Health Partner
Comfort Partner
Knowledge Partner

কলাবৌ স্নান ঘিরে সাহেবের সঙ্গে সংঘাত, ৫০ টাকা জরিমানা! ইংরেজদের কী ভাবে নাস্তানাবুদ করেন রানি রাসমণি?

‘অষ্ট ঘোড়ার গাড়ি দৌড়ায় রাণী রাসমণি/ রাস্তা বন্ধ কর্ত্তে পারল না ইংরেজ কোম্পানী।’ এই ছড়ার আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে লোকমাতা রানি রাসমণির আপসহীন মানসিকতা এবং অপরাজেয় ব্যক্তিত্বের কাহিনি। ব্রিটিশদের উচিত শিক্ষা দিতেও পিছপা হননি জানবাজারের রানিমা।

আনন্দ উৎসব ডেস্ক

শেষ আপডেট: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ১৩:১০
এই চিত্রটি এআই দ্বারা নির্মিত

এই চিত্রটি এআই দ্বারা নির্মিত

হালিশহরের এক কিশোরী থেকে জানবাজারের রানিমা— রানি রাসমণি হয়ে ওঠার সাক্ষী ছিল উনিশ শতকের কলকাতা। স্বামীর মৃত্যুর পর এক দিকে তিনি হয়ে উঠেছিলেন লোকমাতা, করুণাময়ী; অন্য দিকে, প্রশাসন ও সম্পত্তি সামলানো থেকে শুরু করে ব্রিটিশদের মোকাবিলা— সবেতেই ছিলেন আপসহীন। স্বামী বাবু রাজচন্দ্র দাসের মৃত্যুর পর ব্যবসা, সম্পত্তি ও বিশাল সাম্রাজ্যের দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন তিনি। লড়েছেন মামলা-মোকদ্দমা, সামলেছেন প্রজাপালন, প্রতিষ্ঠা করেছেন মন্দির। এই দীর্ঘ পথচলায় পাশে পেয়েছিলেন জামাই মথুরামোহনকে। গঙ্গায় শিকল দিয়ে ব্রিটিশদের বিপাকে ফেলার কাহিনি অনেকেরই জানা। তবে সাহেবদের শিক্ষা দিতে আরও এক বার অভিনব পথ বেছে নিয়েছিলেন রানি। এ বার ঘটনার সূত্রপাত তাঁর বাড়ির দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে।

১৭৯০ সালে জানবাজারের বাড়িতে দুর্গাপুজোর প্রচলন করেন রানির শ্বশুর প্রীতিরাম দাস। পরবর্তীকালে, ১৮৩৬ সালে পুজোর দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেন রানি রাসমণি। সেই পুজোকে ঘিরেই এক বার কলাবউ স্নান নিয়ে বেঁধেছিল তুমুল ঝামেলা। প্রতিপক্ষ এক গোরা সাহেব!

ষষ্ঠীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের পর সপ্তমীর ভোরে নবপত্রিকা বা কলাবউয়ের মহাস্নানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মহাপুজো। বাঙালির দুর্গোৎসবে এই আচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কলাবৌয়ের স্নান ছাড়া যেন সপ্তমীর সকালই অসম্পূর্ণ। উনিশ শতকের কলকাতাতেও সেই রীতির ব্যতিক্রম ছিল না। কিন্তু পুজোর ঢাক-ঢোলের আওয়াজই এক সাহেবের চক্ষুশূল হয়ে উঠেছিল।

কালী সিংহী তাঁর নকশায় সপ্তমীর সেই সকালকে বর্ণনা করেছেন এ ভাবে— ‘ষষ্ঠীর শর্ব্বরী অবসন্না হল, সুখতারা মৃদু পবন আশ্রয় করে উদয় হলেন, পাখিরা প্রভাত প্রত্যক্ষ করে ক্রমে ক্রমে বাসা পরিত্যাগ কত্তে আরম্ভ কল্লে; সেই সঙ্গে শহরের চারিদিকে বাজনা বাদ্দি বেজে উঠল, নবপত্রিকার স্নানের জন্যে কর্ম্মকর্ত্তারা শশব্যস্ত হলেন— ভাবুকের ভাবনায় বোধ হতে লাগল, যেন সপ্তমী কোরমাখান নতুন কাপড় পরিধান করে হাসতে হাসতে উপস্থিত হলেন।’

