বেড়ানোর স্মৃতিটুকু আগলে রাখতে ফ্রিজে বা দেওয়ালে লাগানোর ম্যাগনেট কেনার চল বহু দিনের। কেউ তা আগলে রাখেন বেড়ানোর স্মৃতি হিসাবে। কেউ আবার তা আনেন আত্মীয়, বন্ধুদের উপহার দেওয়ার জন্য। তা শুধু শোভাবর্ধন করে না, বরং স্মারকের মধ্যেই সুপ্ত থাকে ভ্রমণের আবেগঘন স্মৃতি।
সেই ভাবনাতেই কি বদল আসছে? ভ্রমণশেষে বাড়ি ফেরার আগে স্মারক হিসাবে ফ্রিজ ম্যাগনেট, স্থাপত্যের ক্ষুদ্র সংস্করণ কিংবা বিশেষ ছবি দেওয়া টি-শার্ট কেনার দিন এখন অনেকটাই ফিকে। বরং পর্যটকদের কেনাকাটার অন্যতম গন্তব্য হয়ে উঠছে মুদিখানা আর সুপারমার্কেট।
নিজের দেশে না পাওয়া বিশেষ মুখরোচক খাবার, বিশেষ কোনও সস্ বা রান্নার মশলাপাতি দিয়ে ব্যাগ ভরছেন ভ্রমণপিপাসুদের একাংশ। উদ্দেশ্য একটাই, সেখান থেকে ফেরার পরেও যেন খাওয়ার টেবিলে বসে ভ্রমণের স্বাদ আবার ফিরে পাওয়া যায়। তবে বেড়াতে গিয়ে নতুন শহর থেকে খাদ্যদ্রব্য আনার চল যে নতুন, তা বলা চলে না। কারণ, দক্ষিণ ভারত গিয়ে সেখান থেকে খাঁটি মশলা কেনার চল বহু দিনের, আবার গোয়া থেকে স্থানীয় সুরা বন্ধুদের উপহার দেওয়ার জন্য আনেন অনেকেই, যেমন কাশ্মীর থেকে লোকে আনেন আখরোট, পেস্তা। তবে ইদানীং জনপ্রিয় খাবার ছাড়াও, কোনও একটি জায়গার স্থানীয় খাবারের স্বাদই বুঝতে স্থানীয় মুদিখানায় ঢুঁ মারছেন পর্যটকদের একাংশ। অচেনা খাদ্যদ্রব্য উপহার হিসাবে পরিবারের জন্য নিয়ে আসছেন, যাতে তাঁরাও সেই স্বাদের শরিক হতে পারেন। ভ্রমণজগতে এই ধারাটির গালভরা নাম হয়েছে ‘গ্রোসারি স্টোর ট্যুরিজম’।
মুদিখানা ঘুরে চেনা যায় অচেনা শহরকে
রেস্তরাঁয় গিয়ে স্থানীয় খাবারের স্বাদ চেখে দেওয়া যায়। তবে টাটকা বা রান্না করা খাবার তো আর লম্বা সফরে ফেরার সময় নিয়ে আসা যায় না। কিন্তু কোনও একটি নতুন দেশের শহরের সুপার মার্কেটের মুদিখানা বিভাগে গেলে স্পষ্ট হয় সেখানকার লোকজন কোন ধরনের বিস্কুট, কেক, নুড্লস, চকোলেট বা কোন ধরনের খাবার খান। একজন পর্যটকের কাছে সেই স্বাদ, সেই জানা নতুন প্রাপ্তি হতে পারে। রান্না করা খাবার আনার ক্ষেত্রে যে সমস্যা হয়, মুদিখানা থেকে প্যাকেটজাত খাবার, মশলা, নুড্লস নিয়ে আসতে তেমন অসুবিধা হয় না।
দেশ-বিদেশের স্বাদের সম্ভার
জাপান
মোমিজি মাঞ্জু এবং ইয়াতসুহাশি। ছবি:সংগৃহীত।
খাদ্য-উপহারের সংস্কৃতিতে জাপান কয়েক কদম এগিয়ে। তাদের ‘ওমিয়াগে’ প্রথা অনুযায়ী, আঞ্চলিক খাবার সুন্দর বাক্সে সাজিয়ে ভ্রমণের স্মারক বা উপহার হিসাবে দেওয়ার চল রয়েছে। কিয়োটোর চালের মিষ্টি ‘ইয়াতসুহাশি’ কিংবা হিরোশিমার ম্যাপল পাতার আকারের মিষ্টি খাবার ‘মোমিজি মাঞ্জু’ এর অন্যতম উদাহরণ। তা ছাড়া সেখানকার স্টোরগুলিতে নানা স্বাদের চকোলেট, ভাল মানের মাচা ও গ্রিন টি বিক্রি হয়, যা উপহার হিসাবে দেওয়ার চল রয়েছে।
ভারত
গোয়ার জনপ্রিয় মিষ্টি পুডিং বেবিঙ্কা। ছবি:সংগৃহীত।
ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের আসল স্বাদের খোঁজ পেতে স্থানীয় বাজারে ঢুঁ মারতেই হয়। যেমন, গোয়া থেকে আনা যায় হালকা মিষ্টি পুডিং বেবিঙ্কা। রান্নায় টক স্বাদ আনার ‘কোকুম’ বা সি-ফুডের ‘রেচেয়াডো মশলা’-ও কেনেন অনেকে। কাশ্মীর থেকে খাঁটি জাফরান, কেরল থেকে তাজা গোলমরিচ-এলাচ, লখনউয়ের ঐতিহ্যবাহী মিঠাই কিংবা মহারাষ্ট্রের কোঙ্কণ উপকূলের স্থানীয় আচার, দার্জিলিং এবং অসমের চা, দক্ষিণ ভারতের কফি— এ সবই হয়ে ওঠে ভ্রমণের স্মারক।
ইটালি
রকমারি ইটালিয়ান পাস্তা। ছবি:সংগৃহীত।
ইটালি থেকে খাঁটি অলিভ অয়েল কিংবা বিশেষ গড়নের পাস্তা উপহার হিসাবে নিয়ে এলে খুশি হতে পারেন ভোজনরসিক আত্মীয়েরা। তা ছাড়া, বাড়িতে খাওয়ার জন্যও তা আনা যায়। স্মৃতি হিসাবে তা-ও কম মধুর হবে না।
মেক্সিকো বা তুরস্ক
মেক্সিকো বিশেষ লঙ্কা, হট সস নিয়ে এলে ঘরে বসেই সেখানকার খাবারের স্বাদ বাড়তি কয়েকটি দিন পাওয়া সম্ভব। তুরস্কের মশলা বাজারে গেলে সুমাক (সুমাক গাছের ফল গুঁড়িয়ে পাওয়া যায়) বা পুল বিবের সুবাসে (লাল লঙ্কার গুঁড়ো) কেনাকাটার লোভ সামলানো কঠিন। তবে না বুঝে একগাদা শিশি-বোতল জমানোর চেয়ে যে মশলাটির ব্যবহার জানা আছে, সেটাই অল্প করে কেনা ভাল।
স্বাদ ফুরোলেও, গল্প বেঁচে থাকে
এই ধরনের ভোজ্য স্মারকের সবচেয়ে সুন্দর দিক, ভাগ করে নেওয়ার আনন্দ। অফিসের সহকর্মীদের সঙ্গে মিষ্টির বাক্স খুলে বসা যায়, বাড়িতে খাওয়ার টেবিলে বিশেষ সেই খাবারটি খেতে খেতে শুরু হয় ভ্রমণের গল্পের আসর। খাবার এক সময় শেষ হয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু সেই স্মৃতি বহু দিন রয়ে যায়।
সুটকেস ভরার আগে কয়েকটি জরুরি কথা
প্যাকেজিং দেখে নিন। খাবার সিল করা আছে কি পরীক্ষা করে নেওয়া জরুরি। মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং উপাদানগুলি ভালো করে দেখে নিন।
সস্, তেল বা যে কোনও ধরনের তরল কেবিন ব্যাগেজে রাখার নিয়ম লঙ্ঘন করছে কি না, খেয়াল রাখুন। প্রয়োজনে তা চেক-ইন লাগেজে সাবধানে প্যাক করুন। দেশে ফেরার সময়েও জেনে নিন, এগুলি নিয়ে আসার ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে কি না। বহু দেশে মাংস, দুগ্ধজাত খাবার, তাজা ফলমূল বা বীজ নিয়ে প্রবেশে কড়া নিষেধাজ্ঞা থাকে।
স্মারক যে দামি বা চোখধাঁধানো মোড়কের হতে হবে, তার কোনও মানে নেই। ফেরার সময় হোটেলের পাশের দোকান থেকে কেনা সামান্য এক প্যাকেট চিপ্স, কেক বা নুড্লস, যা খেয়ে সফর কেটেছে— বাড়ি ফিরে ঘরে বসে সেই প্যাকেট খুললে গোটা সফরটাই যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে।