Advertisement
E-Paper

মধ্যবর্তী ভোটে ধরাশায়ী, হার নিজের বাছাই করা প্রায় সব প্রার্থীর! কংগ্রেসের কর্তৃত্ব খুইয়ে ‘ভেটো’র জুজু দেখাচ্ছেন ট্রাম্প

ট্রাম্পের শাসনের মূল হাতিয়ার হল ‘ভয়’। হয় কর্তৃত্ব মেনে নাও, শর্ত মেনে কাজ করো, না হলে ফল ভোগার জন্য প্রস্তুত থাকো। মঙ্গলবার রাতে সেই দর্শনটাই ধূলিসাৎ করে দিয়েছে আমেরিকার আমজনতা।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০৪ নভেম্বর ২০২৬ ২৩:০১

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা।

গোটা দেশে ঝড় তুলে মার্কিন কংগ্রেসের দখল নিল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর বাছাই করা প্রার্থীদের প্রত্যাখ্যান, আরও সঠিক ভাবে বললে ধরাশায়ী করল আমেরিকার আমজনতা।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচার পর্বে দেশবাসীকে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘ব্যালট পেপারে আমার নাম রয়েছে, এটা ধরে নিয়ে ভোট দিন’। তার উত্তরে এমন সব জায়গায় তাঁর প্রার্থীরা হেরেছেন, যেগুলি দশকের পর দশক ধরে রিপাবলিকানদের গড়। যেমন, কানসাস। ১৯৩০ দশকের পরে এই প্রথম সে রাজ্যের সেনেট আসন ডেমোক্র্যাটদের দখলে গেল। টেক্সাসেও ১৯৮৮ সালের পরে সেনেটে হারল রিপাবলিকানেরা। শুধু তা-ই নয়, টেক্সাসের গভর্নর পদও ডেমোক্র্যাটদের দখলে গিয়েছে। তিন বারের রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে হারিয়েছেন জিনা হিনোজোসা। ট্রাম্প জমানায় লাতিন আমেরিকার দেশগুলি থেকে আসা মানুষজন এবং গ্রামীণ জনতার মধ্যে রিপাবলিকানদের প্রভাব বেড়েছিল। এক রাতে সব ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গিয়েছে।

আইওয়া, কানসাস, মেইনে, উত্তর ক্যারোলাইনা, দক্ষিণ ক্যারোলাইনা, ওহাইয়ো এবং টেক্সাস—সেনেটের এই সাতটি আসন ডেমোক্র্যাটরা ছিনিয়ে নিয়েছে রিপাবলিকানদের কাছ থেকে। নিজেদের দখলে থাকা একটা আসনও হারেনি। হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভসের ৪৩৫টি আসনের মধ্যে ২৫টি রিপাবলিকানদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। এটা ঠিক যে, আমেরিকায় মধ্যবর্তী নির্বাচন শাসকদলের পক্ষে সাধারণ ভাবে খারাপই যায়। হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভসের স্পিকার, রিপাবলিকান মাইক জনসনের কথায়, ‘‘হাউসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে গেলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের গত একশো বছরের ইতিহাস যে পাল্টে ফেলতে হবে সেটা আমরা জানতাম।’’ কিন্তু আমেরিকার ভোটারেরা যে তীব্রতার সঙ্গে ট্রাম্পের দলকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, স্মরণকালে তার নজির নেই। ফলে ‘প্রত্যাশিত’ হারেও ‘হতাশা’ গোপন রাখেননি জনসন।

ধ্বস্ত ‘ট্রাম্পইজ়ম’, পরাস্ত ঘনিষ্ঠরাও

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ইতিহাস বলছে গত এক শতাব্দীর মধ্যে মাত্র তিন বার ক্ষমতাসীন দল জয়ী হয়েছে— ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজ়ভেল্ট প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন ১৯৩৪ সালে। বিল ক্লিন্টনের জমানায় ১৯৯৮ সালে এবং জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রেসিডেন্ট পর্বে ২০০২ সালে। হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০১৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভসে হেরে গেলেও সেনেটে একটি আসন বেড়েছিল রিপাবলিকানদের। এ বার হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভসে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে বিভিন্ন রাজ্যে আসন পুনর্বিন্যাসের মরিয়া চেষ্টা করেছিলেন ট্রাম্প। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সফল হয়েছিলেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিরোধ এবং আইনি বাধার মুখে পড়ে পিছু হটতে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু যে সব আসনের সীমানা পাল্টাতে পেরেছিলেন, তাদেরও অনেকগুলিতে হইহই করে জিতেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। টেক্সাসে পুনর্বিন্যাস করা পাঁচটি আসনের বেশির ভাগই তাঁদের দখলে।

