কোটি কোটি বছর আগে এই মহাকাশে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল বিশাল এক গ্রহাণু। সেই টুকরো ছিটকে এসেছিল পৃথিবীতে। সম্ভবত মঙ্গল এবং চাঁদের দিকেও। কী প্রভাব ফেলেছিল তারা পৃথিবীতে, এখন তারই উত্তর খুঁজছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, গ্রহাণুর টুকরোর সঙ্গে সংঘর্ষের প্রভাব পড়েছে পৃথিবীর জলবায়ু, ভূগোলে। চাঁদের গহ্বরও হয়তো সেই কারণেই তৈরি হয়েছে।
মঙ্গল এবং বৃহস্পতির মাঝে রয়েছে গ্রহাণুর বলয়। সেই বলয়ের লাখ লাখ গ্রহাণু সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। ওই বলয়েই ৮০ কোটি বছর আগে ভেঙে গিয়েছিল সেই গ্রহাণু। গবেষণার পরে এমনটাই মনে করছেন সাউথওয়েস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা। ‘দ্য প্ল্যানেটরি সায়েন্স জার্নালে’ প্রকাশিত হয়েছে তাঁদের গবেষণা। ওই বিজ্ঞানীদের মতে, গ্রহাণুর টুকরোগুলি লক্ষ লক্ষ বছর ধরে সৌরজগতে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। তাদের সঙ্গে ক্রমাগত সংঘাত হচ্ছিল অন্য গ্রহের, উপগ্রহের।
বিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, গ্রহাণুর টুকরোর সঙ্গে সেই সংঘাতের ফলেই হয়তো চাঁদের বুকে গহ্বর তৈরি হয়েছে। তবে পৃথিবীতে ওই সংঘাতের ফলে কী হয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়। কারণ, পৃথিবীর বুকে তার প্রমাণ এত কোটি বছর পরে আর খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। আগ্নেয়গিরি থেকে অগ্ন্যুৎপাত, ভূগর্ভস্থ প্লেটের সঞ্চালন, জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে সেই চিহ্ন বিলুপ্ত হয়েছে। কোটি কোটি বছর ধরে বার বার ভূপৃষ্ঠের নানা পরিবর্তন হয়েছে। তার জেরে সম্ভবত বুজে গিয়েছে সেই গহ্বর। সে কারণে বিজ্ঞানীরা অনেক সময়ই পৃথিবী নিয়ে এ ধরনের পরীক্ষা করতে গেলে অন্য গ্রহ বা উপগ্রহের দ্বারস্থ হন।
আরও পড়ুন:
পৃথিবীর গর্ভে নিত্য সময় প্লেটের সঞ্চালন ঘটে। কিন্তু চাঁদে তা হয় না। সেখানে কোনও নদী বা জলধারা নেই। বায়ুপ্রবাহ নেই। সে কারণে কোটি কোটি বছর পরেও তার বুকে রয়ে গিয়েছে গহ্বর। অ্যাপোলো অভিযান থেকে পাওয়া প্রমাণ ঘেঁটে বিজ্ঞানীরা দেখেছিলেন, প্রায় ৮০ কোটি বছর আগে কোনও এক সংঘাতের কারণেই চাঁদের বুকে গহ্বর তৈরি হয়েছিল। কোনও বস্তুর সঙ্গে তীব্র সংঘর্ষের কারণে প্রবল তাপ উৎপন্ন হয়েছিল। তাতেই শিলা গলে ওই গহ্বর তৈরি হয়েছিল।
মঙ্গল এবং বৃহস্পতির মাঝে কক্ষপথের যে অংশে গ্রহাণু বলয় রয়েছে, বিজ্ঞানী উইলিয়াম বটকে তার নাম দিয়েছেন জে৩:১। বৃহস্পতি সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে যত সময় নেয়, একটি গ্রহাণু ওই সময়ে সূর্যকে তিন বার প্রদক্ষিণ করে। বিজ্ঞানীদের মতে, বৃহস্পতির মাধ্যাকর্ষণ শক্তির ধাক্কায় ওই অঞ্চলের গ্রহাণুগুলি চঞ্চল হয়ে ওঠে। ওই বলয় থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এখন পৃথিবীর আশপাশে যে গ্রহাণু দেখা যায়, তার অনেকগুলিই ওই জে৩:১ থেকে চলে এসেছে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। সে ভাবেই ৮০ কোটি বছর আগে সৌরজগতে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই ভেঙে যাওয়া গ্রহাণুর টুকরোগুলি।
কী ভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল? বিজ্ঞানীরা এ প্রসঙ্গে ইয়ারকভস্কি এফেক্টের কথা মনে করিয়েছেন। তাপের কারণে একটি বল তৈরি হয় পদার্থের। একটি গ্রহাণু সূর্যালোক শোষণ করে এবং পরে সেই শক্তি বিকিরণ করে। তবে যতটা তাপ শোষণ করে, ততটা বিকিরণ করতে পারে না। তার ফলে তার মধ্যে একটি বল তৈরি হয়, যা ধাক্কা দিয়ে গ্রহাণুকে এক কক্ষপথ থেকে অন্য কক্ষপথে ধীরে ধীরে ঠেলে দেয়।
পৃথিবীর আকার চাঁদের থেকে বড়। তার মাধ্যাকর্ষণ শক্তিও বেশি। ফলে সেই গ্রহাণুর টুকরো পৃথিবীতে অবশ্যই ধাক্কা দিয়েছিল বলে মত বিজ্ঞানীদের। ৮০ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব ছিল, কিন্তু তা একেবারেই প্রাথমিক স্তরের। এককোষী, আণুবীক্ষনিক। গ্রহাণুর সঙ্গে সঙ্ঘাত সেই আদিপ্রাণের উপরেও প্রভাব ফেলে থাকতে পারে। কিন্তু তা কী এবং কতটা এর উত্তর এখনও নেই।