আশঙ্কা অহেতুক ছিল না এবং নেপালে হড়পা বানের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে তা সত্যি হতেও শুরু করল। আজ রাতের মধ্যেই নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে এই বিপর্যয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৩৯২। নেপালের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, সে দেশে মারা গিয়েছেন ৩৮৯ জন, নিখোঁজ ৯১০ জন। তিব্বতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ। গত কাল তিব্বতে তিন জনের মৃত্যুর খবরের পরে সেখানে আজ আর নতুন করে মৃতের সংখ্যা জানানো হয়নি। সব মিলিয়ে নিখোঁজের সংখ্যা ১৪৬৮। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জায়সওয়াল সমাজমাধ্যমে জানিয়েছেন, ২৯০ জন ভারতীয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। এঁদের সিংহভাগই গিয়েছিলেন কৈলাস-মান সরোবর যাত্রায়। নিখোঁজ-তালিকায় পশ্চিমবঙ্গের ৩২ জন রয়েছেন।
আতঙ্কস্রোত বইয়ে আজ রাতে নেপালে ও তিব্বতে ভূমিকম্প হয়েছে এক ঘণ্টার ব্যবধানে। ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সাইসমোলজি এবং জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিয়োসায়েন্সেসের রিখটার স্কেলে তার মাত্রা যথাক্রমে ৩.২ এবং ৫। হিমবাহের ধসের ফলে রুদ্ধ নদীর জমে ওঠা জলধারা পাহাড় বেয়ে নেমে গত কালের বিপর্যয় ঘটিয়েছিল বলে বিশেষজ্ঞেরা মোটামুটি নিশ্চিত। এ বার চিনের জলসম্পদ মন্ত্রক জানিয়েছে, তিব্বতের উৎস থেকে নেপালে বয়ে আসা ছোচেন খোলা এবং পুরেপু সাংপো নদীর মোহনার জলধারা বাধাপ্রাপ্ত হয়ে (সম্ভবত গত কালের ধসই তার কারণ) বিরাট একটি অস্থায়ী হ্রদ তৈরি করেছে। ইতিমধ্যেই উপচে গিয়েছে সেই হ্রদ। আগামী তিন দিনে আরও অন্তত ৩০ লক্ষ ঘনমিটার জল জমবে সেখানে। চিনের আশঙ্কা, জলের চাপে এই হ্রদ ফেটে গেলে তার ফল হতে পারে গত কালের মতোই মারাত্মক। এই দুই নদী মিলেই তৈরি করেছে ভোটে কোশী নদীর উপরের অংশ। চিনের বার্তার পরে আরও দূরে সরে যেতে বলা হয়েছে নদীর কাছাকাছি এলাকার বাসিন্দাদের।
নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল গত কাল বলেছিলেন, সম্ভবত ভূমিকম্প থেকে ধস নেমেছিল পাহাড়ে। কিন্তু ভূমিকম্প আসলে হয়নি। আমেরিকার ভূতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, গত কাল স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে তাদের রিখটার স্কেলে ৫.২ মাত্রার একটি কম্পন ধরা পড়েছিল। সেই কম্পন তৈরি হয়েছিল নেপালের লাংটাং লিরাং পর্বতশৃঙ্গের উত্তরে একটি হিমবাহের একাংশ ভেঙে প্রায় চার হাজার ফুট নীচের উপত্যকায় আছড়ে পড়ার ফলে। অন্তত ২০০০ ফুট চওড়া সেই ভাঙা হিমবাহের টুকরোয় যে পরিমাণ বরফ আর পাথর ছিল, তা নেপাল-তিব্বত সীমান্তে বয়ে আসা লেন্দে খোলা নদীখাতে কার্যত বাঁধ দিয়ে দেয়। সেই অস্থায়ী প্রাকৃতিক বাঁধে আটকে যায় নদীর প্রবাহ। জমা জলের চাপে এক সময়ে সেই বাঁধ ভাঙে। টন-টন পাথর-কাদা-পলিমাটি নিয়ে জল দুরন্ত গতিতে নেমে আসে লেন্দে খোলার খাত বেয়ে।
নেপালের রাসুয়াগঢ়ীতে, তিব্বত সীমান্তে রয়েছে জিরং স্থলবন্দর। সেখানেই ‘ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ’-এর ঠিক নীচে লেন্দে খোলা মিশছে ভোটে কোশী নদীতে। এই মিলিত প্রবাহ দক্ষিণে ত্রিশূলী নদীর রূপ নিচ্ছে। গত কাল তরল কংক্রিটের প্লাবনের মতো লেন্দে খোলা নদী ধেয়ে এসে গিলে ফেলে জিরং স্থলবন্দরের পেল্লায় কাঠামোকে। খড়কুটোর মতো উড়ে যায় ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ। ত্রিশূলীর জল মাত্র আধ ঘণ্টায় প্রায় ৩০ ফুট উঁচু হয়ে ফুঁসে ওঠে। কোনও পূর্বাভাস ছাড়াই ভোটে কোশী ভাসাতে থাকে তিমুরে, সিয়াপ্রু বেসির মতো এলাকাগুলিকে।
নেপালের পুলিশ জানিয়েছে, রাসুয়া, ধাদিং, নুয়াকোট, চিতওয়ানের মতো জেলাগুলিতে উদ্ধারকাজ জোরকদমে চলছে। তখনই উদ্ধার হচ্ছে মৃতদেহ। শুধু চিতওয়ান জেলাতেই ১৩২টি দেহ উদ্ধার হয়েছে। গত কাল ১০ টনের পরে আজ আরও ৩৭.৫ টন ত্রাণসামগ্রী নেপালে পাঠিয়েছে ভারত। কাঠমান্ডু ও বেজিংয়ের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। আজ রাত ৮টা পর্যন্ত পাওয়া পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে নয়াদিল্লি জানিয়েছে, নিখোঁজ ২৯০ জন ভারতীয়ের মধ্যে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের ৩২ জনের একটি দল, তামিলনাড়ুর ৩৭ এবং ৪৯ জনের দু’টি দল। ৬১ জনের আরও একটি দলও নিখোঁজ, যেটিতে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের পর্যটকেরা ছিলেন। এ ছাড়া, মূলত কেরল থেকে যাওয়া ৩৩ জনের একটি দলেরও খোঁজ মিলছে না। হড়পা বানে ক্ষতিগ্রস্ত ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত ৬৩ জন ভারতীয়কে উদ্ধার করা গিয়েছে। তামিলনাড়ুর ২১ জনের একটি দলও উদ্ধার হয়েছে। চিনের দিকে আটকে পড়েছেন প্রায় প্রায় ২০০ জন ভারতীয়। মৃতের সংখ্যা নিয়ে অবশ্য মন্তব্য করতে চায়নি দিল্লি।
আজ নুয়াকোট জেলায় ক্ষয়ক্ষতি পরিদর্শনে যান নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ। নেপালের বন্যাদুর্গত এলাকাগুলি থেকে ৫০ জন বিদেশি-সহ ৭৯৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। চিনা প্রধানমন্ত্রী লি কাং গিয়েছেন জিরংয়ে। উদ্ধারকাজে নেমেছে চিনা সেনার ওয়েস্টার্ন থিয়েটার কমান্ড।