প্রবাসে পুজোর মণ্ডপ গড়তে গিয়ে তৈরি হয় আর এক সংসার। সেখানে প্রথম আলাপ থেকে বন্ধুত্ব, বন্ধুত্ব থেকে একসঙ্গে কাজ করার অভ্যাস। এক জন হাত ধরে নিয়ে আসেন আর এক জনকে। তার পর এক দিন সেই নতুন মানুষটিই অন্য কাউকে ডেকে আনেন। এ ভাবেই সানফ্রান্সিসকো বে এরিয়ায় আটাশ বছর ধরে একটু একটু করে বেড়ে উঠেছে সংস্কৃতির সংসার। এ বারের পুজোয় সেই মণ্ডপ সেজেছে জামদানির নকশায়, স্টেইনড গ্লাসের আদলে। কিন্তু মণ্ডপের আলোয় যতটা না নজর, তার চেয়েও বেশি গল্প লুকিয়ে রয়েছে সেই আলো জ্বালানোর মানুষগুলোর মধ্যে।
এ বছরও তেমনই এক আলাপের সূত্রপাত বাংলা বইয়ের গ্রন্থাগারে। এক প্রবীণ স্বেচ্ছাসেবকের সঙ্গে পরিচয় হয় এক তরুণের। কথায় কথায় আসে দুর্গাপুজোর প্রসঙ্গ। মণ্ডপ তৈরিতে হাত লাগানোর আমন্ত্রণ পেয়ে হাজির হন তরুণও। প্রথম দিন যাঁদের সঙ্গে দেখা, তাঁরা তখন নেহাত পরিচিত। কয়েক সপ্তাহ পরে তাঁদেরই কেউ দেরি করলে ফোন করে তাড়া দেওয়ার অধিকার জন্মে গিয়েছে!
দেশের পাড়ার পুজোয় ঠিক যেমন হত। ছোটবেলায় বাবা-মায়ের হাত ধরে ঠাকুর দেখতে যাওয়া, মণ্ডপের থিম দেখে মুগ্ধ হওয়া, আর মনে মনে ভাবা, কোনও দিন যদি এমন কিছু নিজের হাতে গড়া যেত! সংস্কৃতির সেই তরুণ স্বেচ্ছাসেবকের কাছে প্রবাসে এসে যেন সেই পুরনো ইচ্ছেটাই পূরণ হল।
১৯৯৮ সালে শুরু হওয়া সংস্কৃতির পুজো আজ আটাশ বছরের। সদস্যচাঁদা নেই, সকলেই স্বেচ্ছাসেবক। বসন্ত থেকেই শুরু হয় অকালবোধনের প্রস্তুতি। শেষ ছ’সপ্তাহে রবিবারের সকালগুলো কেটে যায় কাঠ কেটে ফ্রেম বানাতে, রং করতে, আলো বসাতে। কাজের ফাঁকে চলে আড্ডা আর খাওয়াদাওয়া। কখনও বাড়ি থেকে রান্না করে আনা এক হাঁড়ি পাঁঠার মাংসও খাওয়া হয়। এক রবিবার তীব্র গরমের পূর্বাভাসে মাত্র তিন জন হাজির হয়েও ছায়ার ব্যবস্থা করে টানা সাত ঘণ্টা বিদ্যুতের তার লাগানোর কাজ শেষ করেন। কাজের তালিকা ছোট হয়, আর পরিচিত মানুষগুলোর সঙ্গে দূরত্বও একটু একটু করে কমে আসে।
আরও পড়ুন:
তবে পুজোর কাজে বন্ধুত্বের পরীক্ষা শুধু আড্ডায় হয় না।
এ বারের থিম ‘আলোর মন্দির’। জামদানির নকশা স্টেইনড গ্লাসের আদলে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মণ্ডপে। অথচ বোধনের সন্ধ্যায় সেই আলোই বেঁকে বসল! অতিরিক্ত বিদ্যুতের চাপে বিকল ট্রান্সফর্মার, দেবীর মুখের শিল্পকর্মটি অন্ধকারে। নীচে মন্ত্রোচ্চারণে বোধন চলছে, উপরে দু’টি মইয়ে দাঁড়িয়ে বিদ্যুতের সংযোগ সারছেন দুই স্বেচ্ছাসেবক। তৃতীয় জন নীচ থেকে জিনিসপত্র জোগাচ্ছেন। বোধন অর্ধেকের বেশি এগোনোর পরে একে একে আলো ফিরতে লাগল। নীচে নেমে তাঁরা দেখলেন, একটু একটু করে ফুটে উঠছে মায়ের মুখ। দর্শনার্থীরা পুজোয় মগ্ন, এই ব্যস্ততা তাঁদের নজরেই পড়ল না।
কয়েক সপ্তাহ আগেও যাঁরা পরস্পরের কাছে ছিলেন নেহাত পরিচিত, তাঁরাই এখন একসঙ্গে সামলাচ্ছেন এমন বিপত্তি। সংস্কৃতির কাছে এ দৃশ্য নতুন নয়। আটাশ বছরে কত নতুন মুখ এসেছে, কত পুরনো স্বেচ্ছাসেবক নতুনদের হাতে কাজ তুলে দিয়েছেন। মণ্ডপ বদলেছে, মানুষ বদলেছেন, কিন্তু একসঙ্গে কিছু গড়ে তোলার আনন্দটা রয়ে গিয়েছে।
আর সেই আনন্দই যেন ছড়িয়ে পড়ে মণ্ডপে আসা মানুষগুলোর মধ্যেও।
তিরিশের নীচে দুই বাঙালি তরুণ এসেছিলেন কয়েক মিনিটের জন্য। কথায় কথায় আক্ষেপ করলেন, বে এরিয়ায় বাঙালিদের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় গড়ে তোলা বড় কঠিন। শুনে সেই নতুন স্বেচ্ছাসেবক আর দেরি করেননি। অন্য বাঙালিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন, জানালেন বাংলা বইয়ের গ্রন্থাগারের কথা, ডাকলেন সংস্কৃতির কর্মকাণ্ডে। কয়েক মিনিট গড়িয়ে গেল ঘণ্টাখানেকে।
যে গ্রন্থাগারে এক প্রবীণ স্বেচ্ছাসেবকের সঙ্গে আলাপ থেকে তাঁর নিজের এই পথচলা শুরু, সেই গ্রন্থাগারের কথাই এ বার তিনি বলছেন অন্য দু’জনকে।
সংগঠনের এক কর্মকর্তার কথায়, এক ঘণ্টার পরিকল্পনা নিয়ে এসে পাঁচ ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়াও এখানে অস্বাভাবিক নয়। কেউ অন্য মণ্ডপ ঘুরে সন্ধ্যায় আবার ফিরে আসেন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। তিন দিনে প্রায় সাত হাজার মানুষের ভিড়, প্রতিদিন হাজার মানুষের অঞ্জলি, দু’দিনে দেড় হাজার মানুষের একসঙ্গে বসে খিচুড়ি-লাবড়ার ভোগ, পঁয়ত্রিশটির বেশি দোকানে দেশের খাবার আর বই—সব মিলিয়ে যেন দেশের পাড়ার পুজোর সেই পরিচিত মিলনমেলা।
পুজোর পরে অবশ্য মণ্ডপ খুলে ফেলা হয়। আলো নিভে যায়। আবার শুরু হয় অফিস, সংসার, দৈনন্দিন ব্যস্ততা। কিন্তু সংস্কৃতির দেখা হওয়ার উপলক্ষ ফুরোয় না। সরস্বতীপুজো, নাট্যমেলা, বাংলা বইয়ের গ্রন্থাগার আর সারা বছরের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সেই পরিচয়গুলোকে বাঁচিয়ে রাখার সুযোগ করে দেয়।
আটাশ বছর আগে সংস্কৃতির পথচলা কী ভাবে শুরু হয়েছিল, তার চেয়েও বড় কথা, এত বছর পরেও তার এই অভ্যাসটি বদলায়নি।
এ বার যেমন এক প্রবীণ স্বেচ্ছাসেবক গ্রন্থাগারে আলাপ হওয়া এক তরুণকে ডেকে এনেছিলেন। সেই তরুণ রবিবারের আড্ডায় বন্ধু পেয়েছেন, বোধনের সন্ধ্যায় তাঁদের সঙ্গে মইয়ে উঠে আলো জ্বালিয়েছেন। তার পর পুজোর ভিড়ে আরও দু’জনের মুখে একাকিত্বের আক্ষেপ শুনে তাঁদেরও ডেকে নিয়েছেন।
আটাশ বছরে সংস্কৃতির মণ্ডপে কত আলো জ্বলেছে, কত আলো নিভেছে। কিন্তু একজনের হাত ধরে আর একজনের কাছে পৌঁছে যাওয়ার এই আলোটা এখনও জ্বলছে।
হয়তো এ ভাবেই জ্বলবে। পরের বছরও কেউ কাউকে ডেকে আনবেন।
এই প্রতিবেদনটি আনন্দ উৎসব ফিচারের একটি অংশ।