ছিল। আধুনিক মানুষের জন্মের বহু আগে থেকে ছিল। কিন্তু মানুষের জানা ছিল না। জীব তথা জিন-বিজ্ঞানীরা বনবিড়ালের এমনই এক নতুন প্রজাতির হদিস পেলেন বলিভিয়ায়। শেষ বার বিড়ালের কোনও নতুন প্রজাতির সন্ধান মিলেছিল ১০৩ বছর আগে। এই বিরল এবং গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য ঘিরে বিজ্ঞান এবং পরিবেশবিদ মহলে এখন স্বাভাবিক ভাবেই বেশ চাঞ্চল্য।
বনবিড়ালের নতুন প্রজাতির সন্ধান যে ভাবে পাওয়া গেল, সেটা বেশ চমকপ্রদ। বলিভিয়ার পাওলা নোগালেস-আস্কারান্জ়ের পড়াশোনা এবং গবেষণা প্রকৃতিবিজ্ঞান নিয়ে। একই সঙ্গে ন্যাশনাল জিয়োগ্রাফিকের হয়ে জঙ্গলের প্রাণীদের পর্যবেক্ষণ করতেও ঘুরে বেড়ান বছর বত্রিশের তরুণী। পাওলা ২০১৬ সালে বলিভিয়ারই মেঘে ঢাকা ইয়ুঙ্গাস অভয়ারণ্যে এক জন স্থানীয় মানুষের সঙ্গে একটি বনবিড়াল দেখতে পেয়ে কৌতূহলী হয়ে পড়েন। সাধারণ ‘টাইগার ক্যাট’ গোত্রের বিড়ালের থেকে সেটিকে কেমন যেন অন্য রকম মনে হয় তাঁর।
পাওলার সন্দেহ যে অমূলক ছিল না পরে তা প্রমাণিত হয় জিনপরীক্ষায়। ছবি: রয়টার্স।
দক্ষিণ আমেরিকার নানা দেশেই ‘টাইগার ক্যাট’ গোত্রের বিড়াল দেখতে পাওয়া যায়। নামে ‘টাইগার’ থাকলেও বাঘের সঙ্গে এদের সম্পর্ক খুবই ক্ষীণ। এক কোটি বছরেরও আগে বাঘ এবং বিড়াল একই আদিম প্রজাতির থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। আধুনিক বাঘ এবং বিড়ালের মধ্যে এর থেকে বেশি আর কোনও সম্পর্ক নেই। টাইগার ক্যাটের গায়ের রং এবং ছোপের সঙ্গে চিতাবাঘের সাদৃশ্য আছে বলেই এই নাম প্রচলিত।
পাওলা যে বিড়ালটি দেখে কৌতূহলী হয়েছিলেন, স্থানীয় মানুষেরা তাদের ‘তিল্কায়ো’ বলেন। পাওলার চোখে ধরা পড়ে, অন্য টাইগার ক্যাটেদের সঙ্গে সূক্ষ্ম হলেও এর কিছু বিশেষ অমিল রয়েছে। শুরু হয় অনুসন্ধান। যোগাযোগ করা হয় বিজ্ঞানীদের সঙ্গে। তারই ফলাফল এই আবিষ্কার। টাইগার ক্যাটেদের মধ্যে বিভিন্নতা যে রয়েছে, তা বহু কাল ধরেই চিহ্নিত এবং তাদের আলাদা আলাদা নামের পরিচিতিও ছিল। কিন্তু এগুলিকে চারটি উপপ্রজাতি হিসেবেই গণ্য করতেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু গত বেশ কয়েক বছর ধরে নানাবিধ তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে একে একে চারটিকেই ‘প্রজাতি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পাওলার সংগ্রহ করা বিড়ালটির জিন পরীক্ষা করে এ বছরই প্রমাণ পাওয়া গেল, এটি বাকি চারটির থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং এত দিনের অজানা এক প্রজাতি। এর আগে ১৯২৩ সালে পাম্পাস নামে এক নতুন প্রজাতির বিড়ালের খোঁজ মিলেছিল দক্ষিণ আমেরিকারই উরুগুয়েতে। তার পর ১০৩ বছর পর এই প্রথম। বলিভিয়ায় নতুন পাওয়া প্রজাতিটির নাম রাখা হল লেপার্ডাস তিল্কায়ো।
তিল্কায়ো মাত্র ১৮ ইঞ্চি লম্বা, ওজন ১ কিলো ৪০০ গ্রামের মতো। পোষ্য যে বিড়াল আমরা দেখি, তিল্কায়ো আকারে তার চেয়েও ছোট। গায়ের লোম হালকা খয়েরি। সারা শরীরে ছড়িয়ে আছে চিতাবাঘের মতো ছোপ-ছোপ দাগ। তিল্কায়োর গতিবিধি লক্ষ্য করার জন্য জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়ার পর বিভিন্ন জায়গায় ক্যামেরা লাগানো হয়েছিল। প্রাণীটির জীবনযাপন সম্বন্ধে বিস্তারিত তথ্য এখনও পাওয়া না-গেলেও ক্যামেরাবন্দি ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, মূলত ছোট ইঁদুরই এর খাদ্য।
বলিভিয়ার ইয়ুঙ্গাস অভয়ারণ্য। এখানেই তিল্কায়োর সঙ্গে পাওলার পরিচয়। ছবি: ন্যাশনাল জিয়োগ্রাফিক।
বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্প বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী এবং বিবর্তন বিশেষজ্ঞ জোনাস লেসক্রোয়ার্ট এই গবেষণায় বড় দায়িত্বে ছিলেন। ‘কারেন্ট বায়োলজি’ নামের জার্নালে যে গবেষণাপত্রে নতুন আবিষ্কারের কথা জানানো হয়েছে, পাওলার সঙ্গে একত্রে সেটি লিখেছেন তিনি। জোনাসের বক্তব্য, শুধু চেহারা দেখে টাইগার ক্যাটদের আলাদা করা মুশকিল। আগে মনে করা হত এরা একটাই প্রজাতি। বছর-দশেক আগে দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলের ৩৮টি বিড়ালের ডিএনএ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন, তা নয়। টাইগার ক্যাটদের মধ্যেও জিনগত বৈচিত্রের কারণে আরও আলাদা আলাদা প্রজাতি রয়েছে। জিন পরীক্ষার মাধ্যমেই মোট পাঁচটি প্রজাতির নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেল।
আধুনিক মানব প্রজাতির জন্ম তিন লক্ষ বছর আগে। তিল্কায়োদের আবির্ভাব তার ঢের আগে। জিন বিশ্লেষণে জানা গিয়েছে, ১৪ লক্ষ বছর আগে অন্যান্য টাইগার ক্যাটের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তিল্কায়ো একটি আলাদা প্রজাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। জোনাস বলেন, ‘‘যে কোনও দু’টি প্রজাতির মধ্যে জিনগত পার্থক্য যত বেশি, তারা আলাদা হয়ে গিয়েছে তত আগে। এই সূত্র ধরেই আমরা নতুন প্রজাতির জন্মের সময়কাল অনুমান করেছি।’’
আরও পড়ুন:
এই আবিষ্কারের গুরুত্ব কী? পৃথিবীর জীববৈচিত্রের অনেকখানি এখনও মানুষের অজানা। এখনও অজানা কীট-পতঙ্গ-উদ্ভিদ থেকে শুরু করে অনুজীব আবিষ্কার করে চলেছে মানুষ। জীবনের বিবর্তনকে তুলনামূলক আরও নিখুঁত ভাবে বোঝার ক্ষেত্রে এই আবিষ্কারগুলির গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু সাম্প্রতিক আবিষ্কারটি বিরল। কারণ শুধু বিড়াল তো বটেই, যে কোনও স্তন্যপায়ী প্রাণীরই নতুন প্রজাতি খুঁজে পাওয়াটা সচরাচর ঘটে না। সে দিক থেকেও নতুন আবিষ্কারের আলাদা গুরুত্ব।
বলিভিয়ায় তিল্কায়োকে সন্ধান পাওয়ার পাশাপাশি পেরুর ইয়ুঙ্গাস অরণ্য অঞ্চলেও টাইগার ক্যাটের নতুন একটি উপপ্রজাতির দেখা মিলেছে কিছু দিন আগে। তার নাম রাখা হয়েছে লেপার্ডাস টাইগ্রিনাস আন্টিসুয়ো। আসলে তার বাসস্থান যেখানে, সেখানে আগে ছিল ইনকা সভ্যতার প্রাচীন বসতি আন্টিসুয়ু। এই অঞ্চলের নামেই নতুন প্রজাতির নামকরণ করা হয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজ়ারভেশন অফ নেচার (আইইউসিএন) টাইগার ক্যাট গণ (জেনাস)-কে একটা সময় দু’টি ভিন্ন বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি হিসেবে মান্যতা দিয়েছিল। এ বার নতুন গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে ওই গণের পাঁচটি আলাদা-আলাদা প্রজাতির অবস্থা পর্যালোচনা করা হবে বলেও জানিয়েছে ইইউসিএন। জোনাস জানান, এই পর্যালোচনা শেষ হলে সদ্য-আবিষ্কৃত প্রজাতিটি বিলুপ্তপ্রায় কি না, তা নিয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে। তিল্কায়োর ক্ষেত্রে সেই সম্ভাবনাই বেশি। জোনাস জানান, এখন পর্যন্ত তিল্কায়ো প্রজাতির মাত্র দু’টি জীবন্ত বিড়ালের হদিস মিলেছে। তার মধ্যে একটি ১০ বছর বয়সি পুরুষ। এই সেই পুরুষ তিল্কায়ো, যাকে দেখে প্রথম সন্দেহ জেগেছিল পাওলার মনে। এখন সেটিকে রাখা হয়েছে সেন্দা ভার্দে অভয়ারণ্যে।
আবিষ্কারের ইতিহাসে চিরকালীন স্থান হয়ে গেল তার। ছবি: রয়টার্স।
তিল্কায়োর যেখানে বাস, সেই ইয়ুঙ্গাস অরণ্যের পরিবেশ এমনিতেই বিপন্ন। পাওলার দাবি, যে হারে গাছ কাটা হচ্ছে, কৃষিকাজের জন্য জঙ্গল দখল করা হচ্ছে, ইচ্ছাকৃত ভাবে বনে আগুন লাগানো হচ্ছে এবং খননকাজের জন্য পাহাড়-পর্বত ধ্বংস করা হচ্ছে, তাতে ইয়ুঙ্গাসের মৃত্যু শুধু সময়ের অপেক্ষা। তা হলে উপায়?
বিজ্ঞানীদের মতে কয়েকটি রাস্তা আছে। দাবানলে বিধ্বস্ত বনাঞ্চল পুনরুদ্ধার করতে হবে। জঙ্গলের যেটুকু অংশ এখনও ধ্বংস হয়নি তা সংরক্ষণ করতে হবে। বন্যেরা বনেই সুন্দর, তাই তাদের থেকে জঙ্গল কেড়ে নিলে চলবে না।
আলোচ্য গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ব্রাজ়িলের রিয়ো গ্রান্ডে দো সুল প্রদেশে পন্টিফিসিয়াল ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞানী এদুয়ার্দো আইজ়িরিক বলেন, ‘‘আমরা এত দিন জানতামই না, বিড়ালের মতো অতি-পরিচিত প্রাণীর একটি নতুন প্রজাতির খোঁজ মিলতে পারে। এখনও কত বিরল প্রজাতির প্রাণী এই পৃথিবীতে আছে যাদের অস্তিত্বের কথা আমরা জানিই না। তাদের বাসস্থান রক্ষা না-করতে পারলে হয়তো আর কোনও দিন তাদের অস্তিত্বের কথা জানাও যাবে না।’’