Health Partner
Comfort Partner
Knowledge Partner

সিরাজের শেষ স্মৃতি থেকে মীরজাফরের দেউড়ি, এই পুজোয় বাংলার এই জেলায় ঘুরতে গেলে আর কী কী দেখতে ভুলবেন না?

পুজোর ছুটিতে তিন-চার দিনের জন্য ঘুরে আসবেন নাকি বাংলার পুরনো রাজধানীতে? শুধু ইতিহাস নয়। সঙ্গে থাকছে খানিক নবাবি মেজাজ, নদীর বুকে সোনাঝরা সূর্যাস্ত আর বিরিয়ানি-ছানাবড়ায় জমাটি রসনাতৃপ্তি।

বিশ্বজ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৬:১৮
চিত্র: রাজশ্রী সেন

চিত্র: রাজশ্রী সেন

পলাশির প্রান্তর, সিরাজ-উদ-দৌল্লা, মীরজাফর আর বঙ্কিমচন্দ্র— স্কুলের ইতিহাস বইতে থাকা নামগুলো যদি হঠাৎ প্রাসাদ, কবর, আমবাগান আর কালীমন্দির হয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়? মুর্শিদাবাদের মজাটা এখানেই। পুজোর ছুটিতে তিন-চার দিনের জন্য ঘুরে আসবেন নাকি বাংলার পুরনো রাজধানীতে? শুধু ইতিহাস নয়। সঙ্গে থাকছে খানিক নবাবি মেজাজ, নদীর বুকে সোনাঝরা সূর্যাস্ত আর বিরিয়ানি-ছানাবড়ায় জমাটি রসনাতৃপ্তি।

কলকাতায় প্যান্ডেলের লাইন আর শহরজুড়ে লাগাতার হইচই যদি একটু বেশিই মনে হয়, তা হলে পালানোর ঠিকানা হিসেবে মুর্শিদাবাদ কিন্তু বেশ মনের মতো। ঘরের কাছেই, অথচ পৌঁছলে মনে হয় চেনা শহর আর সময়টাকে অনেক দূরে ফেলে এসেছি।

দিন চারেকের ছুটিতে আমরা কলকাতা থেকে রওনা দিয়েছিলাম গাড়ি নিয়ে। সন্ধের মুখে পৌঁছলাম যখন, ইতিহাস দর্শনের সুযোগ নেই। অতএব চলো খাগড়া বাজার, সিল্ক কিনতে। জীবনে প্রথম মসলিন চাক্ষুষ করে মন জুড়োলো। ছুঁয়ে দেখলে বুঝতে মোটেই অসুবিধে হয় না, কেন একে উওভেন এয়ার বা হাওয়া বোনা কাপড় বলা হয়। ভাবতে ভাল লাগে, সেই কোন যুগ থেকে মসলিন আজও আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে থেকে গিয়েছে।

আসলে মুর্শিদাবাদে এ ভাবেই ইতিহাসের মধ্যে আজকের সময় বার বার ঢুকে পড়ে। হাজারদুয়ারি কিংবা ইমামবড়া। কাটরা মসজিদ থেকে নশিপুর। ইতিহাস এখানে বইয়ের পাতায় নেই, দাঁড়িয়ে আছে বাস্তবের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে।

ঘোরাঘুরির পালা শুরু করেছিলাম পরদিন সকাল থেকেই। আমাদের মতো আপনাদের সফরের শুরুটাও হতে পারে হাজারদুয়ারি থেকে। ১৮৩৭-এর এই বিশাল প্রাসাদে সারি সারি দরজা, লম্বা করিডর। মিউজিয়াম জুড়ে ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা অজস্র অস্ত্র, ছবি ও নবাবি আমলের স্মারক। সিরাজের তলোয়ার আর আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরির এক প্রাচীন প্রতিলিপিও তাদের সংগ্রহে আছে।

সামনেই নিজামত ইমামবড়া। আগের ইমামবড়া আগুনে পুড়ে যাওয়ার পরে ১৮৪৭ সালে তৈরি এই বিশাল স্থাপত্য আজও মুর্শিদাবাদের নবাবি দাপটের অন্যতম সেরা নিদর্শন।

কাটরা মসজিদের ইতিহাসও টানটান উত্তেজনায় ভরা। মুর্শিদাবাদের প্রতিষ্ঠাতা মুর্শিদকুলি খান শায়িত আছেন প্রবেশপথে সিঁড়ির নীচে।

আছে নমক হারাম দেউড়ি। সিরাজ-হত্যার স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই নামই বলে দেয়, আড়াইশো বছর পার করেও মুর্শিদাবাদ কেন ক্ষমা করেনি মীরজাফরকে।

তার পরে কাঠগোলা ও নশিপুর প্যালেসে ঢুঁ মেরে চলে যেতে পারেন জগৎ শেঠের বাড়িতে। বিপুল প্রভাবশালী, সেকালের ব্যাঙ্কার পরিবারের এই বাড়ি এখন মিউজিয়াম। প্রাচীন মুদ্রা, মসলিন, জমকালো পোশাক ও পারিবারিক জিনিসপত্রই বুঝিয়ে দেয়, নবাবদের পাশাপাশি এঁদেরও কতখানি প্রতিপত্তি ছিল সে সময়ে।

কাঠগোলা প্যালেস

কাঠগোলা প্যালেস

বিকেলের দিকটায় ফুরফুরে হাওয়ায় জিরিয়ে নিতে ঘুরে আসতে পারেন মতিঝিল। ভাগীরথীর পুরনো গতিপথ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তৈরি হওয়া এই অশ্বক্ষুরাকৃতি ঝিল এখন সবুজে ঘেরা। পার্ক, বোটিং-এর ব্যবস্থা, সবই আছে সেখানে।

ফেরিতে ভাগীরথী পেরিয়ে পশ্চিমে শান্ত, স্নিগ্ধ খোশবাগ। সিরাজ-উদ-দৌল্লা ও আলিবর্দি খাঁয়ের এই সমাধিক্ষেত্র অতীতে ছিল এক বাগান। সেখানে নাকি ১০৮ রকমের গোলাপ ফুল ফুটত। হাতে সময় থাকলে এবং সদলবলে বেড়াতে গিয়ে থাকলে সন্ধের মুখে ভাগীরথীতে নৌবিহার, সূর্যাস্তের পটভূমিতে পিকনিক, দুটোই কিন্তু জমে যাবে। তবে হ্যাঁ, ভুলেও আমাদের মতো বড় গাড়ি নিয়ে ঘুরপথে যাওয়ার ভুলটা করবেন না। ফিরতি পথে পাশাপাশি দুটো দেশি নৌকো জোড়া পাটাতনের উপরে গাড়ি চাপিয়ে চওড়া নদী পেরোনো শহুরে বাবুদের মনে ভয় ধরাতে যথেষ্ট!

কাশিমবাজার ছোট রাজবাড়ি

কাশিমবাজার ছোট রাজবাড়ি

ফেরার সময়ে বাজারে পাশাপাশি চোখে পড়েছিল ‘সিরাজ লজ’ আর ‘হেস্টিংস ভাতের হোটেল’। কয়েকশো বছরের ব্যবধানে ইতিহাসের দুই দোর্দণ্ডপ্রতাপ চরিত্র মুর্শিদাবাদের বাজারে খদ্দের টানার লড়াইয়ে নেমে পড়েছেন দেখে মজাই লেগেছিল বেশ!

হাতে আর একটা দিন থাকলে গাড়ি নিয়ে চলে যেতে পারেন লালগোলা। পুরনো রাজবাড়ি এখন খোলামেলা সংশোধনাগার। স্থানীয় ইতিহাস ও জনশ্রুতি বলে, এই রাজপ্রাসাদ, লাগোয়া গেস্ট হাউস এবং কালীমন্দিরে বসেই নাকি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন ‘আনন্দমঠ’। বন্দেমাতরম স্থান পেয়েছিল এই উপন্যাসে। এ বিষয়ে যদিও নানা মুনির নানা মত। তবে ইতিহাসের সঙ্গে একটু রহস্য মিশে থাকলে ক্ষতি কী?

লালগোলা কালীমন্দির

লালগোলা কালীমন্দির

আর হ্যাঁ, মুর্শিদাবাদি বিরিয়ানি স্বাদে কলকাতার চেনা বিরিয়ানির থেকে আলাদা। মিষ্টির তালিকায় থাক জিআই স্বীকৃত ছানাবড়া। চেখে দেখতেই পারেন। মুর্শিদাবাদ কিন্তু মন ভরানোর পাশাপাশি পেট ভরাতেও তৈরি!

যে ভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে ট্রেনে ৩–৪ ঘণ্টার পথ। গাড়িতেও যাওয়া যায়, দূরত্ব প্রায় ২০০ কিলোমিটার।

থাকার ব্যবস্থা: সাধারণ বা হেরিটেজ হোটেল, লজ, গেস্টহাউস, হোমস্টে— সব রকমই পাবেন। কাশিমবাজার প্যালেস বা বড়ি কোঠির মতো ঐতিহাসিক বাড়িতে থাকার ব্যবস্থাও আছে, তবে তার খরচ বেশি।

খরচাপাতি: পরিকল্পনার হেরফেরে দু’জনের তিন রাতের সফর, যাতায়াত-থাকা-খাওয়া-ঘোরাঘুরি মিলিয়ে মোটামুটি পনেরো থেকে পঞ্চাশ হাজারের মধ্যে করে ফেলতে পারবেন।

এই প্রতিবেদনটি 'আনন্দ উৎসব' ফিচারের একটি অংশ।

Murshidabad Durga Puja

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy