ব্যস্ত প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোড। পুজোর মুখে শহরের আনাচকানাচে যখন উৎসবের প্রস্তুতি তুঙ্গে, তখন তালতলা মাঠের অন্যতম আকর্ষণ পল্লীমঙ্গল সমিতির দুর্গোৎসব। আজ যে মাঠে পুজো ঘিরে এত আয়োজন, এক সময়ে সেই এলাকা ছিল জঙ্গলে ভরা। মাঠের উল্টো দিকে ছোট্ট একটি জায়গায় মাত্র চার জন উদ্যোক্তাকে নিয়ে শুরু হয়েছিল দেবীর আরাধনা। সেই ছোট্ট উদ্যোগেই ধীরে ধীরে শামিল হয়েছেন আরও অনেকে। বেড়েছে আয়োজনের পরিধি, বদলেছে উদ্যাপনের চেহারা। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গিয়েছে ছয় দশকেরও বেশি সময়। এ বার ৬৭তম বর্ষে পা দিল পল্লী মঙ্গল সমিতির দুর্গাপুজো।
এ বছরের ভাবনা ‘অঞ্জলি’। দুর্গাপুজোর সঙ্গে অঞ্জলির যে নিবিড় যোগ, তাকেই মণ্ডপসজ্জার মধ্য দিয়ে তুলে ধরতে চেয়েছেন উদ্যোক্তারা। পুজো কমিটির সদস্য আবির বসু বলেন, “দুর্গাপুজো বলতে আমরা বুঝি শক্তির আরাধনা। সেখানে অঞ্জলির মাহাত্ম্য সকলের কাছেই বিশাল। আমরা সারা বছর অপেক্ষা করে থাকি দুর্গাপুজোর অঞ্জলির জন্য। সেই ভাবনা থেকেই এ বারের থিম। আমাদের ট্যাগলাইন, ‘মা করবে মায়ের পুজো’।”
অঞ্জলির এই ভাবনাই ছড়িয়ে রয়েছে মণ্ডপের সাজে। আদ্যোপান্ত বাঙালিয়ানায় মোড়া মণ্ডপ তৈরি হয়েছে অঞ্জলিতে ব্যবহৃত নানা উপকরণ দিয়ে। মণ্ডপসজ্জার দায়িত্বে রয়েছেন শিল্পী তরুণ ঘোষ। অন্য দিকে, প্রতিমাশিল্পী সনাতন পালের তুলির টানে দেবীমূর্তি পেয়েছে প্রাণবন্ত রূপ। উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য, এমন একটি ভাবনা তুলে ধরা, যার সঙ্গে দর্শনার্থীরা সহজেই নিজেদের মেলাতে পারবেন। থিমের জটিলতা নয়, বরং পরিচিত আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পুজোর আবেগকে ছুঁয়ে দেখাই তাঁদের উদ্দেশ্য।
তবে শুধু মণ্ডপের অন্দরেই নয়, প্রবেশপথেও রয়েছে বিশেষ ভাবনা। সারি সারি বাঁশ দিয়ে তৈরি হয়েছে ‘বন্ধন’-এর প্রতীকী রূপ। পুজোর সময়ে দূরে থাকা মানুষও ঘরে ফেরেন, ফিরে আসেন চেনা মানুষজনের কাছে। সারা বছরের ব্যস্ততা পেরিয়ে এই উৎসব যেন সকলকে এক সুতোয় বেঁধে দেয়। সেই ঘরে ফেরার টান, আত্মীয়তার বন্ধন এবং মিলনের আবহকেই প্রবেশদ্বারে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন উদ্যোক্তারা।
৬৭ বছরের পথচলায় বহু পরিবর্তনের সাক্ষী এই পুজো। সময় বদলেছে, বদলেছে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও। এ বারের পুজোয় সেই পরিবর্তনের কোনও প্রভাব পড়েছে কি? প্রশ্নের উত্তরে আবির বলেন, “আমাদের পুজোর সঙ্গে কখনও কোনও রাজনীতি জড়িয়ে ছিল না। রাজ্যে সরকার পরিবর্তন হলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দেওয়াটা স্বাভাবিক। তবে আমাদের তেমন কিছু চোখে পড়েনি। শুধু প্রচারটা একটু কমেছে বলে মনে হচ্ছে।”
এখন শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে জোরকদমে। তৃতীয়া, অর্থাৎ ১৩ অক্টোবর থেকে দর্শনার্থীদের জন্য খুলে যাবে মণ্ডপ। দক্ষিণ কলকাতার এই পুজোয় যেতে হলে সাউথ সিটি মল থেকে যাদবপুর থানার দিকে মিনিট দুয়েক থেকে তিনেক হাঁটলেই পৌঁছে যাওয়া যাবে পল্লী মঙ্গল সমিতির মণ্ডপে। এ ছাড়াও রবীন্দ্রসরোবর মেট্রো স্টেশন থেকে বেরিয়ে যদি যাদবপুর থানার অটো ধরেন তা হলে খুব কম সময়েই পৌঁছে যাবেন এই মণ্ডপে।
ছোট্ট পরিসরে চার জনের উদ্যোগে শুরু হওয়া পুজো আজ ৬৭ বছরের ঐতিহ্য। এ বারের ‘অঞ্জলি’ ও ‘বন্ধন’-এর ভাবনায় সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশেছে বাঙালির ঘরে ফেরার আবেগ।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।