Health Partner
Comfort Partner
Knowledge Partner

বিকট শব্দে কুলো পেটানো, ভোগে তেঁতুল-তিতো! এদেশীয়দের ঘরে আজও কীভাবে পালিত হয় ‘অলক্ষ্মী বিদায়’?

দীপান্বিতা অমাবস্যার নিকষ কালো রাতে যখন চারিদিকে শ্যামাপুজোর প্রস্তুতি, তখন এদেশীয়দের অন্দরে চলে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পর্ব। গোবরের পুতুল গড়ে বাঁ-হাতে পুজো, তার পর কুলো পিটিয়ে বাড়িছাড়া করা হয় তাঁকে। কে এই ‘অলক্ষ্মী’? দেবী লক্ষ্মীর বড় বোনকে গৃহছাড়া না করলে কেন ধরা দেন না ধনদেবী?

আনন্দ উৎসব ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০৪ নভেম্বর ২০২৬ ১৮:৫৯
প্রতীকী চিত্র

প্রতীকী চিত্র

কার্তিক মাসের অমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত। একদিকে যখন ঢাকের কাঠি আর তান্ত্রিক মন্ত্রোচ্চারণে শুরু হয় দক্ষিণাকালী বা শ্যামার আরাধনা, ঠিক তখনই বাংলার এদেশীয় অর্থাৎ ‘ঘটি’দের গৃহকোণে দেখা যায় একেবারে উল্টো এক ছবি। শাঁখের আওয়াজ নয়, বরং শোনা যায় ভাঙা কুলো পেটানোর শব্দ! গৃহিণীদের মুখে সমস্বরে আওড়ানো ছড়া, 'অলক্ষ্মী দূর দূর, লক্ষ্মী আয় ঘরে।'

ঘটিবাড়িতে কোজাগরী পূর্ণিমার চেয়েও দীপান্বিতা অমাবস্যার লক্ষ্মীপুজোর গুরুত্ব অনেক বেশি। তবে সেই পুজো শুরুর আগে রয়েছে এক শতাব্দীপ্রাচীন লোকাচার— ‘অলক্ষ্মী বিদায়’। অমঙ্গল, দারিদ্র্য ও কলহকে ঝাঁটাপেটা করে বাড়িছাড়া না করা পর্যন্ত নাকি স্বয়ং ধনদেবীও সেই চৌকাঠে পা রাখেন না।

কিন্তু কে এই অলক্ষ্মী? কেনই বা ঘটিদের চিরায়ত পার্বণে লক্ষ্মীপুজোর আগেই তাঁকে বিদায়ের এমন অদ্ভুত বন্দোবস্ত?

সমুদ্রমন্থনের আখ্যান

পৌরাণিক আখ্যান অনুযায়ী, অমৃতের সন্ধানে যখন দেবাসুরের সমুদ্রমন্থন চলছিল, তখন সমুদ্রের তলা থেকে ক্ষার ও বিষের সঙ্গে সবার আগে উঠে এসেছিলেন এক নারী। তিনি দেবী লক্ষ্মীর সহোদরা বা জ্যেষ্ঠা ভগিনী, পুরাণে যাঁর নাম ‘অলক্ষ্মী’ বা জ্যেষ্ঠা। তিনি কৃষ্ণবর্ণা, চুল রুক্ষ, চোখ কোটরাগত এবং বাহন গাধা। তিনি যেখানেই পা রাখতেন, সেখানেই শুরু হতো অনটন, রোগবালাই, ঈর্ষা আর বিবাদ। অলক্ষ্মীর ঠিক পরেই অমৃতকুম্ভের সঙ্গে আবির্ভূতা হন রূপ ও সমৃদ্ধির প্রতীক কমলে-কামিনী দেবী লক্ষ্মী।

