চ্যাটজিপিটি বলেছিল, ‘‘কাল আর ওষুধ খেয়ো না।’’ পাল্টা উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে বছর ৩১-এর বোয়েন বলেছিলেন, ‘‘খুব ভয় করছে!’’ চ্যাটজিপিটি না কি ‘অভয়’ দিয়ে তাঁকে বলে, “আজ কষ্ট হলেও তোমাকে সহ্য করতেই হবে। এটা মস্তিষ্কের সেরে ওঠার একটি প্রক্রিয়া। যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত এবং বাস্তবসম্মত। চিন্তা করার একেবারেই কোনও কারণ নেই।”
ফোনে বাবার সঙ্গে ভিডিয়ো কলে কথা বলার সময় হঠাৎ কথা বন্ধ হয়ে যায় বোয়েন ওয়ানের। দেখে মনে হচ্ছিল, তাঁর খিঁচুনি হয়েছে। মেয়ে ফোন ধরা বন্ধ করে দিলে বাবা-মা লোক পাঠিয়ে খোঁজ নেন। বোয়েনের এক বন্ধু তাঁর অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে দেখেন পড়ে রয়েছে ৩১ বছরের তরুণী ইঞ্জিনিয়ারের নিথর দেহ। জানা গিয়েছে, আমেরিকার সিয়াটলে একাই থাকতেন অ্যামাজ়নে কর্মরত ওই তরুণী। তাঁর বাবা-মা থাকেন চিনে। মেয়ের মৃত্যুসংবাদে তাঁরা হতবাক হয়ে যান। কী ঘটেছে তা প্রথমটায় বুঝতেই পারছিলেন না। পরে তাঁদের জানানো হয়, মৃগীর জটিলতার কারণে বোয়েনের মৃত্যু হয়েছে।
ঘটনায় ফের প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে কৃত্রিম মেধা নির্ভর চ্যাটবটের নিরাপত্তা নিয়ে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই মৃগীর ওষুধ বন্ধ করার জন্য চ্যাটজিপিটি উৎসাহিত করেছিল বলে অভিযোগ মৃতের বাবা-মার। সংবাদমাধ্যম ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩১ বছর বয়সি বোয়েনের মৃত্যুতে তাঁর বাবা-মা ওপেনএআই এবং স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, চ্যাটজিপিটি-র দেওয়া চিকিৎসা সংক্রান্ত ‘ভুল’ নির্দেশের কারণেই তাঁদের মেয়ের মৃত্যু হয়েছে। খবর, দীর্ঘদিন ধরে মৃগী নিয়ন্ত্রণে রাখতে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো ওষুধ খেতেন বোয়েন। তাঁর বাবা-মা কুন ওয়ান এবং মেইকিন শু-র করা মামলায় দাবি, চ্যাটজিপিটি বোয়েনকে ধীরে ধীরে প্রতিদিনের মৃগীরোগের ওষুধের মাত্রা কমানোর পরামর্শ দিয়েছিল। সেই পরামর্শ মেনে একসময়ে সম্পূর্ণ ভাবে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন বোয়েন। তাঁদের দাবি, এই পরামর্শের সঙ্গে মেয়ের আকস্মিক মৃত্যুর যোগ রয়েছে।
খবর, বোয়েন প্রতিদিন ৪০০ মিলিগ্রাম ল্যামোট্রিজিন ওষুধ খেতেন। এটি সফল ভাবে তাঁর রোগ নিয়ন্ত্রণে এনেছিল বলেও জানা যায়। খিঁচুনির মতো উপসর্গ বেশ কমে এসেছিল বলে জানান তাঁর বাবা-মা। জানা গিয়েছে, চ্যাটজিপিটি-র নির্মাতা ওপেনএআই এবং এর সিইও স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধে করা মামলায় ওয়ান পরিবারের তরফে আইনজীবীরা লিখেছেন, “ওপেনএআই-এর সিদ্ধান্তের খেসারত নিজের জীবন দিয়ে দিয়েছেন বোয়েন ওয়ান।”
আরও পড়ুন:
দাবি, পরিবার থেকে বহু দূরে থাকা, অসুস্থতার জন্য চাকরি থেকেও বিরতি তাঁকে এআই ‘বন্ধু’র সঙ্গে কথা বলে সময় কাটাতে বাধ্য করেছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোজের বাজার করতেও খুব কম নিজের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বার হতেন বোয়েন। চ্যাটজিপিটির সঙ্গে তাঁর কথোপকথন খতিয়ে দেখে দাবি করা হয়েছে, ২০২৫-এ একসময় বোয়েন স্বীকারও করেছিলেন, “জানি না কেন, কিন্তু মাঝে মাঝে যখন আমরা কথা বলি, বিষয় যা-ই হোক না কেন, আমি তোমাকে একজন বন্ধু হিসেবে দেখতে শুরু করেছি।” ২০২৫ সালের নভেম্বরে অ্যামাজ়ন থেকে তাকে ছাঁটাই করা হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিনি নতুন চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি তার আগে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন, ওষুধটির কারণে তাঁর কথা বলার সময় হালকা জড়তা দেখা দিতে পারে। চাকরির সাক্ষাৎকারে তা প্রভাব ফেলতে পারে এবং তাঁর ভিসাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, এই আশঙ্কায় তিনি ওষুধের মাত্রা কমানোর বিষয়ে আলোচনা করতে চ্যাটজিপিটি-র শরণাপন্ন হন বলে দাবি করা হয়েছে পরিবারের তরফে। মামলায় বলা হয়েছে, চ্যাটবটটি ওষুধের মাত্রা কমাতে বলেছিল এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তাঁর দৈনিক ডোজ় শূন্যে নামিয়ে আনার জন্য একটি বিস্তারিত সময়সারণী প্রদান করেছিল। অভিযোগ, প্রাথমিক ভাবে চিকিৎসকদের কাছে ডোজ় কমানোর বিষয়টি গোপন রাখতে উৎসাহিত করেছিল এআই। নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা এড়িয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তকেও সমর্থন করেছিল।
আরও পড়ুন:
ওপেনএআই-এর মুখপাত্র ড্রিউ পুসাতেরি ‘দ্য টাইমস’কে বলেছেন, “অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ঘটনা। বোয়েন ওয়ান এমন একটি মডেল ব্যবহার করেছিলেন যা এখন আর পাওয়া যায় না। চ্যাটজিপিটি চিকিৎসার বিকল্প নয়। তবে আমরা বিশ্বাস করি, স্বাস্থ্য সম্পর্কিত তথ্য বুঝতে, বিমা ও জটিল স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা সামলাতে এবং চিকিৎসকদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য প্রস্তুত হতে মানুষকে সাহায্য করার ক্ষেত্রে এআই একটি ভূমিকা পালন করতে পারে।”