Health Partner
Comfort Partner
Knowledge Partner

পাতার মর্মরে, পাখির ডাকে নিস্তব্ধ অরণ্য-যাপন, পুজোর পরে আলসে ছুটি কাটান মারোমারে

ব্যাগ গুছিয়ে ঘুরে আসুন ঝাড়খণ্ডের মারোমার। এখানে আকাশচুম্বী পাহাড় বা আদিগন্ত সমুদ্র নেই, কিন্তু আছে শাল-মহুয়ার বন, শুকনো পাতার শিরশিরে শব্দ আর এমন এক নিস্তব্ধতা, যা শহুরে ব্যস্ততাকে ভুলিয়ে দেবে।

বিশ্বজ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২০ অক্টোবর ২০২৬ ১৮:২৩
পুজোর পরে আলসে ছুটি কাটান মারোমারে

পুজোর পরে আলসে ছুটি কাটান মারোমারে

উৎসবের আলোয় কলকাতা এখন ঝিলমিল। দেদার হইচই-হুল্লোড়ের পুজো পেরিয়ে যদি মনে হয়— শহরটাকে কয়েক দিনের জন্য পিছনে ফেলে এমন কোথাও যাই, যেখানে সকাল শুরু হয় পাখির ডাকে, দুপুর গড়িয়ে বিকেল আসে ফালি ফালি রোদের হাত ধরে আর সন্ধে নামলে মাথার উপরে জ্বলে ওঠে এক আকাশ তারা, তা হলে ব্যাগ গুছিয়ে ঘুরে আসুন ঝাড়খণ্ডের মারোমার। এখানে আকাশচুম্বী পাহাড় বা আদিগন্ত সমুদ্র নেই, কিন্তু আছে শাল-মহুয়ার বন, শুকনো পাতার শিরশিরে শব্দ আর এমন এক নিস্তব্ধতা, যা শহুরে ব্যস্ততাকে ভুলিয়ে দেবে।

মারোমারের নাম শুনলেই মনে পড়ে সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহর কথা। তাঁর লেখায় প্রকৃতির সব রং কেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, তা বুঝেছিলাম মারোমারকে কাছ থেকে দেখে। গাঢ় নীল থেকে ঘন সবুজ, বাদামী হয়ে ঝলমলে হলুদ – প্রকৃতি যেন বনের ক্যানভাসে নিজের মর্জি মতো ছবি এঁকে চলেছে। আর তাতে মিশছে জঙ্গলের আলো-আঁধারির স্পর্শ। থাকার জন্য রয়েছে সরকারি বন-বাংলো আর গাছের উপরে কাঠের ট্রি হাউসের আকর্ষণ।

প্রথম দিনটা কাটুক অরণ্যের সঙ্গে আলাপ জমিয়ে। গাছের ছায়ায় বসে প্রাতরাশ সারুন। বাংলোর হাতায় পায়চারি করে দেখুন তো কতগুলো গাছ চিনতে পারেন বা কোন পাখির ডাক আপনি আগে কখনও শোনেননি। ইচ্ছে করলে প্রিয় বইটি আর এক বার পড়ুন, অথবা চুপ করে বসে শুনুন স্তব্ধতার গান। আসলে এই সফরে তাড়াহুড়ো না করাটাই আসল কথা।

দ্বিতীয় দিন সকালে আমরা বেরিয়ে পড়েছিলাম মহুয়াডাঁড়ের আদিবাসী হাটের দিকে। জঙ্গলের নির্জনতা পেরিয়ে হাটের ভিড়ে ঢুকতেই মনে হল যেন অন্য এক পৃথিবীতে এসে পড়েছি। চার দিকে মানুষের আনাগোনা, হরেক পসরা, অচেনা শাকসবজি আর মশলার গন্ধ। সঙ্গে এমন সব জিনিসপত্র, যাদের নামই আগে কখনও শুনিনি। বাজার চলছে তার নিজের ছন্দে – কেউ দরদাম করছেন, কেউ বা মাথায় পসরা নিয়ে ঘুরছেন, কেউ সময় কাটাচ্ছেন নিছক গল্পেগুজবে। কারওরই আমাদের শহুরে বাজার-করিয়েদের মতো হন্তদন্ত ভাব নেই। নাগরিক কৌতূহল নিয়ে ইতিউতি দেখছিলাম। মনে মনে একটু ভয়ও ছিল – আমাদের পোশাকআশাক আর আচরণ স্থানীয় মানুষের চোখে বেমানান ঠেকছে না তো? সে ভয় কেটেও গেল অচিরেই। এলাকার মানুষজনের ব্যবহার যে খুব আন্তরিক – প্রত্যেকে হাসিমুখে কথা বললেন, আমাদের কৌতূহলও মেটালেন সাধ্যমতো। অচেনা জায়গায় এই সহজ আতিথেয়তাটুকুই তো বেড়ানোর সেরা পাওনা!

হাটে দরদস্তুর করে দিশি শুয়োরের টাটকা মাংস কিনে সেখানেই রান্নার ব্যবস্থা করিয়েছিলাম। মাংস রান্না হতে যত ক্ষণ লাগল, আমাদের বিনোদনের অভাব হয়নি। হাঁড়িয়া (স্থানীয় চাল থেকে তৈরী পানীয়) সহযোগে গল্প জমে গিয়েছিল যে! তার পরে এল সেই বহু প্রতীক্ষিত দুপুরের ভোজ – কষিয়ে রাঁধা শুয়োরের মাংস আর স্থানীয় লালচে বাদামী চালের দলা পাকানো ভাত। মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের জীবনের এমন এক টুকরো স্বাদ, যা শহরের ঝাঁ-চকচকে রেস্তোরাঁয় কখনওই পাওয়া সম্ভব নয়। সেই দুপুরের খাবারের স্বাদ স্মৃতির বুক-পকেটে অনেক দিন ভরা থাকবে।

বিকেলে আবার ফিরে এলাম মারোমারের জঙ্গল আবাসে। দিনের আলোয় যে অরণ্য সবুজের বন্যায় ভাসে, সন্ধে নামতেই তার চেহারা আমূল বদলে যায়। পাখিরা বাসায় ফেরে, গাছের ছায়া দীর্ঘতর হয়, অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। দূরে ঝিঁঝিঁর ডাক, পাতার মর্মর আর বন্য পশুপাখির চলাফেরার শব্দ রাতের নিজস্ব সুর তৈরি করে দেয়। শহরের আলোয় ঢাকা পড়ে থাকা তারারাও এখানে মুখ টিপে হেসে ওঠে।

হাতে সময় থাকলে ঘুরে নিতেই পারেন বেতলা টাইগার রিজার্ভ, পালামৌর ঐতিহাসিক দুর্গ কিংবা নেতারহাট আর লোধ জলপ্রপাত। কিন্তু আমার মতে, মারোমারকে চেনার সেরা উপায় হল ঘোরার তালিকা বেশি বড় না করা। জীবনের সব মুহূর্তকে যে কাজে লাগাতেই হবে, এমন তো কোনও কথা নেই!

পুজো শেষ মানেই তা হলে আনন্দ শেষ নয়। কখনও কখনও উৎসবের পরেই দরকার হয় নিজের জন্য ছোট্ট একটা ছুটি। মারোমার সেই বিরতি নেওয়ার জায়গা— যেখানে এক দিকে গভীর অরণ্যের নিস্তব্ধতা, অন্য দিকে মহুয়াডাঁড়ের হাটের জীবন্ত কোলাহল। শহরে ফিরে আসার সময় হয়তো ব্যাগভর্তি স্মারক থাকবে না, কিন্তু মনে থাকবে বনের গন্ধ, অচেনা মানুষের আন্তরিকতা আর এক দুপুরের অসাধারণ ভোজ। মন ভাল করার জন্য এর চেয়ে বেশি আর কী বা চাই!

কলকাতা থেকে আনুমানিক খরচ (জনপ্রতি):

যাওয়া-আসার ট্রেনভাড়া: ১৫০০ টাকা

গাড়িভাড়া ও স্থানীয় ঘোরাঘুরি: ৩,০০০–৫,০০০ টাকা।

তিন রাত থাকা, খাওয়াদাওয়া ও অন্যান্য খরচ: ৬,০০০ টাকা।

মোট আনুমানিক খরচ ১২,০০০ – ১৪,০০০ টাকার মধ্যে।

এই প্রতিবেদনটি "আনন্দ উৎসব" ফিচারের একটি অংশ।

এই প্রতিবেদনটি 'আনন্দ উৎসব' ফিচারের একটি অংশ।

Jharkhand

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy