সে বার ঢাকে কাঠি পড়ার আগেই আমরা বেরিয়ে পড়েছিলাম রোড-ট্রিপে। গন্তব্য ওড়িশার বৌদ্ধবিহার ও মঠ– যার চটজলদি নাম ডায়মন্ড ট্রায়াঙ্গল।
রত্নগিরি, উদয়গিরি আর ললিতগিরির সঙ্গে বাড়তি পাওনা হিসেবে ছিল এক দিনের ভিতরকণিকা দর্শন— এক ফরেস্ট রেঞ্জার বন্ধুর আতিথেয়তায়। ভাবিনি একই সফরে এক দিকে হাজার বছরের পুরনো বৌদ্ধ বিহার আর অন্য দিকে ম্যানগ্রোভের জলে কুমির- এমন অদ্ভুত যুগলবন্দিও হতে পারে!
এ বছর পুজোর ছুটিতে কোথায় যাবেন, তা কি এর মধ্যেই ঠিক হয়ে গিয়েছে? তা না হলে, আমাদের এই বেড়ানোর গল্পটা মাথায় রাখতেই পারেন। এক অন্য স্বাদের সফর হয়ে উঠতেই পারে কিন্তু।
আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল রত্নগিরি। এক সময়ে এটি ছিল মহাযান ও বজ্রযান বৌদ্ধচর্চার অন্যতম কেন্দ্র। ইটের তৈরি অতিকায় বিহার ও মহাস্তূপের পাশাপাশি দেখতে পাবেন পাথরের কারুকাজ করা সারি সারি ভোটিভ স্তূপ অর্থাৎ মানত করে বানানো যে ছোট স্তূপ; সব মিলিয়ে জায়গাটা যেন একটা পরাবাস্তব সিনেমার সেট। সবুজ মাঠের মধ্যে এত পুরনো প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ ফটোগ্রাফির জন্য চমৎকার!
চিত্র: রত্নগিরি, চিত্রগ্রাহক: ড্যানিয়েল লিমা
এর পরে উদয়গিরি। সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে গড়ে ওঠা এই বৌদ্ধ বিহার প্রথমে মহাযান ও পরে বজ্রযান ধর্মচর্চার অন্যতম কেন্দ্র ছিল। সূর্যাস্তের সময়ে পাহাড়ের ঢালে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা বিহার, স্তূপ, ভাস্কর্য দেখে ভাবাই যায় না যে, এই নির্জন জায়গাটাই একদিন মুখরিত ছিল গুরু-শিষ্য-সন্ন্যাসী আর তীর্থযাত্রীদের ভিড়ে।
তিনটি বিহারের মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো বলে মনে করা হয় ললিতগিরিকে। পাহাড়ের উপরের স্তূপ, বিহারের ধ্বংসাবশেষ আর প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহশালা দেখতে দেখতে মনে হতেই পারে, ইতিহাস এখানে যেন এক জীবন্ত রহস্য হয়ে উঠেছে। আশির দশকে আবিষ্কৃত একটি রেলিক কাসকেট এর রহস্যময়তা যেন আরও খানিক বাড়িয়ে দেয়।
চিত্র: রত্নগিরি, চিত্রগ্রাহক: ড্যানিয়েল লিমা
তবে আমাদের গল্পের ট্যুইস্ট এর পরেই। বৌদ্ধ বিহার থেকে আমরা গাড়ি চালিয়ে পৌঁছে গেলাম সোজা কুমিরের ডেরায়। দৃশ্যপট বদলে গেল নিমেষে - চারপাশে এখন শুধু ম্যানগ্রোভ, কাদার চর, খাঁড়ি আর গাছপালায় ঢাকা নদীর আঁকিবুকি।
বোট সফরের সময়ে গাইড অদূরে চরে পড়ে থাকা একটা পুরোনো শ্যাওলা ধরা গাছের গুঁড়ির দিকে ইশারা করলেন। ব্যাপারটা কী বুঝতে চেষ্টা করছি, এমন সময়ে সেই গুঁড়ি যেন চোখের পাতা ফেলল বলে মনে হল না? ব্যস, বোটের সকলে নিমেষে কুমির বিশেষজ্ঞ; এক জন তো বলেই উঠলেন, “আগেই জানতাম, তাই ডান দিকের সিটটা নিয়েছিলাম।” রোদে টানটান কুমির ছাড়াও হরিণ, বুনোশুয়োর, ফিশিং ক্যাট, ম্যাকাক, ডলফিন আর নানা জাতের পাখি দেখতে পেয়েছিলাম সে দিন। আর আমাদের নৌকো যতই খাঁড়ির ভিতরের দিকে এগোচ্ছিল, ততই যেন মনে হচ্ছিল গা ছমছমে এক আদিম পৃথিবী এই বুঝি আমাদের গ্রাস করে নেবে! সে অভিজ্ঞতা ভোলা সত্যিই কঠিন!
চিত্র: ললিতগিরি, চিত্রগ্রাহক: এম মোহান্তি
কী ভাবে যাবেন?
আমরা কলকাতা থেকে গাড়ি নিয়ে গেছি। এতটা পথ ড্রাইভ করে যেতে না চাইলে ট্রেন বা ফ্লাইটে ভুবনেশ্বর পৌঁছে সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করতে পারেন। ডায়মন্ড ট্রায়াঙ্গল ভুবনেশ্বর থেকে মোটামুটি ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে।
কোথায় থাকবেন?
দিনপিছু ২,০০০ থেকে ৬,০০০ টাকা বাজেট রাখলে ভাল। হোটেল, গেস্টহাউস, নেচার ক্যাম্পের পাশাপাশি দামি রিসর্ট আর প্রিমিয়াম টেন্টও আছে। সে ক্ষেত্রে খরচ বাড়বে। পুরো ডায়মন্ড ট্রায়াঙ্গল ঘোরার জন্য গাড়ি ভাড়া করে নেওয়াই সবচেয়ে সুবিধের। ভিতরকণিকায় গিয়ে যেন গাড়িতে বসে থাকবেন না; বোট সাফারি না করলে কিন্তু অ্যাডভেঞ্চারটাই মিস। আর হ্যাঁ, নদীর পাড়ে গাছের গুঁড়ি পড়ে থাকতে দেখলে ঠেস দিয়ে বসার আগে ভাল করে দেখে নেবেন, তার চোখের পাতা পড়ে কি না!
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।