পুজো মানে শুধু দেবীর আরাধনা নয়। পুজো মানে প্রেম, পুজো মানে শৈশবের দিনগুলোকে আবার যেন ফিরে পাওয়া। ফেলে আসা সময়, ফেলে আসা মানুষ, ফেলে আসা স্মৃতিগুলোকে নতুন করে ছুঁয়ে দেখা। তার সঙ্গেই রয়েছে প্রচুর হইহুল্লোড়, মজা, বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়া, খাওয়া-দাওয়া।
বিশিষ্ট বাচিকশিল্পী এবং অভিনেত্রী উর্মিমালা বসুর পুজোর স্মৃতিচারণায় বারবারই উঠে এল সে সমস্ত গল্প।
এক মজার অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে শিল্পী জানান, পাড়ার বেঙ্গল বয়েজ ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে মেয়ে একমাত্র তিনিই ছিলেন। এক বার সেই ক্লাবের বন্ধুবান্ধবরা এবং ভাই-বোনেরা সবাই মিলে গিরিশ পার্কে ঠাকুর দেখতে গিয়েছিলেন।মণ্ডপে খুব ভিড়। তার মধ্যে হঠাৎই দেখেন, তাঁর ছোড়দা বুয়া দলছুট। মণ্ডপের অনুসন্ধান অফিসে গিয়ে তিনি বললেন, “প্রতীপ চট্টোপাধ্যায়, ডাকনাম বুয়া, তাকে উর্মিমালা চট্টোপাধ্যায় খোঁজ করছেন।”
মণ্ডপের গান থামিয়ে সেই ঘোষণা হল। সেই প্রথম ঊর্মিমালা মাইক্রোফোনে শুনেছিলেন নিজের নাম। তখন ছোড়দাকে খুঁজে না পাওয়ার উৎকণ্ঠায় কোনও আনন্দ অনুভব করেননি তাতে। কিন্তু পরে সে কথা মনে করে ভারী তৃপ্তি হয়েছিল। সেই ভাল লাগা এখনও তাঁর মনে থেকে গিয়েছে।
ঊর্মিমালা জানান, এক বার পুজোর সময়ে বাড়িতে ঠাকুর দেখতে যাচ্ছি বলে, বান্ধবীরা মিলে উত্তম কুমারের ‘চাওয়া-পাওয়া’ ছবিটা দেখতে গিয়েছিলেন। হল থেকে বেরোনোর সময়ে এক বান্ধবীর বাবার চোখে ধরা পড়েন সকলে। মিথ্যে কথা বলে সিনেমা দেখতে যাওয়ার শাস্তিস্বরূপ বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ করে দেন তাঁর বাবা-মা।
পুজোর প্রেমগুলো ভারী মিষ্টি মনে হয় ঊর্মিমালার। যদিও তিনি বিশ্বাস করেন না, সব প্রেমের পরিণতি বিয়েই হতে হবে। পুজোমণ্ডপে কাউকে দেখে ভাল লাগা, চোখে চোখে কথা, ক্ষণিকের দেখা হওয়ার আশা নিয়ে সাইকেল নিয়ে ছুটে যাওয়া কোনও কিশোর— এ সব সুখস্মৃতি হয়ে থেকে গিয়েছে তাঁর মনে। সে সব তাঁর কাছে কিছু দিনের স্বাধীনতা। যে স্বাধীনতা ভাসানের দিন লরিতে প্রতিমার ওঠার সঙ্গে সঙ্গে চলে যায়।
ঊর্মিমালা বলেন, “এখনও যখন ‘এই কূলে আমি, ওই কূলে তুমি’ বা ‘যেতে যেতে পথে’ গানগুলো বাজে, তখন সেই মুখগুলো কিন্তু মনে পড়ে। মিথ্যে বলবো না, আজও আসে। এক একটা গানের হাত ধরে আমি আমহার্স্ট স্ট্রিটে ফিরে যাই।”