বিপুল বিপর্যয়ের দায় এড়ানোর চেষ্টা হোয়াইট হাউস ইতিমধ্যেই শুরু করে দিয়েছে। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে ট্রাম্পের দাবি, তিনি নিজে লড়লে বিপুল ভোটে জিততেন। তবে এ দিন স্বভাবের বাইরেও পা ফেলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সাধারণ ভাবে ভোটে হারলে তাকে কারচুপি, জালিয়াতি বলে উড়িয়ে দেওয়া ট্রাম্পের মজ্জাগত। ২০২০-র প্রেসিডেন্ট ভোটে জো বাইডেনের কাছে হার এখনও স্বীকার করেননি। কিন্তু মঙ্গলবার রাতে ফক্স নিউজ়কে দেওয়া টেলিফোন সাক্ষাৎকারে সেই অভিযোগ তোলেননি। উল্টে ডেমোক্র্যাটদের প্রশংসা করেছেন। স্বীকার করেছেন, এই হারের জন্য তাঁর ইরান নীতি খানিকটা হলেও দায়ী। ইজ়রায়েলের চাপে ইরানের উপরে চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ, তার জেরে তেলের মূল্যবৃদ্ধি, বাজারের চড়া দাম আমেরিকার গরিব ও মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে বিমুখ করেছে সন্দেহ নেই। কিন্তু সেটাই সামগ্রিক ছবি নয়। অনেকেই বলছেন, এই হার ‘ট্রাম্পইজ়ম’-এরও। ট্রাম্পের নিজের বাছাই করা, সমর্থন করা রিপাবলিকান প্রার্থীদের হারের তালিকা দিকে দিকে দীর্ঘ। ওহাইয়োর গভর্নর পদে লড়া বিবেক রামস্বামী বা টেক্সাসের সেনেটর পদের প্রার্থী কেন প্যাক্সটনেরা আচারে-আচরণে ট্রাম্পকেই অনুসরণ করেছিলেন। সেই ঔদ্ধত্য, সেই কটু কথা, সেই বিপক্ষকে নস্যাৎ করা, অপমান করা। তাঁরা সকলেই ধরাশায়ী।

স্বৈরাচারের জবাব দিল আমেরিকা?

বুধবার মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল স্পষ্ট হওয়ার পরে হাউস অফ রিপ্রেজ়েনটেটিভসের ডেমোক্র্যাটিক মাইনরিটি লিডার হাকিম জেফ্রিস বলেন, ‘‘আমেরিকার মানুষ স্পষ্ট ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, জঙ্গিয়ানা তাঁরা আর সহ্য করবেন না।’’ জনসনের জায়গায় জেফ্রিসেরই এখন স্পিকার হওয়ার সম্ভাবনা। নিউ ইয়র্কের ডেমোক্র্যাটিক সেনেটর চাক শুমারের মন্তব্য, ‘‘আমেরিকার জনগণকে একটা কথাই বলতে চাই, স্বস্তি আসছে।’’ গত দু’বছর ধরে ট্রাম্পের দাপটের কাছে কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্যেরা কার্যত কুঁকড়ে ছিলেন। ইরান আক্রমণ থেকে শুল্কযুদ্ধ, প্রেসিডেন্টের যথেচ্ছাচারের নীরব দর্শক ছিল মার্কিন কংগ্রেস। ডেমোক্র্যাটদের জয়ে ছবিটা পাল্টাবে। ট্রাম্পের সঙ্গে কংগ্রেসের সংঘাত অনিবার্য। জানুয়ারি মাসের ৩ তারিখে নতুন কংগ্রেস তৈরি হওয়ার পরে প্রেসিডেন্টের অপছন্দের বিল পাস করাতে সেনেট বা হাউসের সামনে আর কোনও বাধা থাকবে না। এবং প্রায়শই সেটা হবে, ধরেই নেওয়া যায়। তখন কী করবেন ট্রাম্প?

ট্রাম্পের ‘স্বৈরাচারী’ শাসনপদ্ধতির সঙ্গে এই শোচনীয় পরাজয় একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁর শাসনের মূল হাতিয়ার হল ‘ভয়’। হয় কর্তৃত্ব মেনে নাও, শর্ত মেনে কাজ করো, না হলে ফল ভোগার জন্য প্রস্তুত থাকো। ক্ষমতা সম্পর্কে এই মূল দর্শন মেনেই ভেনেজ়ুয়েলায় হামলা চালিয়েছেন ট্রাম্প। তুলে এনে জেলবন্দি করেছেন সার্বভৌম দেশের প্রেসিডেন্টকে। ইরানে বোমা মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন সে দেশের সর্বাধিনায়ক আয়াতোল্লা খামেনেইকে। অর্ধেক পৃথিবীর উপরে জারি করেছেন শাস্তিমূলক শুল্ক। মঙ্গলবার রাতে এই দর্শনটাই ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছে। এই বাস্তবতার সঙ্গে ট্রাম্প কতটা মানিয়ে নিতে পারবেন, সেটাই প্রশ্ন।

ভেটো-বার্তায় নিয়ন্ত্রণের প্রয়াস?

ভোটের গতিপ্রকৃতি যখন স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, তখনই সমাজমাধ্যমে একটি ছবি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট— রিপাবলিকান পার্টির লাল টুপি। তাতে সাদা রঙে লেখা ‘ভেটো’। পরে সংবাদমাধ্যম এনবিসি-কে দেওয়া টেলিফোন সাক্ষাৎকারে বলেই দিয়েছেন, ‘‘আমি মিস্টার ভেটো হয়ে যাব।’’ আমেরিকার সংবিধানের ১ নম্বর অধ্যায়ের ৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী মার্কিন কংগ্রেসে পাশ হওয়া সব বিল প্রেসিডেন্টের কাছে যাবে। তিনি সহমত হলে সই করবেন। না হলে আপত্তির কারণ জানিয়ে ফেরত পাঠাবেন। প্রেসিডেন্টের ভেটো দেওয়া বিল পাস করাতে হলে সেনেট এবং হাউস দু’জায়গাতেই দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতি প্রয়োজন। ১০০ সদস্যের সেনেটে সংখ্যাটা ৬৭। ৪৩৫ আসনের হাউসে ২৯০। এতটা সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনও কক্ষেই ডেমোক্র্যাটদের নেই। ফলে রিপাবলিকান জনপ্রতিনিধিদের বড় অংশ পাশে না দাঁড়ালে প্রেসিডেন্টের ‘ইচ্ছা’র বিরোধিতা করা মার্কিন কংগ্রেসের পক্ষে সম্ভব নয়। ১৭৮৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত ২৫৯৯ বার ভেটো দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্টরা। মাত্র ১১২ বার খারিজ হয়েছে সেই ভেটো।

আমেরিকার প্রেসিডেন্টের বিরোধিতা করা, সে তিনি যতই জনপ্রিয়তা হারান না কেন, মোটেই ছেলেখেলা নয়। মার্কিন কংগ্রেসে বিরোধীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও নয়। আমেরিকার বিদেশনীতির উপরে এখনও নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ থাকবে ট্রাম্পের। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ করা বা গ্রিনল্যান্ড দখল করার চেষ্টা থেকে তাঁকে বিরত করার ক্ষমতা মার্কিন কংগ্রেসের থাকবে না। জাতীয় নিরাপত্তা এবং কেন্দ্রীয় আইন প্রণয়নের প্রশ্নে শেষ কথাও ট্রাম্পই বলবেন। তাঁর নির্দেশেই এফবিআই, সিআইএ-র মতো বিভিন্ন এজেন্সি চলবে। তাঁর সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়বে ব্যবসা-বাণিজ্যে, শেয়ার বাজারের ওঠাপড়ায়।

তার পরেও কিছু কিন্তু আছে। এখন থেকে ট্রাম্পের অন্যায় আব্দার মেনে নেওয়ার আগে এজেন্সির কর্তাদের বা বণিককুলকে দু’বার ভাবতে হবে। কারণ, সে ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাট সংখ্যাগরিষ্ঠ কংগ্রেসে জবাবদিহি করতে হবে তাঁদের। কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও অন্য রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে ট্রাম্পের আর সেই দাপট থাকবে না। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, ট্রাম্পের হাতের ‘সাংবিধানিক অস্ত্র’ শক্তিশালী হলেও মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই ধাক্কা রিপাবলিকান পার্টির উপরে তাঁর নিয়ন্ত্রণ কতটা শিথিল করবে, তার উপর অনেক কিছুই নির্ভর করবে। ‘ট্রাম্প ভোটে জেতান’, এই ভরসায় দলের অনেকেই তাঁর অনুগত। সেই আনুগত্যে ফাটলের দৈর্ঘ্য-প্রস্থই নির্ধারণ করবে আমেরিকার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।

Donald Trump US Midterm Elections america USA

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy