পুজো আসছে আসছে ব্যাপারটাই ভাল। যেই এসে যায়, ওমনি হুড়মুড়িয়ে শেষ! দশমীর দিনটা পেরোতে না পেরোতেই কেমন যেন একটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে, তাই না? প্যান্ডেল নেই, ঢাকের বাদ্যি নেই, রাত জেগে ঠাকুর দেখার অজুহাত নেই। এ দিকে, ছুটি অবশ্য জমানো আছে। তা হলে আর কী! কয়েকটা দিনের জন্য বেরিয়ে পড়লেই তো হয়!
ব্যাগ গুছিয়ে দিন দশেকের জন্য রওনা দিন কেরালার দিকে। যেখানে একদিন পাহাড় বেয়ে মেঘ নামবে, আর এক দিনে ঘুম ভাঙবে হাউসবোটের জানলার বাইরে জলের ছলাৎ ছল শব্দে।
কোচি পৌঁছে প্রথম দুটো দিন কাটুক ফোর্ট কোচিতে। সেকেলে বাড়ি, রঙিন দরজা, দেওয়ালজোড়া ছবি-গ্রাফিটি, ছোট ক্যাফে আর সমুদ্রের নোনা হাওয়া— এ জায়গার মেজাজটাই আলাদা। মাছ ধরার জালের মধ্যে দিয়ে কিছু ক্ষণ সমুদ্রের ঢেউ গোনার পরে অলি গলি ঘুরে গিয়ে বসুন পছন্দের কোনও রেস্তোরাঁয়। মুচমুচে মালাবার পরোটা আর মশলাদার হাঁসের মাংস। মানে যাকে বলে জবরদস্ত লাঞ্চ! বিকেলে চায়ের বদলে কড়া কফি আর গরম এগ পাফ পেলে তো কথাই নেই। স্থানীয়দের জিজ্ঞাসা করে জেনে নিন, কোন দোকানের পাফ সেরা।
তৃতীয় দিন সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ুন মুন্নারের পথে। শহর ছাড়িয়ে রাস্তা যত পাহাড়ের দিকে উঠবে, তত বাড়বে সবুজের আধিপত্য। পাহাড়ের গায়ে সাজানো সারি সারি চা, এলাচ আর গোলমরিচের বাগান। দূরে কুয়াশা আর বাতাসে ভেজা পাতার গন্ধ— সব মিলিয়ে এক অচেনা মাধুর্য মন ভরিয়ে দেবে। মনে হবে সফরটা আর একটু লম্বা হলে ক্ষতি কী ছিল! মুন্নারের জন্য রাখুন দুটো দিন। চা-বাগান, হরেক মশলার বাগান, ভিউপয়েন্ট আর জলপ্রপাতের দৃশ্য আপনার সব শহুরে শ্রান্তি দূর করে মনটা ফুরফুরে করে দেবে। দামি রিসর্টের বদলে শহরের বাইরে হোমস্টে বা ছোট গেস্টহাউস বেছে নিতে পারেন। তাতে খরচ কমবে।
পঞ্চম দিন চলুন থেক্কাডির দিকে। এখানেই পেরিয়ার বনাঞ্চল। মুন্নারের চা-বাগানের খোপকাটা সবুজ থেকে এ বার ঢুকে পড়বেন বনের ঘন কালচে সবুজের রাজ্যে। পেরিয়ার লেকের আশপাশের বন, পশুপাখি, গাছের ফাঁকে আলো-ছায়ার খেলা যেন একটানে অন্য রকম জগতে নিয়ে গিয়ে ফেলে। জঙ্গল সাফারিতে যেতে পারেন, বাঘ যদি না-ও দেখতে পান, হাতি আর হরেক পাখির দেখা মিলবেই। পেরিয়ারে এক রাত থাকুন, যাতে পরদিনও জঙ্গলের আদিম সৌন্দর্য উপভোগ করার মতো সময় হাতে থাকে। ডিনার টেবিলে এক দিন চেখে দেখতে পারেন গরম তুলতুলে আপম আর মীন কারি, মানে কেরলের মশলাদার মাছের ঝোল। স্থানীয় কোনও খাবারের দোকানে এই জুটি পেয়ে যাবেন ঠিক।
সপ্তম দিন রওনা দিন আলাপ্পুঝার পথে। পৌঁছেই মনে হবে শহরটার গতি যেন কেউ রিমোট টিপে কমিয়ে দিয়েছে। ব্যাক ওয়াটার্স, দু’পাশে নারকেল গাছ, নানা কিসিমের নৌকা আর হাউস বোট দেখে ভাবতেই পারেন, এ শহর বুঝি সব সময়েই আধোঘুমে থাকে। কোথাও বাড়ির উঠোনে শুকোচ্ছে মাছ, কোথাও ছোট নৌকোয় স্কুল থেকে ফিরছে বাচ্চারা। আর হ্যাঁ, এখানেই হবে সেই হাউসবোটের রাত্রিযাপন, ছবিওয়ালা পোস্টকার্ডে যে ছবি দেখেই প্রথম কেরালা যাওয়ার সাধ জাগে!
বিকেলের দিকে নৌকো খাল ছেড়ে বিস্তৃত ব্যাকওয়াটার্সে ভেসে যাবে নৌকো। এলোমেলো হাওয়া ঘেরা ডেকে গিয়ে বসুন ঠান্ডা পানীয়ের গ্লাস হাতে। জল, আকাশ আর দূরের গ্রাম ছবির মতো জড়িয়ে থাকবে আপনার চারপাশটাকে। দেখবেন সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গেই কেমন চারপাশের ক্যানভাসের রং বদলে যায়! রাতের খাওয়া-থাকাও নৌকোয়। জলের উপর ভাসতে ভাসতে সে রাতের স্মৃতি কলকাতায় ফিরেও মনে থেকে যাবে বহু দিন।
অষ্টম দিন আলাপ্পুঝা থেকে কোভালাম। পথ একটু লম্বা। তবে সন্ধের আগে পৌঁছতে পারলে দেখতে পাবেন আরব সাগরের বুকে কেমন সোনা গলিয়ে সূর্য ডুবছে।
পরের দিনটা রাখুন কোভালম বিচের জন্য। সমুদ্রের জলের চিকচিকে ফোঁটা মেখে হোক প্রাতরাশ। চুমুক দিন ধোঁয়া ওঠা মালাবার কফিতে। ততক্ষণে নিশ্চয়ই ভিজে বালিতে ঝিনুক কুড়িয়ে পকেট ভর্তি! আর সুযোগ পেলে দু-দণ্ড গল্প করে নিন জেলেদের সঙ্গেও। ছুটির শেষ বেলায় শরীর আর মন— দুটোকেই একটু বিশ্রাম দিন। সেইসঙ্গে ঝোলায় ভরে নিন স্মৃতি আর গল্পের পসরা। পরের দিন তিরুঅনন্তপুরম থেকে ফিরতি ট্রেন বা বিমানের ব্যবস্থা করতে পারেন; কলকাতায় ফেরার টিকিট আগে থেকে কেটে রাখাই ভাল।
খরচাপাতি:
ট্রেনে গেলে থাকা-খাওয়া ঘোরাঘুরি মিলিয়ে দু’জনের খরচ মোটামুটি ৫০ হাজার টাকার মতো। বিমানে গেলে প্রায় ৭৫ হাজার বা তার একটু বেশি।
কলকাতায় ফিরে মন খারাপ হলে আর পুরনো অ্যালবাম ঘাঁটতে হবে না। কেরালার টাটকা স্মৃতি, নীল সবুজ অরণ্যে আর সমুদ্রের হাওয়ায় হারিয়ে যান দেখি!
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।