বুধবার রাতে এসএফআই এবং অন্য বাম ছাত্র সংগঠনগুলির সঙ্গে এবিভিপি-র সংঘর্ষে উত্তপ্ত হয় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর। সেই ঝামেলার রেশ চলছে বৃহস্পতিবার সকালেও। ২০ অগস্ট সকাল ১১টা থেকে বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছিল দুই পক্ষের তরফে। এর মধ্যে দায়ের করা হয়েছে একটি এফআইআর-ও।
বুধবার মধ্যরাতে দক্ষিণ কলকাতার বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে যাদবপুর থানায় এফআইআর দায়ের করেন কম্পিউটার সায়েন্স ইঞ্জিনিয়ারিং-এর তৃতীয় বর্ষের ছাত্র অরিত্র সরকার। এফআইআরে আইপিসি ও এসসি-এসটি আইনের একাধিক ধারায় ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানো হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী উপাচার্যের পুলিশি সহায়তার আবেদনের ভিত্তিতে পুলিশ ক্যাম্পাসে ঢুকে বহিরাগতদের বার করে দেয় বলেই জানা গিয়েছে ।
অন্য দিকে, বৃহস্পতিবার সকালে দুই সংগঠনের তরফেই বিক্ষোভ কর্মসূচি ছিল। ডেমোক্রেটিক স্টুডেন্ট ফেডারেশনস্-এর (ডিএসএফ) সদস্যেরা যাদবপুর এইটবি থেকে মিছিল শুরু করেন। অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের (এবিভিপি) পাল্টা মিছিল শুরু হয় গোলপার্ক থেকে। অশান্তির আঁচ আগেই করা হয়েছিল। তাই বিশাল পুলিশবাহিনীর সঙ্গে কেন্দ্রীয় বাহিনীও মোতায়েন করা ছিল ওই এলাকায়। তবে, এসএফআই-এর মিছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যাওয়ার মূল রাস্তায় ওঠার আগেই পুলিশ আটকে দেয়। অন্যদিকে, গোলপার্ক থেকে এবিভিপি-র মিছিল শুরু হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চার নম্বর গেট পর্যন্ত যাওয়ার কথা এই মিছিল। তবে, সম্ভবত যাদবপুর থানা পর্যন্ত যাওয়ার পরেই পুলিশের তরফে সেই মিছিল আটকে দেওয়া হতে পারে। এসএফআই হুঁশিয়ারি দিয়েছে, এবিভিপি-র মিছিল যদি যাদবপুর থানার দিক থেকে এগিয়ে ক্যাম্পাসের দিকে যায় ,তা হলে তারা সেটা মেনে নেবে না।
ইতিমধ্যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব গেটে তালা মেরে দেওয়া হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের তরফে। জানা গিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের চার নম্বর গেট-এর উল্টো দিকে বিজেপি কর্মীরা জমায়েত শুরু করেছেন।
সিপিএম নেত্রী দীপ্সিতা ধর রয়েছেন এই বিক্ষোভ কর্মসূচিতে। বিধায়ক শর্বরীকে আক্রমণ করে তিনি বলেন, ‘‘বিধায়কের প্ররোচনায় এই ঘটনা ঘটেছে। জিবি মিটিং বেআইনি নয়। প্রথম থেকে ঝামেলা অশান্তি করার চেষ্টা করেছে। যাঁরা ভোট দিয়ে বিজেপিকে নিয়ে এসেছেন, আমি তাঁদের বলব, দেখুন কোন আপদকে সরিয়ে বিপদকে নিয়ে এসেছেন। এঁরা দা দেখাচ্ছেন, অস্ত্র দেখাচ্ছেন, গতকাল ক্যম্পাসের ভিতরে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এঁদেরকে মানুষ বলা যায় না।’’
পাশাপাশি, এসএফআই-এর রাজ্য সম্পাদক দেবাঞ্জন দে বলেন, ‘‘দিল্লির যন্তর মন্তরে ছাত্র আন্দোলনের জোয়ার দেখে বিজেপি ভয় পেয়ে গিয়েছিল। ছাত্র আন্দোলনের শক্তি বাংলার এবং দেশের পড়ুয়ারা দেখিয়ে দিয়েছে। বিজেপি গুন্ডারা সরকার চালাচ্ছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে আক্রমণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। বিজেপির বিধায়কের উস্কানিতে বিজেপির গুন্ডারা হামলা চালিয়েছে ক্যাম্পাসের ভিতরে। ছাত্রছাত্রীদের মেরে ফেলার চেষ্টা করেছে। এই ঘটনায় ছাত্রেরা কারও মাতব্বরি মানবে না।’’
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক ছাত্র সংগঠন সূত্রে খবর, বুধবার ফ্যাকাল্টি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সাধারণ সভাকে কেন্দ্র করেই দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। দুই পক্ষের সংঘর্ষে আহত বেশ কয়েক জন। রাতেই আহতদের দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায়। ডিএসএফ-এর অভিযোগ অনুযায়ী বুধবার সন্ধ্যা নাগাদ, ক্যাম্পাসের ভিতরে তাদের জেনারেল বডির মিটিং হচ্ছিল, অভিযোগ, সে সময়ে এবিভিপি-র সভাপতি নিখিল দাস এবং আরও দু’জন সেই বৈঠকে গিয়ে তাঁদের উপর চড়াও হন এবং বৈঠক করতে বাধা দেন। সেখান থেকেই শুরু হয় বচসা।
এবিভিপি-র অভিযোগ, সাধারণ সভার নামে পরিকল্পিত ভাবে এসএফআই এবং ডিএসও-ডিএসএফ হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে। আরও অভিযোগ, আক্রমণ করা হয়েছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এবিভিপি সভাপতি নিখিল দাসের উপরেও। এই ঘটনার পর নিখিল কেপিসি মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসাধীন ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে খবর, দুই পক্ষের একাধিক আহত ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তবে, যত রাত বাড়তে থাকে ক্যাম্পাসের ভিতরেও বচসা, ভাঙচুর হতে থাকে।
দর্শন বিভাগের ছাত্র তথা রেভলিউশনারি স্টুডেন্টস ফ্রন্টের সদস্য অভিনব দাস বলেন, ‘‘ফেটসুর সাধারণ সভায় এবিভিপি ও এনএসএফ বেশ কয়েক জন বহিরাগতকে নিয়ে যায়। নিখিল দাস, দীপ্তিমান কর, সোমসূর্য বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ বেশ কয়েক জন মারধর শুরু করে। মারের জেরে অস্মিত সিন্হা ও সায়ক মণ্ডল-সহ বেশ কয়েক জন আহত হয়।’’ তাঁর আরও অভিযোগ, এবিভিপি ও এনএসএফ বেশ কয়েক জন বহিরাগত নিয়ে এসে ইঞ্জিনিয়ারিং, বিজ্ঞান ও কলা বিভাগের বাম মনোভাবাপন্ন পড়ুয়াদের তাড়া করে অরবিন্দ ভবনে আটকে রাখে। ভবনের বাইরে ও ক্যাম্পাসে জ্বালানো হয় আগুন। মারধর করার পাশাপাশি গণপিটুনির চেষ্টা করা হচ্ছিল ও ইট-পাটকেল ছোড়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ। বামেদের তরফে দাবি, এবিভিপি-র সমর্থকেরা মেন গেট ও এক নম্বর, চার নম্বর গেট ভেঙে ক্যাম্পাসের ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করছে। অভিনব অভিযোগ করেন, বুধবার স্বপন দাশগুপ্ত-সহ বেশ কয়েক জন মন্ত্রী এসেছিলেন। তাঁর দাবি, সেই সময় থেকেই ‘রেকি’ করা হচ্ছিল। তিনি বলেন, “এই ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত।” এবিভিপি-র পাল্টা দাবি, থানার বাইরে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দেখানো হয়েছে। কিন্তু ক্যাম্পাসের ভিতরে হামলা বা আগুন লাগানোর অভিযোগ মিথ্যে।