১৯৪৫ সালে হিরোশিমায় পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটেছিল। ৮০ বছরেরও পরে সেই ভগ্নস্তূপ থেকে মিলল নতুন এক ধাতু। বিজ্ঞানীদের একাংশ বলছেন, সেই ধাতু গবেষণাগারে তৈরি করা একপ্রকার অসম্ভব। পরমাণু বিস্ফোরণের ফলে কী বিক্রিয়া হতে পারে, তা নিয়ে নতুন একটা ধারণাও মিলল বলে মনে করা হচ্ছে।
হিরোশিমা বে-র সৈকত থেকে কিছু ভগ্নাবশেষ সংগ্রহ করেছিলেন ইটালির ফ্লোরেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী লুকা বিন্ডি। সেগুলি পরীক্ষা করেই মিলেছে নতুন এক ধাতুর খোঁজ। সেই সংক্রান্ত গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ পত্রিকায়।
১৯৪৫ সালের ৬ অগস্ট জাপানের হিরোশিমায় ‘লিটল বয়’ নামে পরমাণু বোমা ফেলেছিল আমেরিকা। তার ফলে যে বিস্ফোরণ হয়েছিল, তা ২০ হাজার টন টিএনটির সমতুল্য। তার তিন দিন পরে নাগাসাকিতে আরও একটি পরমাণু বোমা ফেলেছিল আমেরিকা। এই পরমাণু বিস্ফোরণের জেরে প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় এক লক্ষ ৪০ হাজার মানুষ। লক্ষ লক্ষ মানুষ ক্যানসার-সহ জটিল রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন।
সেই পরমাণু বিস্ফোরণের প্রভাব নিয়ে এখনও চলছে গবেষণা। তা করার সময়েই হিরোশিমা সৈকত থেকে ৩৪টি নমুনা কুড়িয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। এক্স-রে, অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে পরখ করে দেখা গিয়েছে, বেশির ভাগ নমুনায় রয়েছে লৌহ-ক্রোমিয়ামের সঙ্কর। কিন্তু একটি পদার্থের অণুতে রয়েছে আয়রন, ক্রোমিয়াম, নিকেল, মলিবডেনাম, ম্যাঙ্গানিজ়, সিলিকন, অ্যালুমিনিয়ামের অদ্ভুত এক মিশ্রণ। স্ফটিকে সেগুলির বিন্যাস এমন ভাবে সজ্জিত, যা দেখে বিস্মিত বিজ্ঞানীরা।
আরও পড়ুন:
পরমাণু বিস্ফোরণের সময় তাপমাত্রা হয়েছিল প্রায় ১২ হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট (৬,৬৪৮.৮৮ সেলসিয়াস)। সে সময় বাষ্পে পরিণত হয়েছিল কাচ, ধাতু, জল, মাটি থেকে বাড়িঘর পর্যন্ত। ধাতব বাষ্প মুহূর্তে আবার ঠান্ডাও হয়ে গিয়েছিল। তার ফলেই তৈরি হয়েছিল এই সঙ্কর ধাতু, যাতে পরমাণুগুলি অদ্ভুত ভাবে বিন্যস্ত হয়েছে। সাধারণত ধাতু ঠান্ডা হওয়ার সময় তার পরমাণুগুলি একটি সাধারণ বা পরিচিত কাঠামোতে বিন্যস্ত হয়। কিন্তু হিরোশিমায় পরমাণু বিস্ফোরণের পরে ধাতব বাষ্প অত্যন্ত দ্রুত ঠান্ডা হওয়ার কারণে পরমাণুগুলি স্বাভাবিক বিন্যাসে ফেরার সময় পায়নি। আচমকা ধাতব বাষ্প কঠিনে পরিণত হওয়ায় পরমাণুগুলিকে ওই অদ্ভুত বিন্যাসে বেঁধে ফেলেছে। ধূমকেতু আছড়ে পড়লে বা বাজ পড়লে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীদের একাংশ।
অতীতে ১৯৪৫ সালে ট্রিনিটি পারমাণবিক বোমা নিয়ে গবেষণার সময়ে তৈরি হয়েছিল ‘ট্রিনিটাইট’ নামে এক ধরনের কাচের মতো পদার্থ। তার মধ্যে রয়েছে বিরল এক প্রকার স্ফটিক (ক্ল্যাথরেট ক্রিস্টাল এবং কোয়াসিক্রিস্টাল)। তবে হিরোশিমার বিস্ফোরণের জেরে তৈরি সঙ্করে কোয়াসিক্রিস্টাল নেই।
আরও পড়ুন:
এই গবেষণার পরে বিজ্ঞানীদের ধারণা হয়েছে, চরম পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ নতুন উপাদান তৈরি হতে পারে। আর তা হতে পারে মানুষেরই কর্মের ফলে। ভবিষ্যতে মহাকাশযান বা ভারী শিল্পের ব্যবহারের জন্য উচ্চ তাপ প্রতিরোধী পদার্থ তৈরির করার ক্ষেত্রে এই গবেষণা কাজে লাগবে বলে মনে করা হচ্ছে।