ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) দুর্নীতি দমন এবং নিরাপত্তা শাখার (এসিএসইউ) নজরে বিভিন্ন রাজ্যের টি-টোয়েন্টি লিগ। সন্দেহের তালিকায় রয়েছেন কিছু ক্রিকেটার, কয়েকটি দলের মালিক এবং বিভিন্ন রাজ্যের কিছু কর্তা। রাজ্যগুলির টি-টোয়েন্টি লিগগুলিতে কিছু অস্বাভাবিকতা নজরে এসেছে বিসিসিআই কর্তাদের।
একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে বিসিসিআইয়ের এক কর্তা বলেছেন, ‘‘এসিএসইউয়ের নজরে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় এসেছে। বিভিন্ন রাজ্যের টি-টোয়েন্টি লিগের আয়োজক, ক্রিকেটার, ম্যানেজার এবং দলের মালিকদের একাংশের সঙ্গে জুয়াড়ি এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের যোগাযোগ ক্রমশ বাড়ছে, যা খেলার আচরণবিধি এবং নিয়মকানুনের বিরোধী। এসিএসইউ প্রথম বার রাজ্য লিগগুলিকে নিয়ে কাজ করছে। এত দিন পর্যন্ত টেস্ট ক্রিকেট, আইপিএল-সহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতাতেই নজর থাকত এসিএসইউয়ের।’’
বোর্ড সূত্রে খবর, প্রতিযোগিতা চলাকালীন, কারা দলগুলির হোটেলে গিয়ে ক্রিকেটার, মালিক বা ম্যানেজারদের সঙ্গে দেখা করছেন, সে সব খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তামিলনাড়ু প্রিমিয়ার লিগের (টিএনপিএল) কিছু ম্যাচ দেখে প্রথম সন্দেহ তৈরি হয়। টিএনপিএলের কয়েকটি দল বিসিসিআইয়ের নজরে রয়েছে। সেই দলগুলির ম্যাচে অস্বাভাবিক এবং সন্দেহজনক ঘটনা দেখা গিয়েছে। এসিএসইউ শাখার কর্মীরা মনে করছেন, জুয়াড়িদের সঙ্গে ক্রিকেটার-মালিক পক্ষ-কর্তাদের একটি চক্র গড়ে উঠেছে। খেলার আগে থেকেই কিছু বিষয় ঠিক করে রাখা হচ্ছে। আগামী ২৩ অগস্ট পর্যন্ত চলবে টিএনপিএল। প্রতিযোগিতার বাকি ম্যাচগুলিতে নজর রাখছে এসিএসইউ।
সাধারণ ভাবে আইপিএল এবং সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফি শেষ হওয়ার পর বিভিন্ন রাজ্যের টি-টোয়েন্টি লিগগুলি শুরু হয়। তামিলনাড়ু ছাড়াও মুম্বই, সৌরাষ্ট্র, বাংলা, অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্নাটক, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, পঞ্জাব, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, অসম, ঝাড়খণ্ডে টি-টোয়েন্টি লিগ হয়। ঘরোয়া মরসুম শুরুর আগে জুন থেকে অগস্টের মধ্যে হয় প্রতিযোগিতাগুলি। একসঙ্গে তিন-চারটি রাজ্যে টি-টোয়েন্টি লিগ হয়। অধিকাংশ লিগই তেমন জনপ্রিয় নয়। তাই নজর পড়ে কম। সেই সুযোগটাই কাজে লাগায় জুয়াড়িরা। দ্রুত বেশি আয়ের লোভে জুয়াড়িদের ফাঁদে পা দেন ক্রিকেটার, কর্তা, আয়োজকেরা। কিছু দলমালিকও বিনিয়োগ করা টাকা দ্রুত ঘরে তুলতে চান।
বিসিসিআইয়ের ওই কর্তা বলেছেন, ‘‘জুয়াড়িরা যে ভাবে কাজ করে তাতে ক্রিকেটার, কর্তা, আয়োজক, দলমালিকেরা ফাঁদে জড়িয়ে যান। অনেকে সন্দেহের তালিকায় রয়েছেন। তাঁরা প্রত্যেকে এসিএসইউয়ের কড়া নজরদারিতে রয়েছেন। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ হলে কড়া শাস্তি পেতে হবে।’’
গত বছর রঞ্জি অভিষেক হওয়া এক অলরাউন্ডার টিএনপিএলের ম্যাচ চলাকালীন ডাগআউটে বসে মেসেজ করেন। পরে জানা যায়, তিনি প্রেমিকাকে মেসেজ করছিলেন। প্রাথমিক ভাবে অপরাধমূলক কিছু পাওয়া যায়নি। তা-ও শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে তাঁকে ১ লাখ টাকা জরিমানা এবং সতর্ক করা হয়েছে। ওই ক্রিকেটার কী ভাবে মোবাইল নিয়ে ডাগআউট পর্যন্ত পৌঁছোলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি কেন ম্যাচের সময় সঙ্গে ফোন রাখার কথা গোপন করেছিলেন? দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তাকর্মীরা কী করছিলেন? ঠিক ভাবে কেন তল্লাশি করা হয়নি? এমন নানা প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে এসিএসইউ। কারণ প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলে ফেলা কোনও ক্রিকেটার নিয়ম জানেন না, বিশ্বাস করা কঠিন।
এই ঘটনায় অস্বস্তিতে তামিলনাড়ু ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের কর্তারাও। সংস্থার সভাপতি টিজে শ্রীনিবাসরাজ বলেছেন, ‘‘আমরা সব সময় বিসিসিআইয়ের দুর্নীতি দমন এবং নিরাপত্তা শাখা এবং টিএনপিএলের নির্দেশিকা, আইন কঠোর ভাবে মেনে চলার পক্ষে। আমরা এসিএসইউয়ের কর্মীদের পূর্ণ সহযোগিতা করছি। নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলছি। তাঁদের কাজ করতে যাতে কোনও সমস্যা না হয়, তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। পরিচ্ছন্ন, স্বচ্ছ ক্রিকেটই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’’
বিসিসিআই সচিব দেবজিৎ শইকীয়া বলেছেন, ‘‘টিএনপিএলে একটি ছোট ঘটনা ঘটেছে। এসিএসইউ সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি খতিয়ে দেখেছে। অভিযুক্ত ক্রিকেটারদের শাস্তিও দেওয়া হয়েছে। আমাদের দুর্নীতি দমন শাখা অত্যন্ত সক্রিয় এবং সজাগ। কোনও সামান্য বিষয়ও নজর এড়ায় না। ক্রিকেটের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সব সময় কাজ করছে এসিএসইউ।’’
২০১৮ সালেই রাজ্য টি-টোয়েন্টি লিগগুলির জন্য নির্দেশিকা তৈরি করেছিল বিসিসিআই। সব রাজ্য ক্রিকেট সংস্থাকে জানিয়ে দেওয়া হয় নিয়মকানুন। কে কী করতে পারবেন, কী পারবেন না তারও নির্দিষ্ট তালিকা রয়েছে। যা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলার কথা। ২০১৯ সালেও টিএনপিএলের সঙ্গে জুয়াড়িদের যোগাযোগের তথ্য প্রকাশ্যে এসেছিল। সেই ঘটনার তদন্তও করেছিল বিসিসিআই। যদিও সেই রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়নি।