ইতিহাসের সঙ্গে আত্মীয়তা, পুজোর আচার-অনুষ্ঠানে সাবেকিয়ানার ছাপ, আর বিসর্জনের পরেও অটুট স্বদেশ-ভাবনা। উত্তর কলকাতার হাটখোলার দত্তবাড়ির দুর্গাপুজো যেন এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে অতীত ও বর্তমানকে। সন্ধিপুজোয় ক্ষীরের পুতুল বলি থেকে দেবীর ভোগে লুচি-বাটা চিনি, কিংবা বিসর্জনের পরে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গান গাইতে গাইতে বাড়ি ফেরা—এ বাড়ির পুজোর প্রতিটি পর্বেই রয়েছে নিজস্বতা।
কলকাতার ইতিহাসের সঙ্গেও ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে রয়েছে হাটখোলার দত্তবাড়ি। এই পরিবারের সন্তান প্রাণকৃষ্ণ দত্ত প্রায় ১২০ বছর আগে ‘নব্যভারত’ পত্রিকায় ‘কলিকাতার ইতিবৃত্ত’ শিরোনামে চোদ্দোটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। সেকালের কলকাতার ইতিহাসের অন্যতম দলিল হিসেবে বিবেচিত হয় সেই লেখা। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পাটনা শাখার দেওয়ান জগৎরাম দত্ত হাটখোলা অঞ্চলে ভদ্রাসন নির্মাণ করে ১৭৯৪ সালে দুর্গাপুজোর সূচনা করেন। তবে দত্ত পরিবারের ২৮তম প্রজন্মের সদস্য অভীক দত্তের মতে, গোবিন্দপুর গ্রামের গোবিন্দশরণ দত্তের আমল থেকেই এই পুজো চলে আসছে।
দত্তবাড়ির পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্বদেশ-ভাবনাও। বিসর্জনের পরে বাড়ির ছেলেরা পথে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের স্বদেশি ভাবনার গান ‘বঙ্গ আমার জননী আমার...’ গাইতে গাইতে ফেরেন। দত্ত পরিবারের সঙ্গে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। সুভাষচন্দ্রের মা প্রভাবতী দেবী এই পরিবারেরই মেয়ে। দত্ত পরিবারের আর একটি শাখা রয়েছে গিরিশ পার্ক অঞ্চলে। সেখানেও দুর্গাপুজো হয়। সেই পুজোর সূচনা করেছিলেন বিখ্যাত আইনজীবী শ্যামলধন দত্ত।
৭৮, নিমতলা ঘাট স্ট্রিটে অবস্থিত দত্তবাড়ির ঠাকুরদালানে উল্টোরথের দিন কাঠামো পুজোর মাধ্যমে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয়। অভীক দত্ত জানান, ‘‘দ্বারকা, পুরীর মতো কয়েকটি পুণ্য তীর্থক্ষেত্র থেকে মাটি নিয়ে এসে আমাদের ঠাকুরদালান তৈরি করা হয়েছে।’’ ভাদ্র মাসে প্রতিমা নির্মাণের কাজ বন্ধ থাকে। আশ্বিন মাস পড়লে ফের শুরু হয় প্রতিমা তৈরির কাজ। সাবেকি প্রতিমা এবং মঠচৌড়ি চালচিত্র এ বাড়ির পুজোর বিশেষত্ব। দেবীর বাহন ঘোটকমুখী সিংহ।
সপ্তমীতে নবপত্রিকা স্নান, মহাষ্টমীতে কুমারী পুজো—নিয়ম মেনেই সম্পন্ন হয় পুজোর নানা পর্ব। তবে এ বাড়িতে পশুবলি হয় না। সন্ধিপুজোয় ক্ষীরের পুতুল বলি দেওয়ার রীতি রয়েছে। সেই বলি দেখার নিয়ম নেই। কাপড় দিয়ে ঘিরে রাখা হয় বলির স্থান। বলির সময়ে দত্তবাড়ির সদস্যেরা কিছুক্ষণের জন্য মাথা নিচু করে নেন।
এ বাড়িতে সিঁদুর খেলার প্রচলনও নেই। সন্ধিপুজো শেষ হলে দেবীর পায়ে সিঁদুর ছুঁইয়ে নেন বাড়ির বৌয়েরা। তার পরে একে অপরের মাথায় সেই সিঁদুর পরিয়ে দেন। আচার-অনুষ্ঠানের এই নিজস্ব ধরনই দত্তবাড়ির পুজোকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
দেবীর ভোগেও রয়েছে নিজস্বতা। প্রতিদিন সকালে মা দুর্গাকে নিবেদন করা হয় ‘নিজ-ভোগ’। তাতে থাকে ঘিয়ে ভাজা লুচি ও বাটা চিনি, অর্থাৎ চিনির গুঁড়ো। পরিবারের সদস্য ছাড়া বাইরের কেউ এই ভোগ গ্রহণ করতে পারেন না। এ বাড়িতে অন্নভোগ হয় না। বরং মিষ্টি ও নোনতা নানা পদ নিবেদন করা হয় দেবীকে।
পঞ্চমী থেকেই বাড়িতে বসে ভিয়েন। খাঁটি ঘি দিয়ে ভাজা রাধাবল্লভি, নিমকি ও খাস্তা কচুরি থাকে ভোগের তালিকায়। মিষ্টির মধ্যে থাকে মতিচুর, দরবেশ, লম্বাটে পান্তুয়া এবং মিঠে গজা। গজার বিশেষত্ব, তাতে পোস্ত থাকে। স্বাদেও রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য—হালকা মিঠে, হালকা নোনতা।
পুজোর শেষ পর্বেও ঐতিহ্যের ব্যতিক্রম নেই। আজও মানুষের কাঁধে চেপে গঙ্গায় বিসর্জনে যান দেবী। প্রতিমা বিসর্জনের পরে হাটখোলার দত্তবাড়ির ছেলেরা গঙ্গা থেকে বাড়ি ফেরেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘বঙ্গ আমার জননী আমার...’ গাইতে গাইতে। বাড়ির অদূরের মাঠে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে পর পর তিন বার গানটি গাওয়া হয়। তার পরে একসঙ্গে ওঠে ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনি।
সব শেষে ঠাকুরদালানে গিয়ে শান্তির জল নেন পরিবারের সদস্যেরা। তার পরে পরিবারের কুলদেবতা তিন নারায়ণ শিলাকে প্রণাম জানিয়ে শুরু হয় বিজয়ার প্রণাম পর্ব।
পুজোর দিনগুলি ফুরিয়ে আসে, বিসর্জনের জলে ভাসে প্রতিমা। কিন্তু হাটখোলার দত্তবাড়িতে ঐতিহ্যের পথচলা থামে না সেখানেই। দেবীর বিদায়ের পরেও দ্বিজেন্দ্রলালের গান, ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনি আর পরিবারের রীতিনীতির মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকে ইতিহাসের স্মৃতি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেই ঐতিহ্যই যেন মনে করিয়ে দেয়, পুজো শুধু কয়েক দিনের উৎসব নয়—এ এক পরিবারের শিকড়, স্মৃতি ও বিশ্বাসের ধারাবাহিকতা।
এই প্রতিবেদনটি 'আনন্দ উৎসব' ফিচারের একটি অংশ।