Advertisement
E-Paper

বুমরাহদের চোট নিয়ে বোর্ডের সঙ্গে লেগে গেল লক্ষ্মণের! উঠে আসছে ঝকঝকে আইপিএলের আড়ালে থাকা খামতিগুলি

ঝকঝকে আইপিএলের আড়ালে থাকা খামতিগুলিকে সামনে নিয়ে আসছে একের পর এক ক্রিকেটারের চোট। পর্যাপ্ত বা নির্দিষ্ট সময়ের পরও তাঁদের ফিট হতে না পারা ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম ব্যর্থতা।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ১০ অগস্ট ২০২৬ ২১:১৩
Picture of Cricket

(বাঁ দিকে) দেবজিৎ শইকীয়া এবং ভিভিএস লক্ষ্মণ (ডান দিকে)। ছবি: এক্স।

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সেন্টার অফ এক্সেলেন্স (সিওই)-এর সঙ্গে জোর ঝামেলা লেগে গেল ভারতীয় বোর্ডেরই! ভিভিএস লক্ষ্মণকে সিওই-র দায়িত্ব দিয়েছে বিসিসিআই। সেই লক্ষ্মণের সঙ্গেই লেগে গেল বোর্ডকর্তাদের।

সমস‍্যা একের পর এক ভারতীয় ক্রিকেটারের চোট নিয়ে। প্রশ্ন উঠছে, লক্ষ্মণেরা বেঙ্গালুরুতে অত বড় জায়গা নিয়ে করছেন কী? বলা হচ্ছে, সিওই-তে আধুনিক পরিকাঠামোর কোনও অভাব নেই। তা হলে এত চোটসমস‍্যা কেন? এ সব শুনে লক্ষ্মণ পরোক্ষে দোষ চাপিয়েছেন বোর্ডের ঘাড়েই। আর বোর্ড সচিব লক্ষ্মণকে জবাব দিতে ঢাল করেছেন এই মুহূর্তে বিশ্ব ক্রিকেটের সর্বেসর্বা জয় শাহকে।

একের পর এক ক্রিকেটারের চোটের কারণে সিওই-র ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঘন ঘন চোট নিয়ে ইংল্যান্ড সফরের সময় উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন শুভমন গিল। শ্রীলঙ্কা সফরের দল নির্বাচনের সময় ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রধান নির্বাচক অজিত আগরকর। বিতর্কের মুখে লক্ষ্মণ জানিয়েছেন, সিওই শুধু রিহ্যাব সেন্টার নয়। বোর্ড সচিব দেবজিৎ শইকীয়া বলেছেন, বিশ্বের সেরা পরিকাঠামো রয়েছে সিওইতে। সমস্যা ঠিক কোথায় হচ্ছে, তা জানাননি কেউই।

সিওই কী?

জাতীয় ক্রিকেট অ্যাকাডেমির উন্নত সংস্করণ সিওই। একটা সময় পর্যন্ত বেঙ্গালুরুর এম চিন্নাস্বামী স্টেডিয়াম এবং সংলগ্ন পরিকাঠামো ব্যবহার করে জাতীয় অ্যাকাডেমি পরিচালনা করত বিসিসিআই। বেঙ্গালুরুর কাছেই ২০২৪ সাল থেকে কাজ শুরু করেছেন বিসিসিআইয়ের সিওই। ৪০ একর জায়গা জুড়ে রয়েছে ক্রিকেট প্রশিক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা। তিনটি পূর্ণ মাপের ক্রিকেট মাঠ, ৪৫টি আউটডোর নেট, আটটি ইন্ডোর নেট রয়েছে। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের মাটি এনেও তৈরি করা হয়েছে পিচ। যাতে ভারতের উঠতি বা জাতীয় দলের ক্রিকেটারেরা বিভিন্ন দেশের পিচের চরিত্রের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন। সুইমিং পুল, আধুনিক জিম, মাসাজ সেন্টারের মতো পরিচিত সব ব্যবস্থাই রয়েছে। ফিজিয়োথেরাপি, চিকিৎসা-সহ নানা ব্যবস্থা রয়েছে। বিশেষজ্ঞ কোচ এবং অন্য পেশাদারেরা দায়িত্বে রয়েছেন। ক্রিকেটীয় এবং শারীরিক উন্নতির বিজ্ঞানসম্মত এবং আধুনিক পরিকাঠামো তৈরি করেছে বিসিসিআই। ক্রিকেটারদের পাশাপাশি অলিম্পিক্স অ্যাথলিটেরাও বোর্ডের এই পরিকাঠামো ব্যবহার করতে পারেন।

