পাঁচতারা এসি কিনলেই কি কমবে বিদ্যুৎ বিল? এই গোপন মারপ্যাঁচ না বুঝলে পুজোর মুখেই পকেট ফাঁকা!
পুজোর আগে বাড়িতে নতুন এসি কেনার পরিকল্পনা করছেন? বাজারে পাঁচতারা এসি দেখলেই অনেকের মনে হয়, এই এসি কিনলে বিদ্যুতের বিল অনেকটাই কমবে। কিন্তু বাস্তব হিসাবটা একটু আলাদা। এসি কেনার আগে কোন জিনিসগুলি মাথায় রাখা ভীষণ জরুরি?
১. এসি কেনার সময় স্টার রেটিংয়ের পাশাপাশি ঘরের আয়তন, ব্যবহারের সময়, তাপমাত্রা এবং রক্ষণাবেক্ষণের উপরেও নির্ভর করে বিদ্যুৎ খরচ। তাই শুধুমাত্র রেটিং দেখে এসি কিনলেই হবেনা। মেনে চলতে হবে বেশ কয়েকটি কৌশল।
২. সাধারণত পাঁচতারা এসি স্টার রেটিংয়ের এসির তুলনায় বেশি শক্তি-সাশ্রয়ী হয়। ফলে দীর্ঘ সময় এসি চালালেও বিদ্যুতের বিল কম হতে পারে। তবে কতটা সাশ্রয় হবে, তা পুরোটাই নির্ভর করবে নির্দিষ্ট মডেলের বিদ্যুৎ খরচের উপর।
৩. এসির গায়ে থাকা স্টার রেটিংয়ের পাশাপাশি ‘আইএসইইআর’ (ISEER) অর্থাৎ ইন্ডিয়ান সিজ়নাল এনার্জি এফিশিয়েন্সি রেশিয়োর মানটিও দেখে নিতে হবে। সাধারণভাবে আইএসইইআর রেটিং যত বেশি হয়, এসির বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের ক্ষমতা বা শক্তি-দক্ষতাও তত উন্নত হয়। একই স্টার রেটিং থাকা দু’টি এসির মধ্যে কোনটি বেশি বিদ্যুৎ সাশ্রয়কারী, তা তুলনা করতেও এই মানটি অত্যন্ত কার্যকর।
৪. পাঁচতারা এসির দাম অন্যান্য এসির তুলনায় বেশি হতে পারে। তাই কেনার সময় শুধু দাম দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন না। বেশি দামের এসি কিনে বছরে কত টাকা বিদ্যুৎ সাশ্রয় হতে পারে, তা হিসাব করুন।
৫. ঘরের মাপ অনুযায়ী এসি কেনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ছোট ঘরের জন্য অতিরিক্ত ক্ষমতার এসি কিনলে অপ্রয়োজনীয় খরচ হতে পারে। আবার বড় ঘরে কম ক্ষমতার এসি লাগালে ঘর ঠান্ডা হতে বেশি সময় লাগতে পারে। ঘরের আয়তন, ছাদের উচ্চতা, জানালার সংখ্যা এবং সরাসরি রোদ পড়ছে কিনা এই সব বিষয় বিবেচনা করে আপনার ঘরের জন্য এসি বেছে নিন।
আরও পড়ুন:
৬. ঘর দ্রুত ঠান্ডা করার জন্য অনেকেই এসির তাপমাত্রা ১৬ বা ১৮ ডিগ্রিতে করে দেন। কিন্তু এতে বিদ্যুৎ খরচ বাড়তে পারে। সাধারণত ২৪ বা ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে এসি চালালে আরাম এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা সম্ভব। নয়তো বিদ্যুৎ বিল বাড়বেই।
৭. দিনে এক-দু’ঘণ্টা এসি চালানো আর প্রতিদিন আট-দশ ঘণ্টা চালানোর বিদ্যুৎ খরচ এক নয়। দীর্ঘ সময় এসি ব্যবহার করলে শক্তি-সাশ্রয়ী মডেল বেছে নেওয়ার আর্থিক সুবিধা তুলনামূলক বেশি হতে পারে। দীর্ঘক্ষণ এসি প্রয়োজন হলে পাঁচ তারা মডেল কার্যকরী।
৮. এসি কেনার আগে তার গায়ে সাঁটা স্টিকারটা একটু মন দিয়ে দেখে নেওয়া দরকার। সেখানে ক’টা স্টার দেওয়া আছে, সেটা যেমন দেখবেন, তেমনই বছরে ঠিক কতটা কারেন্ট পুড়বে সেটাও লেখা থাকে। একই টনের দুটো এসি পাশাপাশি রেখে স্টিকার দুটো মেলালেই সহজে বুঝতে পারবেন কোনটা কিনলে আপনার ইলেকট্রিক বিল কম আসবে। আর হ্যাঁ, স্টিকারের নিচে কোন সাল পর্যন্ত রেটিংটা চালু রয়েছে, সেটাও দেখে নেবেন।
৯. অনেকসময় ধুলো জমে এসির ফিল্টার বন্ধ হয়ে যায়।এতে বাতাস চলাচলে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। এর কারণে এসির ঠান্ডা করার দক্ষতা কমতে পারে। তাই নিয়মিত ফিল্টার পরিষ্কার করতে হবে এবং প্রয়োজনমত রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে।
আরও পড়ুন:
১০. এসি চালানোর সময় দরজা-জানালা খোলা থাকলে বা ঘরে কোনও বড় ফাঁক থাকলে বাইরের গরম বাতাস ঘরে ঢুকতে পারে। ফলে ঘর ঠান্ডা রাখতে এসি-কে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। দরজা-জানালা বন্ধ রাখা এবং ফাঁকফোকর দিয়ে বাতাস ঢোকা আটকানো বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সাহায্য করে। ঘরে যদি কোনওরকম বড় ছিদ্রও থেকে থাকে তাহলেও কিন্তু এসি উপর চাপ বেড়ে বিদ্যুতের খরচ বাড়বে।
১১. ঘরে সরাসরি রোদের তাপ পড়লে বিদ্যুৎ খরচ বাড়তে পারে। ফলে এসির ঘর ঠান্ডা রাখতে বেশি সময় কাজ করতে হতে পারে। রোদ নিরোধক পর্দা বা উপযুক্ত সানশেড ব্যবহার করলে ঘরের তাপ কমতে পারে। এর ফলে এসির ওপর চাপ পড়ে না, বিদ্যুতের খরচও কম হয়।
১২. এসি কেনার আগে নিজের বাড়ির বিদ্যুতের বিলটা এক বার ভালো করে দেখে নেওয়া দরকার। কারণ আপনি মাসে ঠিক কতটা বিদ্যুৎ খরচ করেন এবং সেই অনুযায়ী প্রতি ইউনিটের দাম কত পড়ছে, তার উপরেই এসির আসল খরচ নির্ভর করে। বিদ্যুৎ খরচের বিভিন্ন ধাপ বা ‘স্ল্যাব’ থাকে। বেশি ইউনিট পুড়লে প্রতি ইউনিটের দরও বেড়ে যায়। তাই এসি চালালেই যে একলাফে পুরো বিল বেড়ে যাবে তা নয়, আপনার মোট ইউনিট খরচের হিসাবটাই আসল খেলা।
১৩. বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের দাম এবং আপনার সাধ্য সবকিছু দেখে তবেই এসি কিনুন এবং ব্যবহার করুন।
১৪. প্রয়োজন ছাড়া এসি ব্যবহার করবেন না। অতিরিক্ত এসি ব্যবহারের ফলে পরিবেশেরও ক্ষতি হয়। তাই অযথা এসি ব্যবহার করে নিজের এবং প্রকৃতির ওপরেও চাপ বাড়াবেন না।
১৫. হিসেব গুলিয়ে গেলে এসি টেকনিশিয়ানের সাহায্য নিন। ঘরের মাপ (স্কোয়ার ফুট), রোদ কোন দিকে পড়ে, সিলিং কতটা উঁচু বা কোন তলায় ঘর—এই বিষয়গুলো মেপে তিনিই বলে দিতে পারবেন আপনার ঘরের জন্য এক টন নাকি দেড় টন কোনটা উপযুক্ত। এই প্রতিবেদনটি আনন্দ উৎসব ফিচারের একটি অংশ।।