এ সব পুরনো কথার সঙ্গে উঠে এল তাঁর এবং জগন্নাথ বসুর যৌবনকালের পুজোর স্মৃতিও। তিনি বলেন, “এক বার পুজোয় দু’জনে মিলে রংমহল গিয়েছিলাম ‘টিনের তলোয়ার’ দেখব বলে। হলে ঢুকতে গিয়ে দেখলাম টিকিটটা ব্যাগে নেই। কোথাও পড়ে গিয়েছে। সে দুঃখ রাখার কোনও জায়গা ছিল না। আর কাউন্টারে যেমন টিকিট ছিল না, আমাদেরও তেমন আবার টিকিট কেনা সম্ভব ছিল না। তখন অত টাকা-পয়সা কোথায়? ফলে আর নাটকটা দেখা হয়নি। কিন্তু বাড়িতে অনেক মিথ্যে কথা বলে বেরিয়েছি। তাই বাড়িও ফিরে যাব না। আবার ঘুরে বেড়ালে কেউ যদি দেখে ফেলে, তাতেও সমস্যা। হাতে পয়সাকড়িও কম। খুব বেশি হলে দু’জনে কফি হাউসে গিয়ে বড়জোর দুটো কফি আর একটু কিছু খাবার খেতে পারি। ভীষণ মন খারাপ হয়েছিল। কিন্তু একসঙ্গেই থাকব ওই সময়টুকু, সেই লোভটাও ছিল। সেটা বেশ একটা অন্য রকম অভিজ্ঞতা পুজোর।”
এই সঙ্গে থেকে যাওয়ার ইচ্ছেটাই হয়তো তাঁদের এত বছরের সম্পর্কের কাণ্ডারি। তবে এ সব ছাড়াও পুজো মানে ঊর্মিমালার কাছে জমিয়ে খাওয়াদাওয়া। অষ্টমীর দিনে একটু লুচি, ছোলার ডাল, বোঁটাসুদ্ধ বেগুন ভাজা, আলুর দম আর শেষ পাতে একটু পায়েস, নবমীর দিনে অবশ্যই পাঁঠার মাংসের লালচে ঝোল, দশমীতে মাংসের কিমা দিয়ে ঘুগনি— আরও কত কী!
দেবীর কাছে যদি তিনটি বর চাওয়ার সুযোগ পান, তা হলে কী চাইবেন? উত্তরে ঊর্মিমালা বললেন, “আমার প্রথম প্রার্থনা হবে, আমার সঙ্গীটি সুস্থ হয়ে উঠুক। অন্তত সুস্থ হওয়ার মানসিকতা বা মনোবল ফিরে পাক। এটা খুবই ব্যক্তিগত একটা চাওয়া। আর একটা অদ্ভুত অসাম্য এবং শ্বাসরোধকারী পরিবেশের মধ্যে আমরা রাজ্যবাসীরা রয়েছি। সেটা অচিরে দূর হোক। এবং তৃতীয়ত, সবাই একটু শিক্ষিত মানসিকতা ফিরে পাক। নিজেকে পরিশ্রম করতে হবে, নিজেকে নিজের সবটাই অর্জন করতে হবে— এই শিক্ষাটা যদি ঠাকুর দিতে পারতেন, তা হলে বড় প্রীত হতাম এই শেষ বয়সে। আমি শুয়ে থাকলে যে আমার ভাগ্যও শুয়ে থাকবে অথবা অর্জন আর ভিক্ষা গ্রহণ— দুটোর মধ্যে যে তফাত আছে, এগুলো বুঝতে পারলে ভাল হয়।”
নিজের জন্য কিছু চান না? শিল্পী বলেন, “এই যে আমার অসুবিধা হচ্ছে, তবু আমার একটা আশা আছে— আমি বেশি দিন অসুবিধা ভোগ করব না কালের নিয়মে। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কোন পৃথিবীটা রয়ে গেল বা থাকছে? আমরা সবাই যদি জন্ম থেকে এই মানসিকতা আহরণ করতাম, তা হলে হয়তো আজকের সমাজটা অন্য রকম হত। তাই এইগুলো হলেই আমি ভাল থাকব। আর এটা তো নিজের জন্যই চাওয়া প্রকারান্তরে।”
এই প্রতিবেদনটি "আনন্দ উৎসব" ফিচারের একটি অংশ