চারিদিকে কত মানুষের কত রূপ। তাঁদের ঘিরে কতই না গল্প। বর্তমানে এমএলএ পদে থাকলেও অভিনেত্রী হিসেবে নানা অভিজ্ঞতা কুড়িয়েছি। কিছু হাসির। কিছু মজার। আবার কিছু অলৌলিক ঘটনা! আসলে মানুষ মারা গেলেও, আত্মা যে অবিনশ্বর, তার প্রমাণ একাধিকবার পেয়েছি আমি। তাকে কাটা যায় না। ছেঁড়া যায় না এবং কবর দেওয়াও যায় না। সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পর কত মানুষের যে মৃত্যুর কথা শুনেছি, তার ইয়ত্তা নেই! কিন্তু অভিনয় জীবনের শুরুর দিকে কিছু কিছু ঘটনা আজও ছাপ রেখে গিয়েছে মনে।
তখন আমি রাজনীতির মঞ্চ থেকে ঢের দূরে আদ্যোপান্ত অভিনেত্রী। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সূত্রে ঘুরে বেড়িয়েছি রণে বনে জলে জঙ্গলে! এমনই একটি দিন ছিল উত্তরবঙ্গে। ‘দিন’ ঠিক নয়। রাত। কুয়াশায় ঘেরা হিমেল রাত। আমার গাড়ি আগে ছুটছে হাওয়ার গতিতে। পিছনে ধীরে ধীরে আসছে সুধা চন্দনজির গাড়ি। সঙ্গে ছিলেন তাঁর মা, কেশসজ্জাশিল্পী প্রমুখ। আমার সঙ্গে রয়েছেন গাড়িচালক-সহ আমার ম্যানেজার এবং আরও দু’জন। সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রমের পর আমি চোখ বুজেছি প্রায়। হঠাৎ করে চিৎকারের আওয়াজ! ধড়মড় করে উঠে দেখলাম গাড়ি চলছে নিজের মতোই। কিন্তু সামনে দেখতে পেলাম প্রকাণ্ড একটা শরীর। ততক্ষণে তাঁকে কোনও রকমে এড়িয়ে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন আমার গাড়িচালক। জিজ্ঞেস করে বসলাম, “কী ছিল এটা!” আমার ম্যানেজার নিখিল আমাকে শান্ত করতে বলে উঠলেন, “কিছু না। শান্ত হন।” তখন আর কী ভাবেই বা শান্ত হই! আসলে ওটা কোনও গাছের ডাল যে মোটেই ছিল না। ছিল প্রকাণ্ড একটা মানুষের শরীর। অথচ মাথা নেই। এই বিষয়টি সুধাজির নজর থেকেও এড়িয়ে যায়নি। পরে আমাকে জিজ্ঞেস করতেই মজা করে বলেছিলাম, “এটা আমাদের বাংলা, এখানে অনেক কিছু হয় এবং সেগুলিকে ভুলে যেতে হয়!”
এর পরেই আসি আরও একটা ঘটনায়। তখনও মুঠোফোন সকলের হাতে আসেনি। অনুষ্ঠানের জন্য যোগাযোগ করতে একটু সমস্যাই হতো বেশ। এক দিন বীরভূমে গিয়েছি। মাঝরাস্তায় হঠাৎ আয়োজকদের তরফে ফোন, “দিদি আপনি বেরিয়ে পড়েছেন?” আমি বললাম, “হ্যাঁ”। উত্তরে ভেসে এল, “দিদি এখানে একটা সমস্যা হয়েছে।” বলেই চুপ! আমার শতবার জিজ্ঞেস করাতেও উত্তর পেলাম না। খালি শুনলাম অনুষ্ঠানটা হচ্ছে। সাতপাঁচ না ভেবেই চলে গেলাম অকুস্থলে। গিয়ে দেখি চারিদিক থমথমে। বিশেষ লোকও নেই। শুনলাম, জায়গাটা নাকি ভাল নয়। শেষমেশ অনুষ্ঠান হল। দূরে গাছতলায় দাঁড় করানো আমাদের গাড়ি। পরিশ্রমের পর গাড়িতে গিয়ে খানিক বিশ্রাম নিয়েছি সবে। হঠাৎ অদ্ভুত একটা অনুভূতি হল। গাড়ি থেকে নামতেই মনে হল আমার পিছন পিছন কেউ আসছেন। আমি গতি বাড়ালাম। ছুটতে ছুটতে পৌঁছলাম অনুষ্ঠানের জায়গায়। পরে শুনেছিলাম, ওই দিন সকালেই সেখানকার সচিবের পুত্র আত্মহত্যা করেছেন। আর যেখানে করেছেন, সেখানেই দাঁড় করানো ছিল আমাদের গাড়িটা। ঘটনাটা মনে পড়লে আজও গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।
ডাকাতের গল্প শুনবেন? দীর্ঘ কর্মজীবনে সেই অভিজ্ঞতাও হয়েছে আমার। বহু বছর আগের ঘটনা। আবারও এক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই। জায়গাটা ঠিক মনে নেই। আমাদের বলা হয়েছিল খুব সকাল সকাল সেখানে পৌঁছনোর কথা। যথারীতি পৌঁছেছি। রাস্তায় সামান্য ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। অনুষ্ঠানের জায়গায় যেতেই আমার ম্যানেজারের ডাক। “দিদি আমরা এসে গিয়েছি। দেখুন আমাদের কারা নিতে এসেছেন।” চোখ খুলে দেখিচ চারিদিকে ঘন জঙ্গল। কী প্রকাণ্ড চেহারার সব মানুষ দাঁড়িয়ে সামনে। মাথায় কাপড় বাঁধা। পাঞ্জাবির সঙ্গে কেমন ভাবে যেন ধুতিটা জড়িয়েছেন! তাঁরাই আমাদের নিতে এসেছিলেন। আমরা ভিতরে ঢুকলাম। আমাদের ঘন দুধের চা দিলেন তাঁরা। অদ্ভুত ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলেন, “মাংস খাবেন?” আমি বিনয়ের সঙ্গে জানালাম, “না ভাই”। এর পর অনুষ্ঠান শুরু হল। সামনে দেখলাম দর্শকাসনে একজনও মহিলা নেই। ১৫০০ জন মতো লোক এসেছেন। যাই হোক অনুষ্ঠান শেষ হল। কেন জানি, আমার ম্যানেজার বেশিক্ষণ সেখানে রাখতে চাননি আমাকে। ফেরার পথে গাড়িতে জেনেছিলাম আসলে যে জায়গায় আমরা গিয়েছিলাম, সেটি আর কিছু নয়, ছিল খাস ডাকাতদের এলাকা।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।