জার্মানিতে এখন হেমন্তের হাওয়া। লাল-হলুদ পাতায় সেজে উঠেছে চারপাশের প্রকৃতি। জগৎবিখ্যাত ‘অক্টোবরফেস্ট’-এর আসর সবে মাত্র ভেঙেছে মিউনিখে। কিন্তু উৎসবের রেশ কাটতে না কাটতেই প্রবাসী বাঙালিদের অন্দরমহলে বেজে উঠেছে আগমনীর সুর। কারণ, মিউনিখ শহরের বুকে প্রতিবারের মতো এ বারও প্রস্তুত ‘শারদ সম্প্রীতি’। দেখতে দেখতে অষ্টম বর্ষে পদার্পণ করল এই পুজো।
ষষ্ঠী থেকে দশমী— টানা পাঁচ দিনের এই আয়োজনে মিশে থাকে সাবেকিয়ানার সুবাস। ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় স্থানীয় ভারতীয় দূতাবাসের আধিকারিকদের উপস্থিতিতে পুজোর আনুষ্ঠানিক বোধন হবে। এবারের মূল ভাবনা— ‘আড়ম্বর নয়, আন্তরিকতার পুজো’। জাঁকজমকে না মেতে, সবাইকে আপন করে নেওয়ার এক অনন্য নজির গড়ছে এই পুজো কমিটি। পুজোর দরজা খোলা থাকছে সমস্ত মানুষের জন্য। পুজোর কাজ সামলাবেন বার্লিন-প্রবাসী এক বঙ্গসন্তান এবং কমিটির নিজস্ব এক সদস্য। তবে উল্লেখযোগ্যভাবে, গোটা আয়োজনের সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন নারীশক্তি। ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় থাকছে জমজমাট ডান্ডিয়ার আসর এবং পুজোর বার্ষিক ম্যাগাজিন প্রকাশ।
পুজো মানেই তো পেটপুজো! এবার সেখানেও থাকছে অভিনবত্বের ছোঁয়া। একদিকে যেমন কাতলা কালিয়া আর নবমীর পাঁঠার মাংস থাকছে, তেমনই দেশি চাটের সঙ্গে ফিউশন হিসেবে মেনুতে জায়গা করে নিয়েছে অ্যাভোকাডো স্যালাড। আর এই এলাহি আয়োজনের দায়িত্বে রয়েছেন হাওড়ার সঞ্জীব। আদতে পঞ্জাবি হলেও সঞ্জীবের মনটা একেবারে খাঁটি বাঙালি। মিউনিখে তাঁর দশটিরও বেশি রেস্তোরাঁর সফল ব্যবসা রয়েছে। তা সত্ত্বেও পুজোর ক'দিন দু'বেলাই নিজের হাতে ‘শারদ সম্প্রীতির হেঁশেল সামলাবেন তিনি।
এবারের পুজোর নেপথ্যে রয়েছে এক কঠিন লড়াইয়ের গল্প। পুজোর অন্যতম দায়িত্বপ্রাপ্ত শিলিগুড়ির ছেলে জয়দীপ চট্টোপাধ্যায় জানালেন, “এ বছরটা আমাদের জন্য রীতিমতো চ্যালেঞ্জিং ছিল। নানা কারণে মায়ের আসা নিয়ে একটা প্রবল অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। বলতে গেলে, মাত্র দু’মাসের প্রস্তুতিতে পুজোটা নামাতে হচ্ছে।” তবে হাল ছাড়েননি জয়দীপ ও তাঁর সহযোগী অমিত সাহা। দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কের পুজো করার পুরনো অভিজ্ঞতাকে পাথেয় করেই এগিয়েছেন। দিনরাত এক করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে গোটা দল। এই আয়োজক দলের আরেক বড় চমক হলেন এক জার্মান নাগরিক। ইউরোপের বুকে কোনও দুর্গাপুজোর মূল কমিটিতে এক ভিনদেশি নাগরিকের এমন সক্রিয় অংশগ্রহণ সচরাচর চোখে পড়ে না।
উৎসবের দিনগুলোর সাংস্কৃতিক সূচিও বেশ আকর্ষণীয়। সপ্তমীর আনন্দমেলা, অষ্টমীতে সদস্যদের নিজস্ব পরিবেশনার পর, নবমীর রাতে থাকছে সবচেয়ে বড় ধামাকা। প্রবাসীদের মনে কলকাতার নস্টালজিয়া ফিরিয়ে দিতে সে দিন মঞ্চ মাতাতে আসছে শহরের জনপ্রিয় বাংলা ব্যান্ড 'লক্ষ্মীছাড়া'। দেবাদিত্য, গৌরব, সঙ্কেত, রাজীব, বোধিসত্ত্বদের জাদুতে মিউনিখের বুকেই যেন জীবন্ত হয়ে উঠবে ফেলে আসা কলেজ জীবন আর ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র স্মৃতি।
কমিটির অন্যতম কর্ণধার অমিত সাহার কথায়, "পুজোয় কলকাতায় গিয়ে যদি উৎসবের আনন্দ উপভোগ করতে নাই-বা পারলাম, উৎসবের সেই মেজাজটা আমরা এখানেই তৈরি করে নিই।" এভাবেই আনন্দ আর আড্ডায় পাঁচটা দিন কাটানোর পর দশমীর সিঁদুরখেলায় বাজবে বিদায়ের সুর। আর শুরু হবে "আসছে বছর আবার হবে"-র অনন্ত অপেক্ষা।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ ।