খাতায়কলমে জাতীয় ছুটির দিন। তবে ১৫ অগস্ট শুধু তারিখ নয়, বরং ভারতবাসীর কাছে এ দিনের মাহাত্ম্য ও তাৎপর্য, দুই-ই গভীর।
এমন দিনে কাছে-পিঠে কোথাও বেড়াতে যেতে চান? চলুন এমন জায়গায়, যে স্থান স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বইয়ে পড়া বিপ্লবীদের কর্মকাণ্ডের স্থল, তাঁদের বাড়ি ঘুরে নিন। সফর তালিকায় রাখবেন কী কী?
মাতঙ্গিনীর স্মৃতিধন্য তমলুক
তমলুকের আলিনান গ্রামে রয়েছে মাতঙ্গিনী হাজার মূর্তি, স্মারক। ছবি:সংগৃহীত।
স্বাধীনতা আন্দোলনের শহিদ মাতঙ্গিনী হাজরার জন্মস্থান পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুক। ১৯৪২-এর ২৯ সেপ্টেম্বর ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলনে’ তমলুক আদালত এবং থানা দখল অভিযানের সময় পুলিশের গুলিতে বানপুকুরের কাছে নিহত হন গাঁধীবুড়ি মাতঙ্গিনী। হোগলা গ্রামে মাতঙ্গিনীর জন্মস্থলে রয়েছে তাঁর স্মৃতি কুটির। মাতঙ্গিনীর শ্বশুরবাড়ি আলিনান গ্রামে। তমলুক থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে হোগলা এবং আলিনান গ্রাম জুড়ে ছড়িয়ে মাতঙ্গিনীর স্মৃতি। মূর্তি, স্মারকে শ্রদ্ধার নানা নিদর্শন। আলিনানে মাতঙ্গিনীর স্মৃতিতে তৈরি হয়েছে সংগ্রহশালা। ১৯৭৩ সালে মাতঙ্গিনীকে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গাঁধী। সেই স্মারকও দেখা যাবে এখানে এলে।
শুধু মাতঙ্গিনীর স্মৃতিবিজড়িত গ্রাম নয়, ঘুরে নিতে পারেন তমলুক রাজবাড়ি (যদিও সেটি প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত), শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ, মিউজ়িয়াম, বর্গভীমা মন্দির। উপভোগ করতে পারেন রূপনারায়ণের সৌন্দর্যও।
কী ভাবে যাবেন
কলকাতা থেকে সড়কপথে এলেই ঘোরা সুবিধাজনক। ব্যক্তিগত গাড়ি থাকলে ঘোরাঘুরি অনেকটাই সহজ হবে। তবে চাইলে বাসে তমলুক পৌঁছেও টোটো বা অটো ভাড়া করে দর্শনীয় স্থানগুলিতে যেতে পারেন। হাওড়া থেকে ট্রেন ধরে তমলুক গিয়েও দ্রষ্টব্যস্থানগুলি ঘোরা যায়।
নেতাজির স্মৃতি বিজড়িত দুই বাড়ি
বাঁ দিকের নেতাজির এলগিন রোডের বাড়ি, ডান দিকে কোদালিয়ার বাড়িটি। ছবি:সংগৃহীত।
৩৮/২, এলগিন রোডে রয়েছে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর পৈতৃক বাড়ি। একসময় এখান থেকেই ব্রিটিশদের চোখে ধুলো দিয়ে ছদ্মবেশে পালিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। এখন সেখানে রয়েছে মিউজ়িয়াম। এই বাড়ির ইট-কাট-পাথরে রয়েছে সুভাষের স্মৃতি। সযত্নে রক্ষিত সুভাষের ব্যবহৃত আসবাব, হাতে লেখা চিঠি, স্বাধীনতা সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। গবেষক এবং সাধারণ মানুষের পড়ার জন্য রয়েছে পাঠাগার।
