ভূত চতুর্দশীর আগের রাত। শহরে-গ্রামে ঘরে ঘরে তখন চোদ্দো প্রদীপ জ্বালানোর প্রস্তুতি। ছোটবেলা থেকে শুনে আসা ভূতপ্রেতের গল্পগুলোও এই সময়ে যেন নতুন করে মনে পড়ে। সেই সব গল্পের ভূতেরা অবশ্য থাকে পরিত্যক্ত বাড়ি, অন্ধকার গলি কিংবা ভুশণ্ডির মাঠের মতো নির্জন কোনও প্রান্তরে। মণিকর্ণিকা ঘাটের গল্পটা কিন্তু একটু আলাদা।
বারাণসীর এই প্রাচীন ঘাটে মৃত্যু দৈনন্দিন জীবনের মতোই স্বাভাবিক। দিনরাত মৃতদেহ আসে, চিতায় ওঠে, আগুন কখনও নেভে না। আর চিতার আগুনের চার পাশে ঘুরে বেড়ায় এমন সব গল্প, যা শুনলে নিজের ছায়াকেও অপরিচিত মনে হতে পারে। কেউ বলেন, গভীর রাতে চিতার ধোঁয়ার মধ্যে দেখা যায় অচেনা অবয়ব। কেউ শুনেছেন অদৃশ্য মানুষের পায়ের শব্দ। কতটা সত্যি, কতটা লোককথা, কে জানে! ভূত চতুর্দশীর আগের সেই রাতে মণিকর্ণিকার দিকে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, এখানে হয়তো ভূতেদের খুঁজতে হয় না। কখনও কখনও তেনারাই এসে জানান দিয়ে যান যে, আশেপাশেই আছেন।
দশাশ্বমেধ ঘাটের দিক থেকে একটা সরু গলি ধরে এগোচ্ছি। দু'পাশে সেকেলে ঘরবাড়ি, মাথার উপরে বিদ্যুতের তারের জট। সামনে একটা ষাঁড় পথ আটকে দাঁড়িয়ে। তাকে পাশ কাটাতেই সামনে দিয়ে চলে গেল বাঁশের খাটিয়ায় শোওয়ানো এক মৃতদেহ। পিছনে কয়েক জন মানুষ। সঙ্গে জোর গলায় ‘রাম নাম সত্য হ্যায়’।
আরও পড়ুন:
গলি শেষ হতেই সামনে গঙ্গা। তার পাশেই চিতার আগুন। একের পর এক চিতা জ্বলছে ঘাট জুড়ে। বাতাসে পোড়া কাঠ, ঘি আর ধূপের গন্ধ। ধোঁয়ার ওপারে মানুষগুলো যেন শরীর হারিয়ে ভাসমান ছায়ায় পরিণত হয়েছে। গঙ্গার কালো জলে কাঁপছে আগুনের প্রতিবিম্ব। কোথাও কাঠ ভেঙে পড়ার শব্দ। কোথাও চাপা কান্না।
লোকে বলে, এখানে মৃতের কানে স্বয়ং শিব তারক মন্ত্র দেন। আত্মা মুক্তি পায় জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে। কিন্তু যাঁদের মুক্তি হয় না? সেই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নিয়েছে কত গল্প! ঘাটের কাছের এক চায়ের দোকানে শুনলাম, গভীর রাতে ধোঁয়ার মধ্যে নাকি কখনও দেখা যায় সাদা কাপড়ে ঢাকা মানুষের অবয়ব। কেউ সিঁড়ি দিয়ে নদীর দিকে নামছে। কাছে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে কেউ নেই।
আমারই এক আত্মীয় গভীর রাতে মণিকর্ণিকায় শুনেছিলেন নদীর ওপার থেকে ভেসে আসা ঢাক আর শঙ্খধ্বনি। সেই শব্দের উৎস খুঁজতে পায়ে পায়ে এগিয়ে তিনি পৌঁছেছিলেন অঘোরী সাধকদের জগতে। শরীরে চিতাভস্ম মেখে, নরকরোটির সামনে শ্মশানেই চলে তাঁদের সাধনা। উদ্দেশ্য, মৃত্যু আর ভয়কে জয় করা। আর এক পর্যটক হরিশ্চন্দ্র ঘাটের কাছে শ্মশানকালীর মন্দিরে দেখেছিলেন এক মহিলাকে, যিনি স্বামীর ঘাড় থেকে ভূত নামাতে এক তান্ত্রিকের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। পর্যটকের চোখের সামনেই চলেছিল সেই গায়ে কাঁটা দেওয়া আচার।
পায়ে পায়ে এগিয়ে বসে পড়েছিলাম এক সময়ে। মাথায় তখন এ সব গল্পই ঘুরছে। ঘাটের সিঁড়িতে বসে থাকতে থাকতে কখন যে রাত গভীর হয়েছে, খেয়াল করিনি। সামনে একটা চিতার আগুন ধীরে ধীরে নিভে আসছে। হঠাৎ মনে হল ধোঁয়ার ঘন পর্দার পিছনে কেউ যেন দাঁড়িয়ে আছে! মাথা নিচু। শরীরটা অস্বাভাবিক রকমের স্থির। সাহসে ভর করে একটু এগোতেই ধোঁয়া সরে গেল।
কেউ নেই। এ দিকে, ঠিক তখনই পিছন থেকে ভেসে এল একটা শব্দ। যেন ভেজা পাথরের সিঁড়িতে কেউ খালি পায়ে আওয়াজ তুলে হাঁটছে। ঘুরে তাকালাম, আবারও কেউ কোথাও নেই। অথচ শব্দটা যেন ক্রমশ যেন আমার দিকে এগিয়ে আসছে! দূরে একটা কুকুর ডেকে উঠল। হঠাৎ মনে হল, ঘাটের তাপমাত্রা যেন কয়েক ডিগ্রি নেমে গিয়েছে। অথচ ঘাড়ের ঠিক পিছনটায় গরম গরম ভাব। কারও নিঃশ্বাস?
মনে পড়ল মসান হোলির কথা। প্রচলিত বিশ্বাস বলে, শিব তাঁর ভূতপ্রেতের দলবল নিয়ে এই শ্মশানে নাকি হোলি খেলতে আসেন। আবিরের বদলে ব্যবহার হয় চিতাভস্ম। জীবিতদের উৎসবের বাইরেও যেন আর একটা জগৎ আছে, যার নিজস্ব রীতিনীতি, নিজস্ব উৎসব।
যুগ যুগ ধরে চলে আসা বিশ্বাস, কত মানুষের অভিজ্ঞতা - বিজ্ঞানের কাছে হয়তো এ সবের যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা আছে। কিন্তু মণিকর্ণিকায় বসে সেই যুক্তিগুলো আর তেমন ভরসা জোগাচ্ছিল না। ফেরার পথ ধরলাম। সরু গলির মুখে পৌঁছে এক বার পিছন ফিরে তাকালাম। চিতার আগুন তখনও জ্বলছে। ধোঁয়ার মধ্যে নড়ছে অসংখ্য ছায়া। আমার পিছনে কেউ নেই। তবু কেন যে মনে হচ্ছিল, ঘাট থেকে কেউ যেন আমার সঙ্গে সঙ্গেই চলেছে! মণিকর্ণিকা ছেড়ে বেরিয়ে এসেছি ঠিকই, কিন্তু মণিকর্ণিকা আমাকে ছেড়েছে কি না, বুঝতে পারলাম না। কিছু কিছু জায়গা বোধহয় শুধু স্মৃতিতে নয়, জায়গা করে নেয় আরও গভীরে, রক্তমাংসের ভিতর লুকিয়ে থাকা কোনও আদিম আতঙ্কের আস্তানায়— যেখানে যুক্তির প্রবেশ নিষেধ।
বারাণসী বেড়াতে গেলে দশাশ্বমেধ ঘাট থেকে গঙ্গার ধার ধরে হেঁটে কিংবা নৌকায় মণিকর্ণিকা ঘাটে পৌঁছনো যায়। পুরনো শহরের সরু গলি দিয়েও যাওয়া সম্ভব। ঘাটে শেষকৃত্য চলার সময়ে ছবি তোলা বা শোকাহত পরিবারগুলির ব্যক্তিগত পরিসরে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকুন।
এই প্রতিবেদনটি 'আনন্দ উৎসব' ফিচারের একটি অংশ।