ট্রেনের টিকিট কাটতে গিয়ে হঠাৎ দেখলেন সময় লেখা রয়েছে ‘১৮:৪৫’ কিংবা ফ্লাইটের বোর্ডিং পাসে চোখ পড়তেই দেখলেন সময় দেখাচ্ছে ‘০২:১৫’। সাধারণ ভাবে ‘পৌনে সাতটা’ বা ‘রাত সোয়া দুটো’ বলতেই সকলে অভ্যস্ত। কিন্তু রেলের প্ল্যাটফর্ম কিংবা বিমানবন্দরের ডিসপ্লে বোর্ডে তাকালেই ১২ ঘণ্টার চেনা ঘড়িটা বদলে ২৪ ঘণ্টার জটিল হিসেব হয়ে যায় কেন?
আইএটিও-এর (ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অফ ট্যুর অপারেটর্স) প্রেসিডেন্ট রবি গোসাঁই এক সাক্ষাৎকারে বলছেন, নির্ভুল ভাবে যাত্রার সময় পরিচালনা এবং নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই ১২ ঘণ্টার বদলে বিমান এবং রেল ২৪ ঘণ্টার ঘড়িতে চলে।
এই বদলের নেপথ্য রয়েছে ইতিহাস। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ভারতে যখন সবেমাত্র রেলপথ বসছে, তখন সময় হিসেব হত সূর্যের আলো দেখে। প্রতিটি শহরের নিজস্ব স্থানীয় সময় ছিল। সে কারণেই এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে ট্রেন চালাতে গিয়ে রেলকর্মীরা সমস্যায় পড়তেন। ট্রেন কখন ছাড়বে আর কখন পৌঁছোবে, তার সার্বিক হিসেব রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ছিল। মুখোমুখি সংঘর্ষের ঝুঁকি যেমন বাড়ছিল, তেমনই যাত্রীরাও বিভ্রান্ত হচ্ছিলেন। সেই বিশৃঙ্খলা থেকে বাঁচতেই জন্ম নেয় ‘স্ট্যান্ডার্ড টাইম’-এর ধারণা।
কিন্তু শুধু স্ট্যান্ডার্ড টাইম নির্ধারণ করলেই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ধরা যাক, একটি ট্রেনের সময় লেখা রয়েছে ‘০৬:৩০’। এটা ভোর, নাকি বিকেল, বোঝা মুশকিল। সামান্য ভুলে যদি কোনও যাত্রী ভোর ছ’টার ট্রেন ধরতে সন্ধেয় স্টেশনে আসেন, তবে তাঁর ট্রেন ধরা হবে না। কিন্তু রেল বা বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে এই ভুলটি পরিণত হতে পারে ভয়াবহ দুর্ঘটনায়। মাঝরাত ১২:০০ আর দুপুর ১২:০০-এর বিভ্রান্তি এড়াতে তাই নিয়ে আসা হয় ২৪ ঘণ্টার ঘড়ি— যেখানে সময়ের মাপ ০০:০০ থেকে ২৩:৫৯ পর্যন্ত। এখানে ‘১৮:৪৫’ মানে নিশ্চিত ভাবেই সন্ধে, কোনও ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই।
বিমানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। আকাশপথে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যেতে পার হতে হয় একের পর এক টাইম জ়োন। যখন কলকাতা থেকে লন্ডনের উদ্দেশে বিমান ওড়ে, পাইলট, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার এবং গ্রাউন্ড ক্রুদের মধ্যে সেকেন্ডের ভগ্নাংশের হিসাবে যোগাযোগ রাখতে হয়। সময়ের সামান্য গরমিল মানেই রানওয়েতে বিপর্যয়ের ঝুঁকি। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে সর্বজনসম্মত সময় বা এবং ২৪ ঘণ্টার ঘড়ি ব্যবহার করা হয়, যাতে বিশ্বের যে প্রান্তেই বিমান থাকুক না কেন, সময় নিয়ে ধোঁয়াশা এড়ানো যায়। যাত্রীভোগান্তি এড়াতে এবং নিরাপত্তার খাতিরেই ২৪ ঘণ্টার কাঁটায় পা মেলায় রেল এবং বিমানসংস্থা।