কলকাতা ঘুরে চলে যেতে পারেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরের সুভাষগ্রামে। এখানে কোদালিয়ায় রয়েছে সুভাষচন্দ্রের প্রপিতামহের ভিটে। বাবা জানকীনাথ বসুর সঙ্গে এই বাড়িতে বহুবার এসেছিলেন তিনি। শৈশবে দুর্গোৎসবে এই বাড়িতেই আসতেন তিনি। একসময় কালের গ্রাসে এই বাড়ির ভগ্নদশা হয়েছিল। পরবর্তী কালে তা সংস্কার করা হয়। বছরভর খোলা না থাকলেও স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস, নেতাজি জন্মজয়ন্তী, দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে এই বাড়িতে প্রবেশ করা যায়।
কী ভাবে যাবেন
নেতাজি ভবন মেট্রো স্টেশন থেকে হাঁটাপথে নেতাজির বাড়ি পৌঁছোনো যাবে। বাসে এলগিন রোডের মোড়ে নেমে হেঁটে পৌঁছোনো যায়।
সুভাষগ্রামের বাড়িটিতে যাওয়ার জন্য শিয়ালদহের দক্ষিণ শাখায় লক্ষ্মীকান্তপুর বা বারুইপুর লোকাল ধরে সুভাষগ্রাম স্টেশনে নামুন। সেখান থেকে অটো বা টোটা ভাড়া করে গন্তব্যে পৌঁছন।সড়কপথে গেলে, রাজপুর-সোনারপুর চৌমাথা হয়ে কোদালিয়ার দিকে যেতে হবে।
অরবিন্দ ভবন
বিপ্লবী, দার্শনিক, কবি এবং যোগী অরবিন্দ ঘোষের জন্মভিটেও ঘুরে নিতে পারেন ১৫ অগস্ট। ঠিকানা ৮ শেক্সপিয়র সরণি (আগেকার থিয়েটার রোড)। ১৮৭২ সালের ১৫ অগস্ট জন্ম নিয়েছিলেন অরবিন্দ ঘোষ। অদ্ভুত ভাবে তাঁর জন্মদিবস এবং ভারতের স্বাধীনতা পাওয়ার দিনটি একই।
বাগিচা ঘেরা বাড়িটি কোলাহলমুখর কলকাতার বুকে যেন একটুকরো শান্তির ঠিকানা। উন্মুক্ত প্রশস্ত আঙিনা। গাছগাছালি ঘেরা উঠোন পেরোলে সেই বাড়ি। প্রবেশ করলেই পাঠাগার। পাশ দিয়ে সিঁড়ি উঠে গিয়েছে দোতলায়। পাঠাগার পার করে অন্দরমহলে পা রাখলেই অরবিন্দের সমাধি, সেখানে রয়েছে তাঁর পূত দেহাবশেষ। চারদিকে বারান্দা। ভিতরে রয়েছে ধ্যানকক্ষ। বিভিন্ন ঘরে রয়েছে অরবিন্দ এবং শ্রীমার প্রতিকৃতি, আর আছে অরবিন্দের লেখা অজস্র বই। এখান থেকে মশলাপাতি, ধূপের মতো সাধারণ জিনিসও বিক্রি হয়।
কী ভাবে যাবেন
হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে বাসে করে নামতে হবে থিয়েটার রোড বা বিড়লা তারামণ্ডল স্টপেজে। সেখান থেকে হেঁটে যাওয়া যায়। হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে সরাসরি অ্যাপ ক্যাব বা ট্যাক্সি নেওয়া যেতে পারে।
শরৎচন্দ্রের ভিটে
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিবিজড়িত দুই স্থান। বাঁ দিকে দেউলটির বাড়ি। ছবি:সংগৃহীত।
কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র দেশাত্ববোধ জাগরণে তাঁর লেখনীকেই অস্ত্র করেছিলেন। ‘পথের দাবি’র মতো উপন্যাসে পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন, বিপ্লবীদের আত্মত্যাগ এবং দেশপ্রেমের গভীরবোধের রূপ প্রকাশ পেয়েছিল। সেই শিল্পীর স্মৃতিধন্য বাড়িটিও দেখে আসতে পারেন স্বাধীনতা দিবসে। দেউলটির কাছে পানিত্রাসের সামতাবেড় গ্রামে কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি। জীবনের শেষ কয়েক বছর তিনি এই গ্রামেই কাটিয়েছিলেন। সরকারি ব্যবস্থাপনায় এখন এই নিবাস পর্যটকের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। লেখার টেবিল থেকে শরৎচন্দ্রের ব্যবহৃত ঘড়ি— সবই সযত্নে রক্ষিত রয়েছে।
এখানে এলে রূপনারায়ণের রূপও চোখে পড়বে। বর্ষার নদ ভয়ঙ্কর সুন্দর। দেউলটিতে রয়েছে রাধা ও মদনগোপাল মন্দির। এই মন্দিরের টেরাকোটার কাজ মুগ্ধ করে।
শরৎচন্দ্রের শেষজীবন সামতাবেড়ে কাটলেও, হুগলির দেবানন্দপুরে তাঁর জন্মভিটে। তৈরি হয়েছে শরৎ স্মৃতি মন্দির। যদিও, এই স্থানের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে জনমানসে ক্ষোভ রয়েছে।
কী ভাবে যাবেন
হাওড়া থেকে লোকাল ট্রেনে করে পৌঁছোতে হবে দেউলটি। শরৎচন্দ্রের গ্রামে যেতে দেউলটি স্টেশন থেকে অটো ধরতে হবে। এ ছাড়া সড়কপথেও গাড়ি নিয়ে যেতে পারেন। পথে কোথাও না দাঁড়ালে দেড় থেকে দু’ ঘণ্টার পথ।
আলিপুর জেল মিউজ়িয়াম
আলিপুর জেল মিউজ়িয়াম। ছবি:সংগৃহীত।
ব্রিটিশ ভারতে নির্মিত কলকাতার প্রাচীনতম সংশোধনাগার আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের একাংশ এখন মিউজ়িয়াম। ‘হেরিটেজ’ ঘোষণা হওয়ার পর ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে আর কোনও আবাসিককে রাখা হয় না সেখানে। সরকারি উদ্যোগেই এই সংশোধনাগার রূপান্তরিত হয় জাদুঘরে। এখন এটি কলকাতার অন্যতম ভ্রমণস্থান।
স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে স্থানটি। এই সংশোধনাগারের মধ্যেই একসময় বন্দি ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু, অরবিন্দ ঘোষ, ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় থেকে শুরু করে যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত, দীনেশ গুপ্ত, রাধাচরণ পাল, প্রমোদরঞ্জন চৌধুরীরা। তাঁদের থাকার কুঠুরি, কী ভাবে তাঁরা বন্দিজীবন কাটিয়েছেন, সবকিছুর নিদর্শন রয়েছে এখানে। ‘লাইট অ্যান্ড সাউন্ড’ অনুষ্ঠানও হয় এখানে। এই শো-তে যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে বিপ্লবীদের উপর অত্যাচারের কাহিনি।
মঙ্গলবার থেকে রবিবার দুপুর ১২টা থেকে ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে। ধ্বনি-আলোর অনুষ্ঠানও দেখতে পারেন। তবে তা শুরু হয় সন্ধ্যা ৭টার পরে।
কী ভাবে যাবেন
যতীন দাস বা নেতাজি ভবন এই স্থানের কাছের দু’টি মেট্রো স্টেশন। সেখানে থেকে অটো বা টোটোয় পৌঁছোনো যায়। আলিপুরগামী বাসে চেপেও এখানে আসা যায়। ন্যাশনাই লাইব্রেরি স্টপেজে নেমে হেঁটে পৌঁছোনো যাবে। হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে ক্যাব ভাড়া করে যাওয়া যেতে পারে।