সিওই-র লক্ষ্য

দেশের প্রতিভাবান ক্রিকেটারদের (প্রায় সব বয়সের) দক্ষতার শীর্ষে নিয়ে যাওয়াই মূল লক্ষ্য সিওই-র। ক্রিকেটীয় প্রশিক্ষণের পাশাপাশি খেয়াল রাখা হয় খাওয়া, শারীরিক ধকল, চোট-আঘাতের দিকেও। সিওইতে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হয়। বিভিন্ন বয়স ভিত্তিক দলের প্রস্তুতি শিবির হয়। জাতীয় দলের প্রস্তুতি শিবিরও হয়েছে একাধিক বার। কেন্দ্রীয় চুক্তিতে থাকা ক্রিকেটারদের তো বটেই, বোর্ড প্রয়োজন মনে করলে যে কোনও ক্রিকেটারকেই চোট সারার পর সিওইতে যেতে বলতে পারে। চোট সারিয়ে ফেরা ক্রিকেটারদের ফিটনেস বৃদ্ধিতে সাহায্য করেন বিশেষজ্ঞেরা। পরিস্থিতি বুঝে ধকল বাড়ানো হয়। বোর্ডের চিকিৎসকেরা পর্যবেক্ষণে রাখেন। তাঁরা সব খতিয়ে দেখে ছাড়পত্র দিলে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট খেলা যায়। অনেক সময় ছোটখাট চোট সারাতেও সিওইতে যান ক্রিকেটারেরা।

সিওই-র ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

মনে করা হয়, সিওই-র ছাড়পত্র পাওয়া ক্রিকেটার ১০০ শতাংশ ফিট। খেলার জন্য সব রকম ভাবে তৈরি। কারণ ক্রিকেটারদের ফিটনেস এবং ধকলের দিকটা মূলত দেখেন সিওই-র বিশেষজ্ঞেরাই। আধুনিক প্রযুক্তি এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করেন তাঁরা। এত কিছুর পরও কেন জাতীয় দলের ক্রিকেটারেরা বার বার চোট পাচ্ছেন? এটাই বড় প্রশ্ন। জসপ্রীত বুমরাহ ইংল্যান্ড সফরে গিয়ে হাঁটুতে চোট পেয়েছিলেন। ফুলে গিয়েছিল। এক মাস বিশ্রামের পরও তিনি সুস্থ নন। মনে করা হয়েছিল, শ্রীলঙ্কায় যেতে পারবেন। অথচ দল ঘোষণার পর জানা যায়, বুমরাহ ফিট নন। চোটের তালিকা লম্বা। হার্দিক পাণ্ড্য, নীতীশ কুমার রেড্ডি, সাই সুদর্শন, আকাশ দীপেরা দীর্ঘ দিন মাঠের বাইরে। সকলেরই দেখভাল করছে সিওই। তা-ও শ্রীলঙ্কা সফরে পাওয়া যাচ্ছে না কাউকে। চোট সারিয়ে ইংল্যান্ড সফরে যাওয়া হর্ষিত রানা নতুন করে চোট পেয়েছেন। তিনিও নেই। ওজন অনেক বেশি থাকা সত্ত্বেও কেন তাঁকে ইংল্যান্ডে খেলার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনিশ্চয়তা রয়েছে ওয়াশিংটন সুন্দরকে নিয়ে। ওয়াশিংটনও চোট পেয়েছেন ইংল্যান্ডে গিয়ে।

শুভমন-আগরকরদের ক্ষোভ

ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তৃতীয় এক দিনের ম্যাচের আগে দলের চোট-আঘাত নিয়ে মুখ খুলেছিলেন শুভমন। ভারতীয় দলের হতাশ অধিনায়ক বলেছিলেন, ‘‘এক দিনের সিরিজ়ের জন্য যে দল নির্বাচন করা হয়েছিল, তার পাঁচ জনই নেই শেষ ম্যাচে। প্রায় সব ম্যাচেই কেউ না কেউ চোট পাচ্ছে। অথবা কারও পুরনো চোট সমস্যায় ফেলছে। ফলে বার বার পরিবর্তন করতে হচ্ছে। একই প্রথম একাদশ নিয়ে টানা দু’তিনটি ম্যাচ খেলা যাচ্ছে না। দলের বোঝাপড়া এবং পারফরম্যান্সে প্রভাব পড়ছে।’’ আবার শ্রীলঙ্কা সফরের আগে বুমরাহের ফিটনেস নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ায় আগরকরও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। সিওই-র ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ বা অসন্তোষ জানিয়েছেন বোর্ড কর্তাদের।

