Health Partner
Comfort Partner
Knowledge Partner

পাহাড়, জঙ্গল কিংবা হাইওয়ে, পথের বাঁকে যাদের দেখা না পেলেই ভাল!

বেড়াতে বেরিয়ে পথের ঝুলিতেও থাকে অনেক গল্প। জমা হয় গা ছমছমে অভিজ্ঞতাও। সে নিজেরই হোক বা অন্যের। ভূত চতুর্দশীর আগে সেই ঝুলিই খুলল!

বিশ্বজ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০২ নভেম্বর ২০২৬ ১৯:৫১
শুধু পাহাড় বা জঙ্গল নয়, 'তেনাদের' উপস্থিতি সর্বত্র!

শুধু পাহাড় বা জঙ্গল নয়, 'তেনাদের' উপস্থিতি সর্বত্র!

বেড়াতে গেলে শুধু কি নির্দিষ্ট গন্তব্যই সব রোমাঞ্চের ঠিকানা? অনেক সময়ে সেখানে পৌঁছনোর পথটাও বোধহয় আলাদা করে জায়গা করে নেয় স্মৃতিতে। যে স্মৃতি কখনও মজায় মোড়া, কখনও আনন্দের তো বটেই, কখনও আবার ভয়েরও বটে! পথের বাঁকে রাখা সে সব শিহরণ জাগানো অভিজ্ঞতার ঝুলি খুলতেই পারে এই ভুতুড়ে মরসুমে!

পাহাড়ি পথের কথাই ধরা যাক। চড়াই উতরাই বেয়ে এঁকেবেঁকে চলা এই রাস্তাগুলোয় রাত নামার একটা নিজস্ব ধরন আছে। প্রথমে গাছপালার রং মুছে যায়। তার পরে অন্ধকারে একে একে হারিয়ে যায় দূরের বাড়িঘর, পথের বাঁক। শেষমেশ গাড়ির হেডলাইটে যতটুকু দেখা যায়, পৃথিবী যেন ঠিক ততটুকুতেই এসে ঠেকে। বাকি সবটা নিকষ অন্ধকার। আর সেই অন্ধকার জমাট বেঁধে কখনও কখনও এমন কিছু অবয়বের রূপ নেয়, যাদের কথা বলতে গেলে দিনের আলোতেও গা শিরশির করে ওঠে।

সেবার কালিম্পং থেকে শিলিগুড়ি ফিরছি। রাত প্রায় তিনটে। তিস্তার কালো জল রাস্তার অনেক নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে। পাহাড়ের গায়ে এমন কুয়াশা যে, দু’হাত দূরের জিনিসও ভাল করে ঠাহর হয় না। কালিঝোরার কাছে হেডলাইটের আলোয় দেখা গেল রাস্তার ধারে আপাদমস্তক বর্ষাতিতে ঢাকা একটা লোক হাত তুলে দাঁড়িয়ে। কুয়াশা ভেজা অন্ধকারে মুখ প্রায় দেখাই যাচ্ছে না। একটু ইতস্তত করে গাড়ির গতি কমিয়ে আবার বাড়িয়ে দিলাম। কিছু দূর এগিয়ে মনে হল আবার যেন সেই লোক দাঁড়িয়ে। একই পোশাক, একই ভঙ্গি। তখনও দাঁড়াইনি অবশ্য। তৃতীয় বার যখন ফের একই রকম মনে হল, দাঁড়ানো দূরে থাক, গতি কমানোও সাহসে কুলোয়নি। পরের কয়েক কিলোমিটার রিয়ারভিউ মিরর থেকে চোখও সরাতে পারিনি।

পাহাড়ি পথের চালকদের কাছে অবশ্য এমন গল্প নতুন নয়। কয়েক বছর আগে ডুয়ার্সে চাপড়ামারির জঙ্গলের ধারে চায়ের দোকানে আলাপ হয়েছিল এক বয়স্ক গাড়িচালকের সঙ্গে। বহু বছর ধরে পর্যটকদের নিয়ে ঘুরছেন তিনি। গল্প করতে করতে বললেন, এক সন্ধ্যায় জঙ্গলের রাস্তায় এক তরুণ দম্পতিকে গাড়িতে তুলেছিলেন। দু’জনেই চুপচাপ। কিছুদূর যাওয়ার পরে পিছন থেকে কোনও সাড়া না পেয়ে আয়নার চোখ রেখেছিলেন— পিছনের আসন ফাঁকা! গাড়ি থামিয়ে নেমে এদিক ওদিক খুঁজেও দেখেছিলেন নাকি। চার দিক জনশূন্য, খাঁ খাঁ করছে জঙ্গল। গল্প শেষ করে সেই লোক, যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব করে চায়ের গ্লাসে চুমুক দিলেন। জিজ্ঞেস করলাম, তার পর? বললেন, “তার পরে আর কী! ওই রাস্তায় সন্ধের পরে আর গাড়ি নিয়ে যাই না।”

শুধু পাহাড় বা জঙ্গল নয়। ফাঁকা হাইওয়েও কখনও কখনও কম অস্বস্তিকর নয়! এক বার উদয়পুর থেকে আরাবল্লির পাহাড়ি পথ ধরে গুজরাতের দিকে ড্রাইভ করে ফিরছিল এক বন্ধু। রাত তখন অনেক। দুপাশে ধু ধু প্রান্তর আর রুক্ষ পাহাড়। মাঝে মাঝে দূরপাল্লার ট্রাক রাতের নিস্তব্ধতা খান খান করে ছুটে চলেছে। হঠাৎ হেডলাইটের আলোয় নাকি সামনে ফুটে উঠেছিল সাদা শাড়ি পরা এক বৃদ্ধা, রাস্তার ধারে উবু হয়ে বসে। এত রাতে তিনি এখানে কী করছেন? পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ে বন্ধু লক্ষ করে, মহিলা কিন্তু এক বারও মুখ তুলে তাকাননি। কিছু দূর এগিয়ে পিছন ফিরে দেখা যায়— ফাঁকা রাস্তা, কোত্থাও কেউ নেই। আশপাশে কিন্তু কোনও গ্রামও নাকি বন্ধুর চোখে পড়েনি!

একই রাস্তা বারবার ফিরে আসার অদ্ভুত অনুভূতির কথা শুনেছিলাম মানালির পথে, এক ধাবায়। বৃষ্টিভেজা সপসপে দুই বাইক আরোহী তখন চায়ের অপেক্ষায়। তাঁদের মুখে যেন একটা চাপা আতঙ্কের ছাপ। একজন বললেন, আসার পথে পাহাড়ি রাস্তার বাঁকে বারবার একই বাড়ি দেখতে পাচ্ছিলেন। বাড়ির সামনে লাল রঙের ছোট একটা গাড়ি। পাশে একটা বাছুর বাঁধা রয়েছে। প্রথম বার তাঁরা খেয়াল করেননি। দ্বিতীয় বার অবাক হয়েছিলেন। তৃতীয় বার দু’জনেই বাইক থামান। একই রাস্তায় কি গোল গোল ঘুরছেন তাঁরা? অথচ কোনও মোড় বা বাঁক পেরিয়েছেন বলেও তো মনে পড়েনি। গল্পটা শুনে ধাবার মালিক শুধু বলেছিলেন, “রাতে পাহাড়ের চেনা রাস্তাও অচেনা হয়ে যায় সাহেব!”

অনেক দিন পরে গল্পটা আবার মনে পড়েছিল আলমোড়া থেকে জাগেশ্বর যাওয়ার পথে। সন্ধের পর একা বাইক চালাচ্ছি। আমাকে এক রকম বিপজ্জনক ভাবে রাস্তার ধারে চেপে দিয়েই একটা সাদা গাড়ি প্রচণ্ড গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। তার পরে অদৃশ্য হয়ে গেল বাঁকের আড়ালে। কয়েক সেকেন্ড পরে সেই বাঁক পেরিয়ে দেখি, গাড়ির কোনও চিহ্ন নেই! সামনে হেডলাইটের আলোয় অনেকটা পথ দেখা যাচ্ছে, পাশে গভীর খাদ। গাড়ি লুকোনোর মতো কোনও জায়গা কিন্তু চোখে পড়ল না। হয়তো অন্য কোনও সরু রাস্তা ছিল, অন্ধকারে নজর এড়িয়ে গিয়েছে। নিজেকে সেই কথাই বুঝিয়েছিলাম। তবে পরের প্রতিটি বাঁকে কিন্তু সেই সাদা গাড়িটাকেই খুঁজেছি!

আর এক বার হিমাচলের মান্ডির কাছে এক ট্রাকচালক শুনিয়েছিলেন আর এক হাড়হিম করা গল্প। গভীর রাতে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছিলেন তিনি। পুরো লোড থাকায় ট্রাক বেশ ভারী। ঘণ্টায় প্রায় ষাট কিলোমিটার বেগে ছুটছিল ট্রাক। হঠাৎ নাকি জঙ্গল থেকে দু’জোড়া পা যেন রাস্তায় উঠে এসে পথ আটকে দাঁড়ায়, একেবারে ট্রাকের সামনে! তিনি বলেছিলেন, “শুধু পা বলছি, কারণ ওই অদ্ভুত প্রাণীগুলোর শরীর পায়ের পাতা থেকে কোমর পর্যন্তই ছিল। কোমর পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, অথচ তার উপরে যেখানে শরীর থাকার কথা, সেখানে শুধু জমাট অন্ধকার।” কিছু বুঝে ওঠার আগেই পায়ের সমস্ত জোর দিয়ে ব্রেক কষেছিলেন তিনি। ট্রাক প্রায় উল্টেই যাচ্ছিল। কোনও রকমে রাস্তার ধারে কয়েকটা ছোট গাছে ধাক্কা খেয়ে থেমে যায়। সেদিন নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছিলেন তিনি। গল্পটা শুনিয়ে সেই ট্রাকচালক বলেছিলেন, “পাহাড়ে রাতে সব কিছু নিজের চোখে বিশ্বাস করবেন না।” তার পরে নিজেই হেসে উঠেছিলেন হো হো করে। কিন্তু একটু কি দুর্বল ছিল কি সেই হাসি ?

এ সব গল্পের কোনও জাগতিক ব্যাখ্যা হয়তো হয় না। ক্লান্তি, কুয়াশা কিংবা অচেনা রাস্তায় আলোছায়ার খেলা চোখে ঝিলমিল ধরাতেই পারে। তবু বেড়ানোর শেষে আমরা যে শুধু পাহাড়, নদী আর হোটেলের দারুণ সব ছবি নিয়ে ঘরে ফিরি, তা তো নয়। কখনও সঙ্গে ফেরে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মুখ, কখনও বা কারও মুখে শোনা গা ছমছমে গল্প! তার স্বাদ? এখন আপনিও জানেন!

এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy