আরতি মুখোপাধ্যায়ের নাম বললেই প্রথমেই যে দু’টি গানের কথা মনে পড়ে, তা হল ‘এই মোম জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে’ আর ‘তখন তোমার একুশ বছর’। কিন্তু প্রথম গানটি আদৌ আরতির জন্য লেখাই হয়নি। আদতে এ গান লেখা হয়েছিল উত্তমকুমার নিজে গাইবেন বলে। অথচ আরতির গলাতেই তা কালজয়ী হয়ে উঠল।
‘এই মোম জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে এসো না গল্প করি/ দেখো ওই ঝিলিমিলি চাঁদ সারারাত আকাশে সলমা জরি।’
সাতের দশকের শেষ দিকের এক পুজোয় এই আধুনিক গানটি রেকর্ড করেছিলেন আরতি। কথা গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার ও সুর নচিকেতা ঘোষের। মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গানটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। অনেকের ধারণা, এর পরে উত্তমকুমারও এই একই গান গেয়েছিলেন, রেকর্ডও করেন--- এই ধারণা কিন্তু একেবারেই সঠিক নয়। আরতির অনেক আগেই উত্তমকুমার এ গান প্রথম গেয়েছিলেন রবীন্দ্র সদনে।
ব্যাপারটা একটু খুলেই বলা যাক। রবীন্দ্র সদনে ‘শিল্পী সংসদ’-এর অনুষ্ঠান ছিল। শিল্পীদের ঐক্য ও দুঃস্থ কলাকুশলীদের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে উত্তমকুমার তৈরি করেছিলেন ‘শিল্পী সংসদ’। রবীন্দ্র সদনে ওই অনুষ্ঠানের জন্য তিনি সুরকার নচিকেতা ঘোষকে বলেছিলেন, ‘একটা গান তৈরি করুন তো। আমি গাইব।’
নচিকেতা সে কথা জানালেন গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারকে। কোনও প্রেমের দৃশ্য ভেবে নয়। ‘শিল্পী সংসদ’ আয়োজিত অনুষ্ঠানের সোনাঝরা সন্ধের কথা ভেবেই গৌরীপ্রসন্ন লিখে ফেললেন, ‘এই মোম জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে এসো না গল্প করি।’ সুর করলেন নচিকেতা ঘোষ।
সেদিনের অনুষ্ঠানে সুচিত্রা সেন থেকে শুরু করে বাংলা চলচ্চিত্র ও সঙ্গীত জগতের তাবড় গুণীজনেরা সামিল হয়েছিলেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের পাশে চুপটি করে দাঁড়িয়েছিলেন আরতিও।
কিছুক্ষণ পরে মঞ্চে উঠলেন স্বয়ং উত্তমকুমার। তাঁর সঙ্গে ঝলমলে সাজে সুপ্রিয়া দেবী। সুপ্রিয়া উত্তমকে বললেন, “অ্যাই, এসো না দু'জনে গল্প করি ....।” সুপ্রিয়া দেবী সে কথা বলা মাত্র উত্তমকুমার লাইভ গান ধরলেন - ‘এই মোম জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে এসো না গল্প করি।’ সুপ্রিয়া গানের মাঝে মাঝে বলছেন “এই মোম জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে এসো না আমরা গল্প করি।” উত্তমকুমার হাসছেন আর গাইছেন। সব মিলিয়ে যেন এক রূপকথা! দর্শক তখন উচ্ছ্বাসে পাগলপারা। সেই প্রথম এ গান প্রকাশ্যে গাইলেন উত্তম। রবীন্দ্রসদনে তাঁর কণ্ঠে গানটি শুনে আরতি নচিকেতা ঘোষকে বলেছিলেন “নচিদা, মহানায়কের এই গানটাই আমি গাইতে চাই।”
কিছুদিন পরে ‘মেগাফোন’ রেকর্ড কোম্পানির কর্ণধার কমল ঘোষের বাড়ির ঘরোয়া অনুষ্ঠানে হারমোনিয়াম বাজিয়ে ‘এই মোম জোছনায়’ আবার গাইলেন উত্তম। সেই গান তখনই কমল ঘোষ লাইভ রেকর্ডিং করে রেখেছিলেন। যদিও তখনও তা মুক্তি পায়নি।
আরতি তখন নচিকেতা ঘোষকে বলেন, “আর আমার গানটা গাওয়া হল না।” নচিকেতা হেসে বলেছিলেন “দেখবি, তোর কাছেই ফিরে আসবে এই গান।” আরতির তখন বিশ্বাস হয়নি।
কিন্তু সুরকারের কথা পরবর্তীকালে অক্ষরে অক্ষরে ফলল। আরতি বলেছিলেন, “নচিদা তখন মারা গিয়েছেন। সত্যি সত্যি ‘এই মোম জোছনায়’ পুজোর গানে রেকর্ড করার জন্য আমার কাছে প্রস্তাব এল। উত্তমকুমারের গাওয়া গান আমি রেকর্ড করার সুযোগ পেলাম। আমার পরম সৌভাগ্য! আশীর্বাদের মতো নচিদার কথা ফলল।”
‘এই মোম জোছনায়’ পুজোর গান হিসেবে আরতি মুখোপাধ্যায় প্রথম বাণিজ্যিক রেকর্ড। মুক্তি পেয়েই সে গান সাড়া ফেলে দিল। রেডিয়োর ‘অনুরোধের আসর’ থেকে পুজো মণ্ডপ, গান তখন সুপারহিট।
উত্তমকুমার প্রয়াত হওয়ার পরে ১৯৮০ সালে সেই ঘরোয়া জলসায় উত্তম-কণ্ঠে রেকর্ড করে রাখা 'এই মোম জোছনায়' রিলিজ করলেন কমল। মেগাফোন রেকর্ডটির আর এক পিঠে ছিল 'রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত' ছবিতে উত্তম-সুচিত্রার সংলাপ।
তবে এই গান উত্তমকুমারের চেয়েও আরতির কণ্ঠেই বেশি জনপ্রিয়তা পেল। আজও পুজোর গান হিসেবে যার মাদকতা এতটুকু ম্লান হয়নি।
এই প্রতিবেদনটি 'আনন্দ উৎসব' ফিচারের একটি অংশ।