আইপিএল এবং অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে নজরকাড়ার পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও আলোচনার কেন্দ্রে বৈভব সূর্যবংশী। ইংল্যান্ডে অভিষেক টি-টোয়েন্টি সিরিজ়ে রান না পেলেও জ়িম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় সিরিজ়েই চেনা মেজাজে। ১৫ বছর ১২১ দিন বয়সে সিরিজ়ের সেরা ক্রিকেটারের পুরস্কার পেয়ে বিশ্বরেকর্ডও গড়েছে বৈভব। প্রশ্ন, আগামী বছর এক দিনের বিশ্বকাপের দলেও কি রাখা উচিত বৈভবকে? দাবি উঠছে। বৈভবও বলে দিয়েছে, সবে তো শুরু।
বৈভব কি ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ খেলার মতো পরিণত? সর্বোচ্চ পর্যায়ের ক্রিকেটের জন্য তৈরি। জ়িম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে তিন ম্যাচে ১৫১ রান দিয়ে মাপা কি ঠিক হবে? কারণ ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তিনটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচেই রান পায়নি বৈভব। তিনটি ম্যাচে রান ১৪, ১৩ এবং ১৫। যে প্রত্যাশা নিয়ে বৈভবকে খেলানো হয়েছিল, তা পূরণ করতে পারেনি। জফ্রা আর্চার-সহ ইংল্যান্ডের বোলারদের বিরুদ্ধে বৈভবের অস্বস্তি ধরা পড়েছিল। সুইং সমস্যায় ফেলেছিল বৈভবকে।
তা হলে শুভমন কত নম্বরে?
এক দিনের বিশ্বকাপের দলে থাকলে রোহিত শর্মার সঙ্গে বৈভবই ইনিংস ওপেন করবে। এখন প্রশ্ন, তা হলে শুভমন গিল কোথায় খেলবেন? এর জবাব দিয়েছেন প্রাক্তন ক্রিকেটার ফারুখ ইঞ্জিনিয়ার। বলেছেন, ‘‘শুভমন গিলের সঙ্গে বৈভব ইনিংস শুরু করলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে সেটাই আদর্শ জুটি। তবে শুভমন দুর্দান্ত ব্যাটার। এই ভারতীয় দলে সেরা। আমার মতে ওর চার নম্বরে ব্যাট করা উচিত।’’
বৈভবের জন্য ভাঙতে পারে রোহিত-শুভমন ওপেনিং জুটি। —ফাইল চিত্র
ভুল বলেননি ফারুখ। শুভমন খুব একটা বল তুলে মারেন না। এক দিনের ক্রিকেটে ইনিংসের শুরুতে বাঁ হাতি-ডান হাতি জুটি বেশ কার্যকর। রোহিত খেলবেন। সে ক্ষেত্রে রোহিত ওপেন করবেন বৈভবকে সঙ্গে নিয়ে। ফারুখের মতে, ‘‘বৈভবের মতো ব্যাটার ওপেন করলেই বেশি সফল হবে। ফিল্ডিংয়ের মধ্যে ফাঁকগুলো ভাল কাজে লাগায়। কোহলি তিনে আসুক। চারে শুভমন। তার পর বাকিরা।’’ তাঁর মতে, এক দিনের ক্রিকেট এবং টি-টোয়েন্টির মধ্যে এখন আর বিশেষ পার্থক্য নেই। অন্তত এক দিনের ক্রিকেটে পাওয়ার প্লের ব্যাটিং টি-টোয়েন্টির মতোই হয়ে গিয়েছে।
বৈভবের খামতি
শুধু ব্যাটিং দক্ষতা দিয়ে কি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সর্বোচ্চ স্তরে ধারাবাহিক ভাবে সফল হওয়া সম্ভব? কারণ বৈভবের কিছু খামতি রয়েছে। কয়েকটি জায়গায় উন্নতি করতে হবে তাকে। জ়িম্বাবোয়ে সফরে ভারতীয় দলের কোচ হয়ে যাওয়া ভিভিএস লক্ষ্মণ রাখঢাক না করেই বলেছেন সে কথা। ফিটনেস এবং ফিল্ডিংয়ে উন্নতি প্রয়োজন বৈভবের। ওজন কমানোর কথাও বলেছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের ফিটনেসের মান এখন বেশ ভাল। ফিটনেসের খামতি যে কোনও ক্রিকেটারকে দল থেকে ছিটকে দিতে পারে। গৌতম গম্ভীর ভারতীয় দলের কোচ হওয়ার পর শুরু করেছেন ব্রঙ্কো পরীক্ষা। আগের ইয়ো ইয়ো পরীক্ষার চেয়ে যা কঠিন। রাগবি, ফুটবল, বাস্কেটবল, আমেরিকান সকারের মতো খেলায় এই ফিটনেস পরীক্ষা পরিচিত। গম্ভীর সেটাই শুরু করেছেন ভারতীয় ক্রিকেটে। ক্রিকেটারদের ফিটনেসের মান আরও উঁচুতে নিয়ে যেতে চাইছেন। ভারতীয় দলে টিকে থাকতে হলে বৈভবকেও ফিটনেসে উন্নতি করতে হবে। ফিটনেসের মান যাচাইয়ের এক্তিয়ার অনেকটাই লক্ষ্মণের হাতে। তিনি এখন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) সেন্টার অফ এক্সেলেন্সের (সিওই) প্রধান। দলে সুযোগ পাওয়ার অন্যতম শর্ত ফিটনেস হলে সমস্যায় পড়তে পারে বৈভব। বিশ্বকাপের মতো প্রতিযোগিতার দলে নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হতে পারে ফিল্ডিংও।
বিতর্কে বৈভব
ক্রিকেটীয় খামতি ছাড়া আরও একটি বিষয় রয়েছে। মানসিকতা। এ ক্ষেত্রে বৈভবকে পরিণত হতে হবে। যদিও বৈভবের প্রশংসাই করেছেন লক্ষ্মণ, ‘‘বৈভব প্রতি ম্যাচে উন্নতি করছে। জ়িম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে শেষ ম্যাচেও সেটা দেখা গিয়েছে। কঠিন জায়গায় ফিল্ডিং করেছে। চোট পাওয়ার পরেও খেলতে চেয়েছে। কিন্তু ফিজ়িয়ো ওকে মাঠ ছাড়তে বলে। এর থেকেই বোঝা যাচ্ছে, ও লড়াই করতে চায়। মাঠ ছাড়তে চায় না। এই লড়াকু মানসিকতা ওকে অনেক দূর নিয়ে যাবে।”
মুদ্রার অন্য পিঠও রয়েছে। ভারত ‘এ’ দলের হয়ে শ্রীলঙ্কা সফরে গিয়ে প্রতিপক্ষ ক্রিকেটারদের সঙ্গে তর্কাতর্কি, ধাক্কাধাক্কিতে জড়িয়ে পড়েছিল বৈভব। মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। প্রশ্ন উঠেছিল কিশোর ব্যাটারের আচরণ নিয়ে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থার (আইসিসি) নিয়ম মতো, ম্যাচ রেফারি বৈভবকে শাস্তি দেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন ভারতীয় বোর্ডকে।
ত্রিদেশীয় প্রতিযোগিতায় শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটারদের সঙ্গে হাতাহাতি বৈভবের। —ফাইল চিত্র
জ়িম্বাবোয়ে সফরেও বৈভবের একটি আচরণের মৃদু সমালোচনা হচ্ছে। তৃতীয় টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ফিল্ডিংয়ের সময় একটি বল ধরতে বেশ খানিকটা দৌড়োয় বৈভব। তখন তার মাথার টুপি খুলে পড়ে যায়। বৈভবের কাছেই ছিলেন যশ ঠাকুর। যে ভাবে বৈভব দৌড়ে গিয়ে বল ধরেছে তার জন্য তার সঙ্গে হাত মেলাতে যাচ্ছিলেন যশ। সতীর্থকে এগিয়ে আসতে দেখে বৈভব বলে, “যাও, আমার টুপি কুড়িয়ে আনো। তার পর হাত মেলাব।” এ কথা শুনে যশ দৌড়ে দিয়ে বৈভবের টুপি কুড়িয়েও আনেন। বিষয়টি অনেকেই ভাল ভাবে নেননি। তাঁদের মতে, অল্প বয়সে এত সাফল্য পাওয়ায় হয়তো বৈভবের মাথা ঘুরে গিয়েছে। তাই সিনিয়র ক্রিকেটারের সঙ্গে এই ব্যবহার করেছে। অনেকে এ-ও দাবি করেছেন, সিনিয়র কেন, যে কোনও সতীর্থের সঙ্গেই এই ব্যবহার অন্যায়।
কিশোর বৈভব অপরিণত?