লক্ষ্মণের বক্তব্য

সিওই-র প্রধান লক্ষ্মণ। সংস্থার কাজ নিয়ে অভিযোগ, অসন্তোষ তৈরি হলে দায় এড়াতে পারেন না তিনি। শুভমন, আগরকরদের ক্ষোভ নিয়ে বোর্ড কর্তারাও তাঁর বক্তব্য জানতে চেয়েছিলেন। শনিবার বোর্ডের কয়েক জন শীর্ষ কর্তার সঙ্গে কথা বলেন লক্ষ্মণ। তার পর বোর্ডের ঘাড়েই পরিস্থিতির দায় চাপিয়ে দিয়েছেন। লক্ষ্মণ বলেছেন, ‘‘সিওই শুধুমাত্র একটা রিহ্যাব সেন্টার নয়। এখানে শুধু ক্রিকেটারদের সুস্থ করে তোলা হয় না। এখানে ক্রিকেটারদের উন্নতির দিকটাও দেখা হয়। কোনও ক্রিকেটার এলে তার দক্ষতা বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া হয়। সুতরাং এই কেন্দ্রের আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।” তিনি আরও বলেছেন, “চোট তো খেলারই অঙ্গ। তাই জন্যই নজর রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর উপর কারও নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তাই আমাদের দোষ দিয়ে বা বলির পাঁঠা করে কোনও লাভ নেই।”

সমস্যা কোথায়?

মাঠের বাইরে সব কিছু ঠিকঠাক চলছে কিনা তা নিয়ে পর্যালোচনা শুরু করেছে বিসিসিআই। ক্রিকেটারদের চোট-আঘাত বেড়েই চলেছে। তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগও। বোর্ড সূত্রের খবর, অনেক ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে জাতীয় নির্বাচকদের সঙ্গে সিওই-র মেডিক্যাল টিম সমন্বয় সাধন করে কাজ করতে পারেনি। যোগাযোগের ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। সমস্যা বাড়িয়েছেন বোর্ড কর্তাদের একাংশও। তাঁরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে ক্রিকেটারদের চোট-আঘাত বা সুস্থতা সম্পর্কে খবর দেন। সেই খবর কতটা সঠিক, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তৈরি হচ্ছে ভুল বোঝাবুঝি। আয়ারল্যান্ড এবং ইংল্যান্ড সিরিজ়ে খারাপ ফলের পর লক্ষ্মণের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন শইকীয়া। সেই বৈঠকে লক্ষ্মণ সিওইর পরিকাঠামো, লক্ষ্য এবং কর্মপদ্ধতির কথা বলেছেন। জানিয়েছেন, কী সম্ভব। কী নয়।

সিওই নিয়ে শইকীয়ার বক্তব্য

খামতি মানতে চাননি বোর্ড সচিব। শইকীয়া বলেছেন, ‘‘২২ বছর ধরে কাজ করছে সিওই বা জাতীয় ক্রিকেট অ্যাকাডেমি। অন্তত আরও ৩০ বছর কাজ করবে। ২০৪০ সালে বা তার পর যারা খেলবে, তাদের জন্য ব্যবস্থা করতে হবে। নিঃসন্দেহে সিওই দেশের সেরা ক্রিকেট উন্নয়ন পরিকাঠামো। বিশ্বেরও সেরা। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার থেকেও ভাল ব্যবস্থা রয়েছে। বিদেশের বহু বিশেষজ্ঞ প্রশংসা করেছেন। তাঁরা এসে দেখে গিয়েছেন, কী ভাবে কাজ হয়। জয় শাহের দূরদর্শী নেতৃত্বে সিওই গড়ে তোলা হয়েছে। তাঁর পরামর্শ মতো ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে কাজ চলছে। আমরা চাই সিওইকে ভবিষ্যতেও বিশ্বের সেরা ক্রিকেট কেন্দ্র হিসাবে ধরে রাখতে।’’

শইকীয়া না মানলেও কিছু খামতি রয়েছে। ঝকঝকে আইপিএলের আড়ালে থাকা খামতিগুলিকে সামনে নিয়ে আসছে একের পর এক ক্রিকেটারের চোট। পর্যাপ্ত বা নির্দিষ্ট সময়ের পরও বুমরাহ, হার্দিক, সুদর্শনদের ফিট হতে না পারা ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম ব্যর্থতা। ঝকঝকে আইপিএলের আড়ালে সব কিছু ঢাকা দেওয়া যাচ্ছে না।

VVS Laxman Devajit Saikia BCCI Injury Jasprit Bumrah

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy