সড় বদল— এই মন্ত্রেই আগামী কয়েক বছরে বদলে যেতে পারে এ দেশের সদ্যোজাত-মৃত্যুর চিত্র। কম ওজনের এবং সময়ের আগে জন্মানো শিশুদের নিয়ে পরীক্ষামূলক প্রকল্পে সাফল্য মেলার পরে দেশের হাসপাতালগুলিতে তা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। রবিবার শহরে ‘ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার— ট্রান্সফর্মিং কেয়ার ফর স্মল অ্যান্ড সিক নিউবর্নস’ শীর্ষক আলোচনায় ওই প্রকল্পের কথা তুলে ধরলেন ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ-এর ডিরেক্টর জেনারেল রাজীব বহেল।
লিভার ফাউন্ডেশন আয়োজিত চতুর্থ দিলীপ মহলানবিশ বক্তৃতায় এ দিন উঠে আসে, কী ভাবে ওআরএসের বহুল প্রয়োগ এবং ২০০৩ সালে পুরুলিয়ায় দেশের প্রথম স্পেশাল নিউবর্ন কেয়ার ইউনিটের (এসএনসিইউ) সূচনা হয় দিলীপের হাত ধরে। ২০২৩-২৪ সালে দেশে মোট ১০৫৪টি এসএনসিইউ ছিল। রাজীব জানান, জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সহজ কোনও জিনিসই বড়সড় প্রভাব ফেলতে পারে— দিলীপ মহলানবিশের এই ভাবনা ধরেই ক্যাঙ্গারু কেয়ার প্রকল্পে তাঁরাসাফল্য পেয়েছেন।
উন্নত প্রযুক্তি বা ইনকিউবেটরের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার না করেও মাকে নবজাতকের পরিচর্যার সক্রিয় অংশীদার করা সম্ভব বলে জানান রাজীব। তাঁর কথায়, মায়ের ত্বকের সঙ্গে শিশুর সরাসরি সংস্পর্শ, তাঁর দেহের উষ্ণতা এবং মায়ের দুধ শিশুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মায়ের সঙ্গে থাকা শিশুর নিরাপত্তাবোধ বাড়ায়। এসএনসিইউ-তে নার্সরা শিশুর যত্ন নেন, শুধু খাওয়ানোর জন্য মায়ের কাছে আনা হয়। কিন্তু রাজীবের মতে, ‘‘শিশুর অবস্থার উন্নতি-অবনতি এক জন মা অনেক সময় আরও ভাল বুঝতে পারেন।’’ সাধারণত, কম ওজনের শিশু এসএনসিইউ-তে থাকলে মাকে ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়। ফলে তৈরি হয় বিচ্ছিন্নতা। দু’পক্ষেরই মানসিক চাপ বাড়ে। আন্তর্জাতিক স্তরে একাধিক পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ক্যাঙ্গারু কেয়ারে সদ্যোজাত-মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমানো যায়। কমে সংক্রমণের হারও। পরবর্তী-কালে শিশুদের মানসিক ও বৌদ্ধিক গঠনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
রাজীব জানান, দিল্লির সফদরজং হাসপাতালে তাঁদের পরীক্ষায় ১ থেকে ১ কেজি ৮০০ গ্রাম ওজনের কিছু সদ্যোজাতকে জন্মের ২ ঘণ্টার মধ্যে ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার (কেএমসি) পদ্ধতিতে টানা মায়ের কাছে রাখা হয়। অন্য শিশুদের রাখা হয় এসএনসিইউ-তে। কিছুটা সুস্থ হলে অল্প সময়ের জন্য এবং সম্পূর্ণ স্থিতিশীল হলে টানা কেএমসি-তে রাখা হয়। দেখা যায়, টানা কেএমসি-তে রাখা শিশুদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার ২৫ শতাংশ কম।
এই পদ্ধতির উপযোগিতা প্রমাণিত হলেও তা এখনও সর্বত্র প্রয়োগ করা হয়নি কেন? রাজীব বলেন, ‘‘মা বা পরিবার নয়, সবচেয়ে বড় বাধা আসছে চিকিৎসক ও নার্সদের কাছ থেকে। প্রথমেই কেএমসি-তে না দিয়ে কয়েক দিন পরে সেখানে রাখার প্রবণতা বেশি।’’
সমস্যা রয়েছে পরিকাঠামো নিয়েও। শিশু এসএনসিইউ-তে থাকলে মায়েদের হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দিয়ে তিন ঘণ্টা ছাড়া খাওয়াতে আসতে বলা হয়। কিন্তু তাঁরা কোথায় থাকবেন, কী ভাবে আসবেন, তা দেখা হয় না। রাজীব জানান, শিশুর সঙ্গে মায়ের থাকার ব্যবস্থা এবং সেখানে শৌচাগার, খাওয়া-ঘুমোনোর মতো সাধারণ পরিকাঠামো খুব জরুরি। তাই এখন এসএনসিইউ-র পাশাপাশি এম-এসএনসিইউ (মাদার স্পেশাল নিউবর্ন কেয়ার ইউনিট) তৈরিতে জোর দেওয়া হচ্ছে, যেখানে জন্মের পর মা ও শিশু একসঙ্গে থাকতে পারবে। এই পরীক্ষা ভারত ছাড়াও ঘানা, মালাউই, তানজ়ানিয়া ও নাইজিরিয়াতেও হয়েছে এবং সাফল্য মিলেছে। শুধু মা নয়, বাবা ও পরিবারের অন্যরাও এইপদ্ধতিতে যুক্ত হতে পারেন। তাতে সদ্যোজাতের সঙ্গে তাঁদের বন্ধন আরও দৃঢ় হয়।
‘‘প্রশান্ত মহলানবিশ বলতেন, বিজ্ঞান ও প্রমাণকে দেশের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে। আদর্শ পরিস্থিতিতে কী করা যেতে পারে এবং বাস্তবে সীমিত সম্পদ নিয়ে কী করা সম্ভব, সেটিও ভাবতে হবে,’’ বলেন রাজীব। তাঁর মতে, সেই বাস্তবতার কথা মাথায় রেখেই কেএমসি-কে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।