বিতর্ক এড়াতে পারছেন না বৈভব। বয়স কম, একটা কারণ হতে পারে। অপরিণত ব্যবহার করে ফেলছে। সিনিয়রদের প্রাপ্য সম্মান দিতে ভুলে যাচ্ছে উত্তেজনায়। মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। কারণ যা-ই হোক, আপাত ভাবে বৈভবের আচরণ দৃষ্টিকটু এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ মনে হয়েছে অনেকের। বৈভবের কিছু কথায় অহঙ্কার বা দম্ভও কি প্রকাশ পাচ্ছে? জ়িম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে সিরিজ় সেরার পুরস্কার পেয়ে বৈভব সমাজমাধ্যমে লিখেছে, ‘‘সবে তো শুরু।’’
এক দিনের বিশ্বকাপে বৈভবকে খেলানো উচিত?
ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে সহমত বাংলার প্রাক্তন ক্রিকেটারেরাও। স্নেহাশিস গঙ্গোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘‘ইঞ্জিনিয়ার একদম ঠিক বলেছেন। বৈভবকে অবশ্যই এক দিনের বিশ্বকাপের পরিকল্পনায় রাখা উচিত। এই বয়সে এত ভাল খেলছে। আইপিএলে এত রান করেছে। কেন খেলানো হবে না? সচিনও ১৬ বছর বয়সে পাকিস্তানে গিয়ে খেলেছে। চাপের কিছু নেই। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোনও কিছুই সহজ নয়। বৈভব এখনও বাচ্চা। পরিণত নয়। খেলতে খেলতেই তৈরি হবে। সব শিখে যাবে।’’ আর এক প্রাক্তন ক্রিকেটার শিবশঙ্কর পালও এক দিনের বিশ্বকাপে বৈভবকে খেলানোর পক্ষে। তাঁর যুক্তি, ‘‘বৈভব ভাল খেলছে। অবশ্যই এক দিনের বিশ্বকাপে খেলানোর কথা ভাবা উচিত। বয়স কোনও ব্যাপার নয়। পারফরম্যান্সই আসল। খামতি সকলের থাকে। ভারতীয় দলে অনেক সিনিয়র ক্রিকেটার রয়েছে, কোচেরা রয়েছে। ঠিক শিখে যাবে। বল নড়াচড়া করলে সামলাতে পারছে কি না, সেটা অবশ্য দেখতে হবে। সব জায়গায় আইপিএলের মতো পাটা উইকেট পাবে না।’’
আসল পরীক্ষা বাকি
১৫ বছরের বৈভব এখনও পর্যন্ত ২২ গজে যা সাফল্য পেয়েছে, তা প্রশংসার। সচিন তেন্ডুলকরের একাধিক রেকর্ড ভেঙেছে ইতিমধ্যে। তবে আইপিএল, অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ বা জ়িম্বাবোয়ে সফরের সাফল্য দিয়ে ভবিষ্যতের আন্দাজ পাওয়া কঠিন। জ়িম্বাবোয়ে এখন বিশ্বক্রিকেটে প্রথম সারির দলগুলির মধ্যে পড়ে না। বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের সঙ্গে সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক পর্যায়ের তুলনা করা উচিত নয়। আবার ভারতের ব্যাটিং সহায়ক পিচে আইপিএলের সাফল্যের নিক্তিতে মাপাও ঠিক হবে না। সর্বোচ্চ পর্যায়ে বৈভব এখনও তেমন পরীক্ষিত নয়। ইংল্যান্ডে যেটুকু সুযোগ পেয়েছে, তাতে সফল হয়নি। অস্ট্রেলিয়া, নিউ জ়িল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, পাকিস্তানের মতো দলগুলি দয়ামায়া দেখাবে না। দুর্বলতা খুঁজে আক্রমণ করবে। গতি এবং বলের বৈচিত্রে পরাস্ত করতে চাইবে। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে কিছুই গোপন থাকে না। এখনও পর্যন্ত এক দিনের ম্যাচ বা টেস্ট খেলেনি। ছ’টি টি-টোয়েন্টি খেলে দু’টি অর্ধশতরান করলেও বাকি চারটি ম্যাচে ব্যর্থ। বৈভবের সমানে অনেক পথ। অনেক পরীক্ষা বাকি।
আশার কথা, ভারতীয় ক্রিকেটের সর্বোচ্চ প্রশিক্ষণ পদ্ধতির মধ্যে চলে এসেছে বৈভব। প্রতি ক্ষেত্রে, প্রতি ম্যাচে নজরদারির মধ্যে থাকবে। জাতীয় দল এবং সিওই-র কোচেরা খামতি খুঁজে বার করবেন। সেই মতো নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে অনুশীলন করাবেন। ফিটনেস ট্রেনিং করাবেন। খেলতে খেলতে অভিজ্ঞতা বাড়বে বৈভবের। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটজীবন তো সবে শুরু।