ব্রহ্মাণ্ড থেকে পরমাণু— বিশ্বচরাচরে বিরাজ করেন দুর্গা। কন্যা ও জননী— দুই রূপেই দুর্গা বন্দনা করে বাঙালি। দুর্গাপুজোর চারটি দিনের দিকে তাকিয়ে বছর কাটে। আশ্বিন এলেই শেষ হয় বছরভরের সেই অপেক্ষা। কিন্তু কেবল ক’টা দিনের পুজো নয়, আসলে বাঙালির প্রতিদিনের যাপনে মিশে আছেন দেবী দুর্গা। যাত্রাকালে বা সফরের শুরুতে দুর্গা-নাম স্মরণ করাই গৃহস্থ বাঙালি বাড়ির রেওয়াজ। কেউ যাত্রা করলে, দরজায় দাঁড়িয়ে বাড়ির বড়রা বলেন, ‘দুগ্গা দুগ্গা’। এমন রীতির নেপথ্য কারণ কী?
দেবী দুর্গার প্রতি অগাধ ভরসা বাঙালির। ‘দুগ্গা দুগ্গা’ উচ্চারণে লুকিয়ে থাকে একটাই প্রার্থনা— ঘরের মানুষটার যাত্রা শুভ হোক। নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হোক সফর। পথে তাকে যেন আপদ-বালাই-রোগ-শত্রু-দুর্ঘটনা স্পর্শ না করে। যদি বা কোনও বিপদ-আপদ হয়, তা হলে দুর্গা সহায় হয়ে যেন রক্ষা করেন তাকে। একই অভিপ্রায়ে একদা চিঠির শুরুতে ‘শ্রী শ্রী দুর্গা সহায়’ লেখা হতো। আজও কোথাও কোথাও দশমীর দিন খাগের কলম আলতায় ডুবিয়ে কলাপাতা বা বেলপাতার উপর ‘শ্রী শ্রী দুর্গামাতা সহায়’ লেখা হয়। তার আড়ালেও থাকে একই প্রার্থনা।
আদতে দুঃখ-দুর্গতি নাশ করেন বলেই আদ্যাশক্তি মহামায়ার অপর নাম দুর্গা। শাস্ত্রে রয়েছে, ‘দৈত্যনাশার্থবচনো দকারঃ পরিকীর্তিতঃ। উকারো বিঘ্ননাশস্য বাচকো বেদসম্মত। রেফো রোগঘ্নবচনো গশ্চ পাপঘ্নবাচকঃ। ভয়শত্রুঘ্নবচনশ্চাকারঃ পরিকীর্তিত।’ যার মধ্যে ‘দুর্গা’ শব্দের প্রতিটি অক্ষরের অর্থ নিহিত রয়েছে। ‘দ’-র অর্থ দৈত্যনাশ; ‘উ’ অক্ষরটি বিঘ্ন নাশকে নির্দেশ করে; ‘রেফ’ বা ‘র’-র অর্থ রোগনাশ; ‘গ’-র অর্থ পাপনাশ; শেষের আ কার-এর অর্থ ভয় ও শত্রুনাশ। দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ ও শত্রু— এই পাঁচটি বস্তু মানুষের যাবতীয় দুর্গতির কারণ। এদের যিনি নাশ করেন, তিনিই দুর্গা। এদের নাশ করেই দেবী দুর্গা দুর্গতিনাশিনী হয়েছেন। সেই দুর্গতিনাশিনীর চরণেই প্রার্থনা করে বাঙালি। পরিবারের কোনও সদস্য কোথাও রওনা হলে মা-ঠাকুমাদের হাত কপালে উঠে আসে। তাঁরা বলে ওঠেন—‘দুগ্গা দুগ্গা’।
এই প্রতিবেদনটি 'আনন্দ উৎসব' ফিচারের একটি অংশ।