সুপ্রাচীন অফিসপাড়ায় আজও রয়েছে ব্রিটিশ আমলের একাধিক বহুতল এবং স্থাপত্য। সব বহুতল এখন আগের মতো ব্যবহার না হলেও, বেশ কিছু বাড়িতে এখনও নানা অফিস চলে।
লোকে বলে, শুধু মানুষ নয়, এ পাড়ায় নাকি ভূতেদেরও দীর্ঘদিনের বসত। ব্রিটিশ আমলের এই বাড়িগুলোয় কি সত্যিই থাকেন তেনারা? তাঁরা সব অন্ধকার ঘনিয়ে এলে আসেন? নাকি থাকেন সব সময়েই?
বিশ্বাস এবং বাস্তবের হেরফের রয়েছে বহু ক্ষেত্রে। তবু বিবাদী বাগ অঞ্চলে অফিস করতে আসা বহু কর্মীর মুখে মুখে ফেরে হরেক গল্প — 'ভূতের গল্প'!
এই এলাকার কোথায় কোথায় দেখা পাওয়া যায় ভূতেদের?
১. রাইটার্স বিল্ডিং:
ব্রিটিশ আমলের এই ঐতিহাসিক প্রশাসনিক ভবনকে ঘিরে রয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রাম, মৃত্যু ও অশরীরী উপস্থিতির নানা গল্প। কলকাতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা রাইটার্স বিল্ডিংকে ঘিরে বহু বছর ধরেই নানা ভৌতিক কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। কথিত, এখানে নাকি রাতে ফাঁকা ঘর থেকে টাইপ করার শব্দ, জানলার পাল্লা নড়ার আওয়াজ এবং ভারী বুটের শব্দ শোনা যায়। ১৯৭০-এর দশকে মুনশিরাম ও মেহবুব নামে দুই নিরাপত্তারক্ষী এক আহত শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তির ছায়ামূর্তি ও রহস্যময় মৃতদেহ দেখার দাবি করেছিলেন। এমনকী, ১৯৬৭ সালে তিন স্বাধীনতা সংগ্রামী বিনয়, বাদল, দীনেশের মূর্তি স্থাপনের সময়ে এক ইউরোপীয়কে মুখ্যমন্ত্রীর দফতর থেকে বেরিয়ে এসে হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে দেখা গিয়েছিল বলেও জনশ্রুতি রয়েছে। বিশ্বাস করা হয়, ব্রিটিশ আধিকারিক সিম্পসন এবং তাঁকে হত্যাকারী বিপ্লবীদের আত্মাও নাকি এই বাড়ির আনাচকানাচে ঘুরে বেড়ায়। প্রায় ২০০ বছরের পুরনো এই ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের প্রশাসনিক গুরুত্বের পাশাপাশি তার রহস্যময় ইতিহাস আজও মানুষের কৌতূহল ও আতঙ্কের কারণ।
২. জেনারেল পোস্ট অফিস (জিপিও)
লোকমুখে প্রচলিত, নিঝুম রাতে জিপিও-র বন্ধ দরজার আড়াল থেকে আজও অন্ধকূপ হত্যার বন্দিদের গোঙানি, আর্তনাদ বা কান্নার মৃদু শব্দ শোনা যায়। গভীর রাতে ভবনের বারান্দায় ব্রিটিশ আমলের পোশাক পরা অবয়ব হেঁটে চলে বেড়াতে দেখার দাবিও করেছেন কেউ কেউ।
তা ছাড়াও, নিরাপত্তারক্ষী ও পুলিশ কর্মীদের একাংশের কথায়, মাঝরাতে নাকি কেউ বুট জুতো পরে হেঁটে যান।
জিপিও-র অন্দরে একটি বিভাগ রয়েছে, যাকে 'ডেড লেটার অফিস' বলা হয়। যে সমস্ত চিঠির প্রাপককে খুঁজে পাওয়া যায় না বা যে চিঠিগুলোর ঠিকানা ভুল, তা বছরের পর বছর এখানে জমা হয়ে থাকে। অনেকেরই বিশ্বাস, এই হাজার হাজার না পৌঁছনো চিঠির পিছনে লুকিয়ে থাকা মানুষের আবেগ, দুঃখ ও অতৃপ্ত বাসনাও এই বাড়িটিকে ভৌতিক করে তুলেছে।
৩. পুরনো আকাশবাণী ভবন, গার্স্টিন প্লেস :
বাংলায় ১৯২৭ সালে এই গার্স্টিন প্লেসের বাড়িতেই প্রথম বেতার সম্প্রচারের পথচলা শুরু। পরবর্তীতে যা 'অল ইন্ডিয়া রেডিয়ো' বা আকাশবাণী হিসেবে পরিচিত হয়। এই জায়গায় নাকি একাধিক বার ভূতুড়ে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন অনেকেই। কণ্ঠশিল্পী বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র নিজেও নাকি সাক্ষী ছিলেন এমন এক অলৌকিক ঘটনার। যদিও বর্তমানে এ বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছে। তবে জায়গাটা ঘিরে ভয়ের শিহরণ রয়েই গিয়েছে।
এই বাড়ির ঠিক পাশেই ঐতিহাসিক সেন্ট জনস চার্চ। শোনা যায়, এখানে একটি হাসপাতাল ছিল। শত শত ব্রিটিশ সৈন্য ও সাধারণ মানুষ সেই হাসপাতালে ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য রোগে ভুগে মারা যান। বহু মানুষকে এই চত্বরের পাশেই সমাহিত করা হয়েছিল। সেই কারণেই নাকি এই জায়গাটিতে আজও অতৃপ্ত আত্মাদের ভিড়।
শোনা যায়, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র এবং তাঁর সহকর্মীরা এ বাড়িতে কাজ করার সময়ে একাধিক বার অদ্ভুত সব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁর বর্ণনায় ও স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে, গভীর রাতে দোতলার বারান্দায় এক ইংরেজ সাহেবকে বসে থাকতে দেখার কথা।
অনেকে এ-ও বলেন স্টুডিয়োর ভিতরে বা করিডোরে হঠাৎ করেই এক লম্বাটে চেহারার ইউরোপীয় সাহেবের অবয়ব দেখা যেত, যার নাকি চোখ ছিল না। এই ধরনের এক অভিজ্ঞতার পরে ভয়ে একজন সংবাদপাঠক চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন বলেও লোকমুখে প্রচলিত আছে।
কথিত, এই ভবনেরই এক পিয়ানো বাদক এক সময়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। তার পর থেকে নাকি গভীর রাতে চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে এলে পরিত্যক্ত অফিসঘর থেকে পিয়ানোর সুর ভেসে আসতো।
পরবর্তীতে কলকাতার এই বেতার কেন্দ্রটি ইডেন গার্ডেন্সের কাছের বর্তমান 'আকাশবাণী ভবন'-এ স্থানান্তরিত হয়।
আদতে এই ঘটনাগুলো কতটা সত্যি এবং মিথ্যে এই নিয়ে বিবাদ আছে। আছে দেদার যুক্তি-তর্ক। তবু গল্পের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ঘটনাগুলোকে একেবারে উপেক্ষা করা যায় কী?
বৈজ্ঞানিক কোনও প্রমাণ বা বাস্তব ভিত্তি নেই হয়তো। তবু ভয় আছে, আছে গা শিরশিরানি। সেটুকুই না হয় উপভোগ করলেন!
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।