প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা এখনও বহু মানুষকে শিহরিত করে। এ নিয়ে উৎসাহের অন্ত নেই প্রত্নতাত্ত্বিকদেরও। এখনও অনেক অজানাকে হাতড়ে বেড়াচ্ছেন তাঁরা। এই যেমন প্রাচীন মিশরীয় রাজকন্যাদের কথাই ধরা যাক। তাঁরা যে যুদ্ধবিদ্যাতে পারদর্শী ছিলেন, তা কয়েক দিন আগে পর্যন্তও আমাদের জানা ছিল না। সম্প্রতি সেই ধোঁয়াশা কেটেছে মমির হাড় বিশ্লেষণ করে।
মিশরের রাজধানী কায়রো থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে রয়েছে দাহশুর। কায়রো থেকে সড়কপথে এক ঘণ্টায় পৌঁছে যাওয়া যায় নীল নদের পশ্চিম অববাহিকার এই গ্রামে। এই দাহশুরেই এক পিরামিডের ভিতর থেকে আবিষ্কার হয়েছিল মমিগুলি। যার বেশির ভাগই রাজ পরিবারের (কয়েকটি মমির পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি)। মিশরীয় সভ্যতার মধ্য পর্বের (২০৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ-১৬৫০খ্রিস্টাব্দ) শেষ দিকে, ত্রয়োদশ রাজবংশের সদস্যদের মমি সমাহিত ছিল ওই পিরামিডে।
পরে জানা যায়, মমিগুলির মধ্যে একটিই ছিল পুরুষের। ত্রয়োদশ রাজবংশের রাজা হোরের। বাকিগুলির মধ্যে চারটি ছিল চার রাজকন্যার— নুব-হোটেপ, ইতা, খেনমেত এবং ইতাওয়েরেত। অনুমান করা হয়, তাঁরা ফ্যারাও আমেনেমহাত ২-এর কন্যা। এক শতাব্দী আগে আবিষ্কার হয়েছিল মমিগুলি। ১৮৯৫ সালে। দাহশুরের পিরামিড থেকে এগুলির সন্ধান পেয়েছিলেন ফরাসি প্রত্নতাত্ত্বিক জ্যাক ডি মরগান। ১৯১৫ সালে ওই মমিগুলি নিয়ে যাওয়া হয় মিশরের তাহরির শহরের জাদুঘরে। একটি কাঠের বাক্সের মধ্যে একপ্রকার অবহেলাতেই ফেলে রাখা হয়েছিল সেগুলি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলি হারিয়ে যায় বিস্মৃতির আঁধারে।
২০২০ সালে মিশরের বেনি-সুয়েফ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক জেনাব হাশেশ ওই মমির দেহাবশেষগুলি পুনরায় আবিষ্কার করেন। সেই থেকেই শুরু হয় গবেষণা। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে হাশেশ এবং তাঁর সহযোগীরা ওই দেহাবশেষগুলি খতিয়ে দেখেন। সম্প্রতি তাঁদের গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন এনভায়রনমেন্টাল আর্কিওলজি’ জার্নালে।
মরগান যখন ওই মমিগুলি প্রথম আবিষ্কার করেন, সেগুলির সঙ্গে বেশ কিছু অস্ত্রশস্ত্র পাওয়া গিয়েছিল। সংরক্ষিত থাকা দেহাবশেষগুলির সঙ্গে মিলেছিল রত্নখচিত তলোয়ার, ধনুক এবং গদার মতো অস্ত্র। এত দিন পর্যন্ত সাধারণত প্রাচীন মিশরীয় পুরুষদের মমির সঙ্গেই এমন অস্ত্রশস্ত্র পাওয়া হত। ফলে এক শতাব্দী আগে মহিলাদের মমির সঙ্গে এমন অস্ত্রশস্ত্রের সন্ধানকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এর অন্যতম কারণ, প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার মানুষদের ‘পারলৌকিক’ বিশ্বাস। প্রত্নতাত্ত্বিকদের অনেকেই মনে করেন, প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় ‘মৃত্যুর পরবর্তী জীবন’ নিয়ে বিভিন্ন বিশ্বাস ছিল। সম্ভবত, সেই ধারণা থেকেই রাজকন্যাদের মমির সঙ্গে অস্ত্রশস্ত্র রাখা ছিল বলে ‘ভুল’ করেছিলেন প্রত্নতাত্ত্বিকেরা।
আরও পড়ুন:
তবে হাশেশ এবং তাঁর সহযোগীদের গবেষণায় উঠে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক তথ্য। গবেষকদের দাবি, তৎকালীন মিশরীয় সভ্যতার রাজকন্যারা যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। নিয়মিত অস্ত্র প্রশিক্ষণের মধ্যে থাকতেন তাঁরা। মমির হাড় বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, সেগুলি এমন ভাবেই বিকশিত হয়েছিল যা বলিষ্ঠ পেশির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মমির সঙ্গে পাওয়া অস্ত্রগুলি ব্যবহারের জন্য যেমন পেশি দরকার, ঠিক তেমনই পেশি ছিল রাজকন্যাদের— আভাস মিলেছে গবেষণায়।
যেমন রাজা হোর এবং রাজকন্যা নুব-হোটেপ— উভয়েরই দক্ষ তিরন্দাজদের মতো বলিষ্ঠ পেশি ছিল। হাশেশের কথায়, “ঊর্ধ্বাঙ্গের পেশির সুস্পষ্ট বিকাশের আভাস মিলেছে। বার বার ধনুকের ছিলা টানার ফলে হাড় এবং পেশির এই ধরনের বিকাশ হয়। এটি প্রমাণ করে যে জীবনভর এই অভ্যাস ছিল তাঁদের।” একই ধরনের আভাস মিলেছে অন্য রাজকন্যাদের ক্ষেত্রেও। যেমন ইটার শরীরের উপরের অংশে বলিষ্ঠ পেশি ছিল। তা থেকে অনুমান করা হয়, তিনি নিয়মিত গদার মতো অস্ত্র ব্যবহার করতেন। মমি বিশ্লেষণ করে অনুমান করা হয়, মৃত্যুর সময়ে খেনমেতের বয়স ছিল ৪০-এর কোঠায়। তাঁর হাড় পাতলা হয়ে গেলেও লিগামেন্টের সংযোগস্থলগুলি ছিল মজবুত। আবার ইতাওয়ারেতের মমি থেকে জানা যায়, তাঁর পাঁজর এবং পায়ের হাড় ভেঙে গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও তিনি বেঁচে ছিলেন।
এই বিশ্লেষণের পর গবেষকদের দাবি, ওই সময়ে মিশরীয় সভ্যতায় রাজকন্যারা অলস জীবনযাপন করতেন না। তাঁরা তিরন্দাজি করতেন, অস্ত্র ব্যবহার জানতেন, শিকারেও দক্ষ ছিলেন। তবে তাঁরা যুদ্ধক্ষেত্রে কোনও দিন নেমেছিলেন কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় বিশ্বাস করা হত— সঠিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মৃত্যুর পরেও টিকে থাকা যায়। সম্ভবত, সেই প্রশিক্ষণই দেওয়া হত রাজকন্যাদের।