উত্তর কলকাতার আহিরীটোলা এলাকায় ধরবাড়িতে সারা বছর উৎসব চলে। প্রতি বছর নিয়ম করে দুর্গা, অন্নপূর্ণা, সরস্বতী এবং দেবী লক্ষ্মীর পুজো হয়। এ বাড়ির কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর বয়স ১১৭ বছর। নাতনির জন্মের পরে ব্যবসার শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছিল। সেই থেকে ব্যবসায়ী কানাইলাল ধর বাড়িতে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো শুরু করেন।
ধর পরিবারের পূর্বপুরুষ বাবু কানাইলাল ধর হুগলির আদিসপ্তগ্রাম থেকে কলকাতায় আসেন উনিশ শতকে। প্রথম দিকে চিনাবাজারে কাচের দোকানে কাজ করতেন। তার পরে নিজের ব্যবসা শুরু করেন কানাইলাল। কাচ ও টিনের ব্যবসা শুরুর পরে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। কানাইলালের হাত ধরে ধরবাড়িতে শুরু হয় একের পর এক পুজো-পার্বণ। কানাইলাল নিজ ভদ্রাসনে দুর্গাপুজোর আগে লক্ষ্মীপুজো শুরু করেন। তাঁর একমাত্র পুত্র শরৎচন্দ্র ধরের বড় মেয়ে কমলাসুন্দরী দাসীর জন্মের পরে ব্যবসা-বাণিজ্যে অভূতপূর্ব সাফল্য আসে। সেই থেকে কোজাগরী লক্ষ্মী পুজো শুরু করেন কানাইলাল। পুজো শুরু হয় ১৯০৯ সালে। মা লক্ষ্মীর নামানুসারে তিনি তাঁর বড় নাতনির নাম রাখেন কমলা।
ধরবাড়ির লক্ষ্মী মূর্তিটি ব্যতিক্রমী। দেবীর এই বিশেষ রূপের নাম কমলেকামিনী, যা অত্যন্ত বিরল। কুমোরটুলি থেকে প্রতিমা আনা হয়। যিনি দুর্গা প্রতিমা গড়েন, তিনিই লক্ষ্মী প্রতিমা নির্মাণ করেন। কানাইলাল দেবীকে যে রূপে স্বপ্নে দেখেছিলেন, সেই রূপে মূর্তি গড়ে পুজোর সূচনা করেন। লক্ষ্মীপ্রতিমার দুই পাশে শুঁড়ে জল নিয়ে দেবীর মাথায় জল ঢালার ভঙ্গিতে দু’টি হাতি উপস্থিত থাকে। দেবী আশীর্বাদরতা মুদ্রায় বিরাজিতা। তাঁর পায়ের কাছে থাকে সখা এবং সখী। পাশে শাঁখের উপরে দেবীর বাহন পেঁচা বসে থাকে। ধরবাড়ির দুর্গা যে মুকুট পরেন, তা বিসর্জনের সময়ে খুলে রাখা হয়। সেই মুকুটটি কমলেকামিনীকে পরানো হয়।
আরও পড়ুন:
অন্য দিকে, ধরবাড়ির গৃহলক্ষ্মী অর্থাৎ কুলদেবী লক্ষ্মীকে কোজাগরী পূর্ণিমার দিনে রুপোর থালায় বসানো হয়। দেবীর পদতলে এক কালে গোটা সোনা মুগ ছড়িয়ে দেওয়া হত। কালের নিয়মে এখন সেই সোনা মুগ আর পাওয়া যায় না। এখন সবুজ মুগ রুপোর থালায় রেখে, তার উপরে দেবীকে স্থাপন করা হয়। সারা বছর হাঁড়িতে করে ওই মুগ রেখে দেওয়া হয়।
কোজাগরী পূর্ণিমার দিনে দুপুরবেলায় সত্যনারায়ণ পুজো হয়। সত্যনারায়ণের সিন্নিভোগ বিতরণ করা হয় সকলের মধ্যে। রাতে হয় কোজাগরী পুজো। পুজোর সময়ে কোনও কাঁসর, ঘণ্টা বাজে না। শান্ত ভাবে শুধুমাত্র আরতির মাধ্যমে আরাধনা করা হয়। দেবীকে তাল ফোঁপরা এবং চিঁড়ে নিবেদন করা হয়। লক্ষ্মীর ভোগে থাকে ঘিয়ে ভাজা লুচি, বিভিন্ন রকম ভাজা, ফল, মিষ্টি ইত্যাদি। বাড়িতে তৈরি নারকেল নাড়ু, তিলের নাড়ু, প্যারাকি এবং হালুয়া ভোগ হিসাবে নিবেদন করা হয়। পুজো শেষে রাতে শুধু তাল ফোঁপরা এবং চিঁড়ে প্রসাদ হিসাবে বিতরণ করা হয়। বাকি অন্যান্য সব নৈবেদ্য ঠাকুরের সামনে রাখা থাকে রাতভর। পরের দিন সেগুলি ঠাকুরদালান থেকে বার করে প্রসাদ হিসাবে বিতরণ করা হয়। পুজো শেষে লক্ষ্মীর মৃণ্ময়ী প্রতিমা নিরঞ্জন হয়।
(তথ্য সহায়তা— সায়ন ধর)
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।