‘দেবীবরণ’ ছবির ‘গা ছম ছম কী হয় কী হয়’ গানে ‘বিবি পায়রা’ হয়ে একসময় বাঙালির পুজোয় ঝড় তুলেছিলেন পাপিয়া অধিকারী। সময়ের সঙ্গে বদলেছে তাঁর পরিচয়, মঞ্চ-পর্দার পরিচিত মুখ থেকে এখন তিনি টালিগঞ্জের বিধায়িকা। ব্যস্ততার ফাঁকেই কাটোয়া থেকে ফেরার পথে গাড়িতে বসে আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে পুজোর নানা গল্প অনর্গল বলে গেলেন পাপিয়া।
প্রশ্ন: এই সময় তো খুবই ব্যস্ততা যাচ্ছে, এতকিছুর মধ্যে নবরাত্রি পালন করছেন বাড়িতে?
পাপিয়া: হ্যাঁ, আমার বাড়িতে নবরাত্রির পুজো শুরু হয়েছে। নবমী অবধি হবে। আমি রোজ চণ্ডীপাঠ করি। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, যে যতই নিন্দে করুক মানুষকে ক্ষমা করতে জানতে হবে।
প্রশ্ন: টালিগঞ্জ বিধানসভায় আপনার জয় তো দেবীর মহিষাসুর বধের সঙ্গে তুলনা করছে মানুষ?
পাপিয়া: মানুষ মুক্ত মনে নিঃশ্বাস নিতে পারছে। কিন্তু এখনও এ সব অসুরদের প্রতিপত্তি কমেনি। দুই ভাই তো নেই, কিন্তু এরা যে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে গিয়েছে তারা তো এখনও ঘুরছে। সেগুলোকে শক্ত হাতে দমন করতে হবে। এখন আমাদের শুভেন্দুদা (অধিকারী), মিঠুনদা (চক্রবর্তী) আছেন, তাঁরা অনেক অভিজ্ঞ, সঙ্গে আলোচনা করছি। যেমন এ বার পুজোয় ভিআইপি কার্ড কিছু নেই।
প্রশ্ন: তা হলে তো সবাই সমান সুযোগ-সুবিধা পাবেন! আপনি তো সুরুচি সংঘের খুঁটিপুজোয় গিয়েছিলেন, সেখানে তো খুব ভিড় হয়।
পাপিয়া: হ্যাঁ হয়৷ তবে এই বছর একটু অন্য স্বাদ পাবে সকলে। ওখানেই তো সাবুদি অর্থাৎ সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি। নিউ আলিপুরে থাকার সুবাদে পুজোতে এত বছর বেরোতেই পারেননি ভিড়ের জন্য। এ বছর সাবুদির খুব ভাল লাগবে, তাঁর বাড়ির সামনেটা পুজোতে মুক্ত হল। ভিআপি সংস্কৃতি বন্ধ করে দিয়েছেন আমাদের মাননীয় শুভেন্দু অধিকারী।
প্রশ্ন: আপনি বলছেন ক্ষমাশীল হতে! কিন্তু আপনার দুর্গা সাজা নিয়ে আপনার এত সমালোচনা হচ্ছে দেখেন সেগুলো?
পাপিয়া: (কিছুটা হেসে) আমার পরিচালক তথা বান্ধবী 'নবদূর্গা' নামে ছবিটি করেছেন। উনি দুর্গা চরিত্রের জন্য একজন সংস্কৃত জানা মহিলা খুঁজছিলেন। আমাকে বলা হয়েছিল বয়সটা কোনও ব্যাপার নয়, দুর্গাকে কিন্তু সংস্কৃত উচ্চারণ জানতে হবে। আমাকেই এই চরিত্র করতে হবে বলে খুব জোর করেছিল। সেটাই ছড়িয়েছে চারিদিকে। আর আমি তো সংস্কৃত রীতিমতো পড়েছি। তুলনামূলক সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করেছি। উপনিষদ চর্চা করি।
'নবদূর্গা' ছবিটা অনেকদিন ধরে এখনও গ্রামবাংলায় চলছে। দেখি কলকাতায় নন্দনে যদি দেখানো যায়। এ বার দেখছি তো ফেসবুকে সমালোচকের অভাব নেই। আমার মুখ থেকে আগুন বার করে দেখাচ্ছে অরূপ-স্বরূপকে খেয়ে ফেলছি। আমি খুব উপোভগ করছি ব্যাপারটা। যারা আমাকে সরাসরি বিদ্বেষ দেখাতে পারছেন না, এভাবে মিম করছে। মানী লোকের মান এতে নষ্ট হয় না। যারা মান নষ্ট করছেন তাদের ধিক্কার। আমার মুখে আগুন না জুড়ে এই সৃজনশীলতা ভাল কাজে তো লাগাতে পারতেন।
প্রশ্ন: কয়েক দিন আগে ইন্দ্রাণী হালদার বলেছেন ‘‘আমি নাকি বুড়ি দুর্গা! চার সন্তানের মা কি বাচ্চা মেয়ে?ʼʼ আপনিও রীতিমতো সমালোচিত, এ ক্ষেত্রে কী বলবেন?
পাপিয়া: অমিতাভ বচ্চন বলেছিলেন না ‘বুড্ডা হোগা তেরা বাপʼ । এই বয়সে আমি যা কাজ করছি তা আমার এলাকার মানুষেরা জানেন। রাতের বেলা অলিগলিতে ড্রাগ, মাদক ব্যবসা ধরছি। বিভিন্ন ফ্ল্যাটবাড়িতে দেহব্যবসার মধুচক্র বন্ধ করেছি। সমাজের শুম্ভ নিশুম্ভগুলোকে তো দমন করছি রোজ। মঞ্চেও তো বলি কালী, চামুণ্ডা দেবীদের উপাখ্যান। সংস্কৃত তো উঠেই গিয়েছে। আমি ভাবছি সংস্কৃত চালু করব।
প্রশ্ন: কিন্তু এত সমালোচনা কি ভাবায়?
পাপিয়া: ইডেন গার্ডেন তুলেও তো আমাকে ট্রোল করছে সকলে। আমার মুখ দুর্গা রূপে আকাশে। আমার পা এখন মাটিতে নেই, আকাশে উড়ছি(হাসি)। সিপিএম এখন হয়ে গিয়েছে অতৃপ্ত অশরীরী আত্মা। ওরা নিজেদের পেজের ভিউ বাড়াতে আমার জনপ্রিয় দুর্গা রূপ ব্যবহার করছে। আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কর্মফল দেখুন। কেন মা কালীকে 'প্রিজন ভ্যানে' ঢুকিয়েছিলেন? এ বার ওঁকেও ঢুকতে হল। ঈশ্বর আছেন। ওঁর সাধ ছিল বাংলাকে বৃহত্তর বাংলাদেশ করে নিজে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার। ঈশ্বর তা চাননি। তাই এ সব নিয়ে আমি ভাবি না।
প্রশ্ন: পাপিয়া অধিকারী তো পেশাদার রঙ্গমঞ্চের দাপুটে অভিনেত্রী ছিলেন। সেই পুরনো সংস্কৃতি ফেরারে আপনি কোনও উদ্যোগ নিচ্ছেন?
পাপিয়া: খুব চাই। 'সারকারিনা' স্টেজটা উপর-নিচ হত। এশিয়াতে যা মাত্র একটাই। আমরা সারকারিনাতে অভিনয় করেছি কত। সার্কাসের যে অ্যারিনা হয় তার থেকে সারকারিনা। হাজার রজনী নাটক করেছি 'কী বিভ্রাট', 'মর্জিনা'। বসন্ত চৌধুরীর সঙ্গে 'পরমা' নাটক, তার পর উত্তমকুমার-সাবিত্রীদির 'শ্যামলী' নাটকে অভিনয় করেছিলাম। আমার সহ-অভিনেতা ছিলেন প্রয়াত জয় বন্দ্যোপাধ্যায়। জ্ঞানেশ জেঠু (মুখোপাধ্যায়) পরিচালনা করেছিলেন। এই পুজোর সময় খুব মিস করি বোর্ড। ম্যাটিনি, ইভনিং হাউসফুল। ফেরাতে হবে পেশাদার রঙ্গমঞ্চ। ফোনে সিনেমা দেখলে হবে না।
প্রশ্ন: পুজো কীভাবে কাটাবেন?
পাপিয়া: দুই মেয়ে আর বরের সঙ্গে একটা দিন কাটাব। এ বার প্রচুর কাজও আছে। আর পুজোয় শাড়িই পছন্দের। আমি কাঁথা স্টিচের শাড়ি পছন্দ করি তাই পরব।
প্রশ্ন: আপনাকে পায়রা বলেও তো লোকে ট্রোল করে, এসব দেখে রাগ হয় না?
পাপিয়া: এই তো সেদিন একটা অনুষ্ঠানে উদ্যোক্তারা বলছেন আপনার একটা গান সবাই শুনতে চায়। আমি ভাবলাম আমার তো অনেক গান আছে ‘যদি কেহ কৃষ্ণ চায়ʼ ইত্যাদি। ওরা চালিয়ে দিল ‘পায়রা পায়রাʼ। রাগ কেন করব? পায়রা তো শান্তির প্রতীক এবার বাংলায় শান্তি এল। ভোটে আমার গণনার দিন বিশ্বাসের অনুরাগীরা বলেছিল ‘‘এই পায়রা আর উড়বে নাʼʼ! কিন্তু পায়রারা বকম বকম করবে না তা কি হয়? পাপিয়া অধিকারী যতদিন আছে পায়রা আছে। এই তো একদিন দেখলাম ফেসবুকে পায়রার দেহতে আমার মুখ দিয়ে ছবি করেছে। আমি রাগি না। আমি খুব ভাল কবাডি খেলোয়ার। হা হা হা। শতরূপ ঘোষ আমাকে 'মাফিয়া অধিকারী' বলেছিল। সত্যি যদি মাফিয়া হতাম ওঁর মুখে পাউডার লাগিয়ে রোজ চ্যানেলে বসা বন্ধ হয়ে যেত। দেবীপক্ষে এ সব অশরীরীদের কিছু বলতে চাই না।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