পুরাণে বলা হয়েছে, বড় বোন অলক্ষ্মী অবিবাহিতা থাকা অবস্থায় ছোট বোন লক্ষ্মীর বিবাহ সম্ভব ছিল না। তখন এক ঋষির সঙ্গে অলক্ষ্মীর বিয়ে দেওয়া হলেও, তিনি বৈদিক যজ্ঞ, শান্তি ও পুণ্যকর্মের পরিবেশ সহ্য করতে না পেরে পালিয়ে যান। কথিত, যেখানে অহংকার, নোংরা পরিবেশ, গৃহবিবাদ ও অলসতা বিরাজ করবে, সেখানেই ঠাঁই হবে তাঁর।

গোবরের পুতুল ও বাঁ-হাতের পুজো

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই রীতি আজও নিখুঁতভাবে বেঁচে রয়েছে। দীপান্বিতা অমাবস্যার সন্ধ্যায় উঠোনে বা ঘরের কোণে গোবর দিয়ে অলক্ষ্মীর একটি কাল্পনিক রূপ বা পুতুল তৈরি করা হয়। যেখানে শুভ দেবদেবীর পুজো ডানহাতে হয়, সেখানে অলক্ষ্মীর পুজো করা হয় বাঁ-হাতে! তাঁর ভোগ হিসেবে দেওয়া হয় তেঁতুল, শুকনো মুড়কি কিংবা তিতকুটে জিনিস।

কুলো পিটিয়ে অলক্ষ্মী তাড়ানো

পুজো শেষ হতেই শুরু হয় আসল পর্ব। বাড়ির পুরুষ বা গৃহিণীরা একটি ছেঁড়া বা পুরনো কুলো নিয়ে তাতে কাঠির ঘা দিয়ে তীব্র শব্দ তুলে পেটাতে থাকেন। সঙ্গে হাঁক দেওয়া হয় অলক্ষ্মীকে বিদায় নেওয়ার জন্য। এরপর সেই গোবরের পুতুলটিকে কুলোয় তুলে নিয়ে গিয়ে ফেলা হয় বাড়ির সীমানার বাইরে, সদর রাস্তার মোড়ে বা কোনও শ্যাওড়া গাছের তলায়। অনেক পরিবারে সেই কুলোটিকে মাটিতে আছাড় মেরে ভেঙে ফেলারও রেওয়াজ আছে।

পা ধুয়ে ঘরে ফেরা ও লক্ষ্মীবরণ

অলক্ষ্মীকে সীমান্ত পার করিয়ে ফিরে আসার পর পরিবারের সদস্যদের পা ধুয়ে, চোখেমুখে গঙ্গাজল ছিটিয়ে তবেই অন্দরে ঢুকতে দেওয়া হয়। এর পরই গৃহকোণে আলপনা দিয়ে, আলো জ্বালিয়ে আবাহন জানানো হয় চঞ্চলা ধনলক্ষ্মীকে। বিশ্বাস, অলক্ষ্মীর স্থানত্যাগের ফলে ঘরের ভেতর যে শূন্যতা তৈরি হয়, তাতেই ভরপুর হয়ে ওঠে দেবী লক্ষ্মীর শান্তি ও অচলা সমৃদ্ধি।

আধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে এই প্রথাকে নিছক অন্ধবিশ্বাস বলে মনে হতে পারে, তবে সমাজবিজ্ঞানীদের মতে এর গভীরে রয়েছে এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক শুচিতা। আলো জ্বালানোর আগে যেমন অন্ধকারকে চিনে নিতে হয়, তেমনই সংসারে সুখ ও শান্তি ধরে রাখতে হলে অভাব, আলস্য, অপরিচ্ছন্নতা ও পারস্পরিক কলহকে আগে মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে হয়। সেই চিরন্তন সত্যটিকেই শতাব্দী প্রাচীন এক রূপক হিসেবে বয়ে নিয়ে চলেছে এ দেশীয়দের এই ‘অলক্ষ্মী বিদায়’।

এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।

Diwali Festival kalipuja

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy