বলা হয়, ‘যা নেই মহাভারতে, তা নেই ভূ-ভারতে’। আদতে মহাভারত নামের মহাকাব্য যেন ভারত-ভূমিকে ধারণ করে আছে। আঠেরো পর্বের মহাভারতে বাঙালির দুগ্গা ঠাকুরও আছেন। মহাভারতের বিরাট পর্ব এবং ভীষ্ম পর্বে দুর্গার স্তব রয়েছে।
কৌরবদের কৌশলে পাশা খেলায় পরাজিত হন পঞ্চপাণ্ডব। খেলার শর্ত মেনে তাঁদের বারো বছর বনবাস এবং এক বছরের জন্য অজ্ঞাতবাসে যেতে হয়। প্রথমে বনবাস পর্ব। এক যুগ বনবাসের পরে অজ্ঞাতবাস পর্ব। নিভৃত যাপনের জন্য বিরাটনগরকে বেছে নেন তাঁরা। মনে ছিল আশঙ্কা, ভয়। শর্ত ছিল— অজ্ঞাতবাস পর্বে কোনও ভাবে, কেউ তাঁদের খোঁজ পেলে ফের বারো বছরের জন্য বনবাসে থাকতে হবে পঞ্চপাণ্ডবকে। ঋষিদের পরামর্শে অজ্ঞাতবাস পর্বের সাফল্য কামনায় যুধিষ্ঠির দেবী দুর্গার কাছে প্রার্থনা করেন। তিনি স্তব করেন— ‘দুর্গাৎ তারয়সে দুর্গে তৎ ত্বং দুর্গা স্মৃতা, জনৈ।’ যুধিষ্ঠিরের আরাধ্যা দেবী দুর্গা ছিলেন চতুর্ভুজা, চতুর্বক্তা ও সিংহারূঢ়া। যুধিষ্ঠির দুর্গাকে মহিষাসুরনাশিনী ভগবতী বলেছিলেন। দেবী সন্তুষ্ট হয়ে বলেছিলেন— ‘যে নিষ্পাপ ব্যক্তি আমার নাম স্মরণ করে, তার কোনও দুর্লভ বস্তুই অপ্রাপ্য থাকে না।’ জ্যেষ্ঠ পাণ্ডবকে কৌরবদের পরাজিত করে রাজ্য ফিরে পাওয়ার বরদান করেছিলেন দুর্গা। দেবীর কৃপায় তাঁদের অজ্ঞাতবাস পর্ব নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়েছিল।
ভীষ্ম পর্বেও ছিলেন মা দুর্গা। কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে কৌরব শিবিরে আত্মীয়-পরিজনদের দেখে বীর যোদ্ধা অর্জুন দোলাচলে পড়ে গিয়েছিলেন। অস্ত্র ধরতে চাননি। তখন পার্থসারথি কৃষ্ণই তাঁকে পথ দেখান। রাধামাধব অর্জুনকে দু্র্গা-বন্দনার উপদেশ দেন। যুদ্ধের ময়দানে দুর্গার স্তব শুরু করেন অর্জুন। দেবী তুষ্ট হয়ে অর্জুনকে বিজয়ী হওয়ার বরদান করেন। মহাকাব্যের পরিশেষে পাণ্ডবেরা যুদ্ধে জয়ী হন।
মহাভারত কিন্তু কৃষ্ণ ছাড়া অসম্পূর্ণ। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ অনুসারে স্বয়ং মধুসূদনই জগতে প্রথম দুর্গার আরাধনা করেন। ‘শরণাগত দীনার্ত পরিত্রাণ পরায়ণে। সর্বস্যার্তি হরে দেবী নারায়ণী নমোহস্তুতে।’ বা ‘সর্বমঙ্গল মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে। শরণ্যে ত্রম্বক্যে গৌরী নারায়ণী নমোহস্তুতে।’ এই নারায়ণী আসলে দুর্গাই। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, দ্বাপর যুগে দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালনের জন্য শ্রীকৃষ্ণ ভাদ্রের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমীতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কৃষ্ণকে নন্দালয়ে রেখে বাসুদেব জগন্মাতাকে নিয়ে এসেছিলেন। যশোদার গর্ভজাত সেই শিশুকন্যাকে দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তান ভেবে মহারাজ কংস আছড়ে মারতে যান। তখনই ভবিষ্যদ্বাণী হয়, ‘তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে।’ মহামায়া ও কৃষ্ণের জন্মতিথি এক— ভাদ্রের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী। আজও জন্মাষ্টমীতে কোনও কোনও বনেদি বাড়ির ঠাকুরদালানে মূর্তি গড়া শুরু হয়। তখনই অমোঘ সত্য হয়ে ওঠে একটি বাক্য— দুর্গাই আদতে নারায়ণী।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।