নীলাচল হল জগন্নাথের ধাম, জগতের নাথ সেখানে বিরাজ করেন। আদতে শ্রীক্ষেত্র পুরী হল সতীর একান্নপীঠের অন্যতম। সতীর নাভিমণ্ডল পড়েছিল সেখানে—
‘উৎকলে নাভিদেশশ্চ বিরজাক্ষেত্রমুচ্চতে/ বিমলা সা মহাদেবী, জগন্নাথস্তু ভৈরবঃ।।’ নাভিমণ্ডল রূপান্তরিত হয়েছে শিলায়, দেবী পূজিতা হন মূর্তিতে। বিমলা আদ্যাশক্তির অংশ। দেবী মহাকালী বিমলার ভৈরব হলেন জগন্নাথ।
জগন্নাথ দেবের মন্দির চত্বরে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে দেবী বিমলার মন্দির। কথিত, বিমলা মন্দির বয়সে জগন্নাথ মন্দিরের চেয়ে প্রাচীন। নবম শতকে মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করা হয়। দেবীমূর্তির বয়স দেড় হাজার বছরের বেশি। আদতে শ্রীক্ষেত্র বিমলার পীঠ। শবরদের আরাধ্য নীলমাধব রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের হাতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে শ্রীক্ষেত্র বৈষ্ণবতীর্থে পরিণত হয়েছে। কিন্তু আদিতে তা ছিল শাক্তদের পুণ্যভূমি। কিংবদন্তি অনুযায়ী, নীলমাধব পুরীতে অধিষ্ঠিত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করায় দেবী পীঠমন্দির নিয়ে ‘রোহিণী কুণ্ড’র পশ্চিম তীরে সরে যান। দেবীর ছেড়ে যাওয়া স্থানে রাজা মন্দির নির্মাণ করেন। সেই মন্দিরে অধিষ্ঠিত হন জগন্নাথ, বলভদ্রদেব এবং সুভদ্রা। তবে দেবী শর্ত দেন, জগন্নাথ দেবকে নিবেদন করা ভোগ যেন তাঁকে দেওয়া হয়। তাই আজও দেবীকে জগন্নাথের ভোগ নিবেদন করা হয়। জগন্নাথের ভোগ অর্থাৎ প্রসাদ দেবীকে বিমলাকে নিবেদন করলে তা ‘মহাপ্রসাদ’-এ পরিণত হয়।
আর একটি কিংবদন্তি অনুসারে, স্বয়ং পার্বতী এক বার শ্রীবিষ্ণুর উচ্ছিষ্ট খেতে চেয়েছিলেন। তখন বিষ্ণু বলেন, পুরীতে দেবীর যে পীঠ আছে, কলিযুগে সেখানে তিনি জগন্নাথ রূপে অধিষ্ঠিত হবেন। তখন বিষ্ণুর প্রসাদ নিত্যভোগ হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ পাবেন পার্বতী। হর অর্থাৎ শিব সেখানে ওতপ্রোত ভাবে অধিষ্ঠান করবেন বিষ্ণুর সঙ্গে। শিবকে সঙ্গে নিয়ে বিষ্ণুই হবেন সেই পীঠের ভৈরব।
আরও পড়ুন:
দেবী বিমলার গায়ের রং শ্বেতশুভ্র। সাদা ফুলের মালা, উজ্জ্বল সাদা বস্ত্রে শোভিতা। দেবী চতুর্ভুজা। ডান দিকের দুই হাতে থাকে অক্ষমালা ও অমৃতকুম্ভ। বাম দিকের এক হাতে থাকে সাপ ও অন্য হাতটি বরাভয় মুদ্রায় থাকে। শবাসনে বসে থাকেন দেবী। পাশে থাকে দুই সখী জয়া এবং বিজয়া। দেবী বিমলা পূজিতা হন তন্ত্রমতে। সারা বছর জগন্নাথের নিরামিষ ভোগ, দই, ক্ষীর ইত্যাদি নিবেদন করা হয় দেবীকে। কিন্তু শারদীয় নবরাত্রিতে আমিষ ভোগ দেওয়া হয়। চলে বলিদানও। তখন মহিষমর্দিনীরূপে দেবী বিমলার পুজো হয়। দেবীর উদ্দেশে মাছ নিবেদন করা হয়। ছাগবলি দেওয়া হয়। একদা মহিষ বলিরও চল ছিল। বলিদানের উদ্দেশে পশুকে বিশেষ উপায়ে মন্দিরের অন্দরে নিয়ে আসা হয়, যাতে সে বৈষ্ণব মন্দিরের মাটি স্পর্শ করতে না পারে। জগন্নাথের ঘুম ভাঙার আগে সেরে ফেলা হয় বলিপর্ব। জগন্নাথ মন্দিরে ভোরের আরতির আগে বিমলা মন্দিরে বলিদান সম্পন্ন হয়। কারণ প্রাণীহত্যা, রক্ত— এ সব সইতে পারেন না জগতের নাথ।
বিমলার পীঠে তান্ত্রিকদের আনাগোনা চলে। চলে সাধনা। দেবী বিমলা বছরের বিভিন্ন সময়ে ছলনমূর্তিতে নীলমাধবের সঙ্গী হন। কারণ, তিনি হলেন জগন্নাথের পীঠসঙ্গী, নীলমাধবের শক্তি। দেবী বিমলার উপস্থিতির জেরে নীলাচল শাক্ত ও বৈষ্ণবের মিলনতীর্থে পরিণত হয়েছে।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।