কিন্তু সেই উৎসবের আবহই এক সাহেবের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াল। ষষ্ঠীর দিন পুজোর ঢাক-ঢোলের শব্দে তাঁর কাঁচা ঘুম ভেঙে যায়। রেগে গিয়ে দাসবাড়ির পুরোহিতের উপর চড়াও হন তিনি। পুরোহিতও বিষয়টি রানি রাসমণির কানে পৌঁছে দেন। প্রথমে অবশ্য তেমন আমল দেননি রানি। কিন্তু পরের দিনও একই ঘটনা ঘটল।

সপ্তমীর সকালে কলাবৌকে গঙ্গাস্নান করাতে নিয়ে যাচ্ছিলেন রানির আত্মীয়-পরিজনেরা। ঢাক-ঢোলের শব্দে ফের ঘুম ভাঙে সাহেবের। আর তাতেই বাধে বিপত্তি। তবে এ বার আর আগের মতো পরিস্থিতি থাকল না। ষষ্ঠীর দিনের ঘটনার জবাব দিতে কলাবৌয়ের স্নানের শোভাযাত্রায় দ্বিগুণ লোক ও বাদ্যযন্ত্র পাঠিয়েছিলেন রাসমণি। পুজোর আনন্দে কোনও রকম আপস করতে নারাজ তিনি।

এর পর জল গড়াল আদালত পর্যন্ত। বিচারে রানি রাসমণির ৫০ টাকা জরিমানা হল। কিন্তু জরিমানা দিয়েও দমে গেলেন না জানবাজারের রানিমা। বরং সাহেবদের পাল্টা জবাব দিতে এ বার আরও বড় পদক্ষেপ করলেন তিনি।

বাবু রোডে বাঁশের খুঁটি পুঁতে রাস্তা ঘিরে দিলেন রাসমণি। ফলে সেই রাস্তা দিয়ে গাড়ি-ঘোড়া চলাচল বন্ধ হয়ে গেল। ইংরেজরা পড়ল বড় সমস্যায়! যে সাহেবদের দাপটে সাধারণ মানুষকে অনেক সময়ই নতিস্বীকার করতে হত, তাঁদেরই এ বার রাস্তা খুঁজে পেতে নাজেহাল অবস্থা।

এই ঘটনার স্মৃতি থেকেই সেকালের কলকাতায় ছড়িয়ে পড়ে একটি ছড়া—‘অষ্ট ঘোড়ার গাড়ি দৌড়ায় রাণী রাসমণি/ রাস্তা বন্ধ কর্ত্তে পারল না ইংরেজ কোম্পানী।’

ছড়ার ছন্দে ধরা পড়ে রানি রাসমণির প্রতিবাদী সত্তা। পরে অবশ্য নিজেদের ব্যবসার প্রয়োজনে ইংরেজরা রানির সঙ্গে মিটমাট করে নেয়। সাহেবদের সঙ্গে সংঘাতে নিজের অবস্থান থেকে সরে না এসে কী ভাবে তাঁদেরই আপস করতে বাধ্য করা যায়, এই ঘটনা যেন তারই দৃষ্টান্ত।

রানি রাসমণির পরিচয় অবশ্য শুধু ব্রিটিশদের সঙ্গে সংঘাতে সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণেশ্বরে কালীমন্দির প্রতিষ্ঠা, সাধারণ মানুষের জন্য বাবুঘাট নির্মাণ, সড়কপথ তৈরির মতো নানা জনহিতকর কাজের সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে তাঁর নাম। মানুষের স্বার্থে বার বার এগিয়ে এসেছেন জানবাজারের রানিমা। এক দিকে তাঁর করুণাময়ী রূপ, অন্য দিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান— এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই ইতিহাসে স্বতন্ত্র জায়গা করে নিয়েছেন রানি রাসমণি।

এই প্রতিবেদনটি 'আনন্দ উৎসব' ফিচারের একটি অংশ।

Rani Rasmoni Maha Saptami Festival Durga Puja

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy