পুরনো প্রথার ভিতে আঘাত হেনে কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে বার্তা বাংলার যে পরিচালকদের ছবিতে
দু’শো বছর আগে সতীদাহ প্রথা বন্ধ করতে ভূমিকা নেন রামমোহন রায়। ১৭০ বছর আগে বিধবা বিবাহ আইন আনতে উদ্যোগী হন বিদ্যাসাগর। সমাজের কুসংস্কার বা ফতোয়া মানেননি তাঁরা। সেই ঐতিহ্যপথ ধরে উদার মানসিকতার দর্শন দেখিয়েছিলেন রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ। বিংশ শতকেও বাঙালি মনন মানেই প্রথাভাঙায় বিশ্বাসী, ‘গুরু’ বা ‘বাবাজি’র ভণ্ডামিতে ঘোর অবিশ্বাসী। সে সাহিত্যেই হোক বা নাটক-সিনেমায়।
এই বাংলা রেনেসাঁর সাক্ষী। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর হয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দের মতো মানুষের উদার মানবিক চিন্তা ও কর্মকাণ্ডের জেরেই বাংলার মাটিতে ও বাঙালির মননেই রয়েছে প্রগতিশীলতা। হিন্দুসমাজে বর্ণপ্রথা ও সতীদাহের মতো মধ্যযুগীয় প্রথার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান রামমোহন। তাঁরই উদ্যোগে ১৮২৯ সালে সতীদাহ ‘নিষিদ্ধ’ করে ব্রিটিশ সরকার। রামমোহন হিন্দুদের মূর্তিপুজোরও ঘোর সমালোচক ছিলেন। তথাকথিত হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী, বিধবাদের পুনর্বিবাহ ছিল ‘ঘোর পাপ’। সেই প্রথা ভেঙেছিলেন বিদ্যাসাগর। তাঁরই অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ১৮৫৬ সালে বিধবা বিবাহ আইন চালু হয়। এ সব কাজের জন্য গোঁড়া হিন্দুদের রক্তচক্ষুর শিকার হয়েছিলেন রামমোহন, বিদ্যাসাগর দু’জনেই। তবে সে সব আক্রমণ হেলায় উড়িয়েছিলেন এই দু’টি মানুষ।
এর পরেও বিংশ শতকে অনেক শিল্পী ও সাহিত্যিক সেই উদার সংস্কৃতির চর্চা করেছেন। কখনও গল্প-উপন্যাসে, কখনও ছবির রেখায়, কখনও বা বাংলা সিনেমা-নাটকে সংকীর্ণতা-বিরোধী, কুসংস্কার-বিরোধী, একই সঙ্গে অন্ধবিশ্বাস-বিরোধী বার্তা উঠে এসেছে। দলমতনির্বিশেষে বাঙালি পাঠক, দর্শক, শিল্পরসিকেরা তা সাদরে গ্রহণ করেছেন, চিরকাল। আজও বাঙালির সেই অভ্যাস নষ্ট হয়নি বলেই বৌদ্ধিক সমাজের অনেকেই বিশ্বাস করেন। বাংলা সিনেমার ইতিহাসেও রয়েছে এমন কিছু মাইলস্টোন, যা সংস্কার-পাশে আবদ্ধ সমাজ, কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে বার্তা দিয়েছে এবং স্বঘোষিত ‘গুরু’ ও ‘বাবা’দের মুখোশ খুলে দিয়েছে। এমনই কিছু ছবির তালিকা রইল।
জিঘাংসা (১৯৫১) অজয় করের তৃতীয় ছবি। আর্থার কোনান ডোয়েলের ‘দ্য হাউন্ড অফ দ্য বাস্কারভিলস’ এবং হেমেন্দ্রকুমার রায়ের ‘নিশীথিনী বিভীষিকা’— এই দু’টি গল্পের মিশেলে তৈরি ‘জিঘাংসা’ তথাকথিত অলৌকিক শক্তির পিছনে সাজানো রহস্য উদ্ঘাটনের কাহিনি। অতিপ্রাকৃতিক কোনও ঘটনার অন্তরালে আসলে যে লুকিয়ে থাকে মানুষেরই লোভ, হিংসা এবং অপরাধমূলক চক্রান্ত, সেটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় ছবির গোয়েন্দা চরিত্র স্মরজিৎ সেন। অন্ধবিশ্বাস বা কুসংস্কারে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস না করে, তার পিছনের সত্যকে যুক্তিবুদ্ধি দিয়ে খোঁজাই মানুষের দায়িত্ব, এই বার্তা দিয়েছেন পরিচালক। ছবিতে অভিনয় করেন বিকাশ রায়, মঞ্জু দে, কমল মিত্র, কানু বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯৬২ সালে বীরেন নাগের পরিচালনায় এর হিন্দি সংস্করণ ‘বিশ সাল বাদ’ মুক্তি পায়। অভিনয় করেন বিশ্বজিৎ ও ওয়াহীদা রেহমান।
দেবী (১৯৬০) ১৮৯৯ সালে প্রকাশিত প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের গল্পটি নিয়ে তৈরি করেন ‘দেবী’। তথাকথিত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও প্রথার অমানবিক দিকটিই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে এই ছবি। কালীভক্ত জমিদার কালীকিঙ্কর স্বপ্নে তাঁর নববিবাহিতা পুত্রবধূকে সাক্ষাত দেবী কালীরূপে দেখতে পান। তার পর পুত্রবধূকেই পুজো করতে শুরু করেন। এতে প্রবল আপত্তি জানায় তাঁর শিক্ষিত পুত্র। শুরু হয়ে পিতাপুত্রের দ্বন্দ্ব। পুত্রবধূ যে ঐশ্বরিক ক্ষমতাসম্পন্ন, সেটা নানা ঘটনায় বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করেন শ্বশুর। শেষপর্যন্ত বিয়োগান্তক পরিণতি দিয়ে শেষ হয় গল্প। সব মিলিয়ে ধর্মীয় গোঁড়ামি, অন্ধবিশ্বাস এবং সর্বোপরি ধর্মের নামে পিতৃতান্ত্রিকতার নগ্ন উন্মাদনার আখ্যান হয়ে ওঠে এই ছবি।
সপ্তপদী (১৯৬১) উত্তম-সুচিত্রা জুটির সবচেয়ে জনপ্রিয় রোম্যান্টিক ছবি হিসেবে মনে করেন বাংলা ছবির রসিকেরা। বক্সঅফিসের নিরিখে তো বটেই, প্রথাভাঙা গল্পেও নতুন দিগন্ত আনে এই ছবি। এক, হিন্দু ব্রাহ্মণ নায়কের সঙ্গে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী নায়িকার প্রেম। দুই, নায়িকাকে বিয়ে করার জন্য নায়কের ধর্ম পরিবর্তন। তিন, এই সম্পর্কের মাঝে নায়কের রক্ষণশীল বাবার পাঁচিল হয়ে দাঁড়ানো। চার, একই সঙ্গে নায়িকার আবিষ্কার যে, তার জন্ম বাবার বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের জেরে গৃহপরিচারিকার গর্ভে। সব মিলিয়ে গল্পের মধ্যে এত সব দুঃসাহসিক কাণ্ড এবং নায়কের বাবার হস্তক্ষেপে নায়ক-নায়িকার দীর্ঘ বিচ্ছেদই এই ছবি দর্শককে শেষ দৃশ্য অবধি বসিয়ে রেখেছিল, সেই ষাটের দশকে।
আরও পড়ুন:
হাঁসুলী বাঁকের উপকথা (১৯৬২) তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে তপন সিংহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছবি। গ্রামের কাহারপাড়ার যুবক করালী আধুনিকমনস্ক। অন্ধবিশ্বাস ও সনাতন সংস্কারের বিরুদ্ধে সে বিদ্রোহী। তার লড়াই গ্রামের মাতব্বর বনোয়ারির সঙ্গে, যে পুরনো নিয়ম, কুসংস্কার ও প্রথাগত জীবনযাত্রাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়। করালী কাহারপাড়ার পুরনো বিশ্বাসে ভাঙন আনতে প্রথমে ‘কত্তাবাবা’র বাহন সাপটিকে পুড়িয়ে মারে। তার পরে বেলতলা ও শ্যাওড়া গাছের বন পরিষ্কার করে। ধীরে ধীরে কাহারদের পুরনো অন্ধবিশ্বাস ও সংস্কারের বদল ঘটায়।
মহাপুরুষ (১৯৬৫) পরশুরামের (রাজশেখর বসু) লেখা ১৯২৭ সালে প্রকাশিত ‘কজ্জলি’ ছোটগল্প সংকলনের ‘বিরিঞ্চিবাবা’ গল্পটি নিয়ে সত্যজিৎ রায় তৈরি করলেন ‘মহাপুরুষ’। এক প্রভাবশালী ভক্তকে স্বঘোষিত ‘গুরু’ বিরিঞ্চিবাবা বলেন, ‘তোমাকে দেখে মনুর কথা মনে পড়ছে।’ ভক্তের প্রশ্ন, ‘কে? মনু চ্যাটার্জী?’ হেসে ওঠেন ভক্তদের কেউ কেউ। মনুর বিবরণ দিতে দিতে বিরিঞ্চিবাবা বলেন, ‘আমাকে এসে (মনু) বলে কী, সংহিতাটা এক বার দেখে দিন। অনেক খেটেখুটে লিখেছি, আপনি না দেখে দিলে তো ভরসা পাচ্ছি না! আমি বললুম, কই দেখি! কী লিখেছ, দেখি! এক লক্ষ শ্লোক! উরে বাবা! এ করেছ কী? এত পড়বে কে, সময় কোথায়? ফেলে দাও ফেলে দাও ফেলে দাও! তিনশো, মাত্র তিনশোটি শ্লোক বাছাই করে দিলুম। দিয়ে বললুম, এগুলো রেখে দাও, কাজে দেবে। বাকিগুলো ফেলে দিলুম।’ এই ভণ্ড বাবাজির বুজরুকি ধরিয়ে দিয়ে তাকে এলাকাছাড়া করেন নিবারণদা, সত্য ও তাঁর সঙ্গীরা। ধর্মের বুজরুকির দিকটি অসামান্য শ্লেষ ও ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে উন্মোচিত হয়েছিল ছবিটিতে। আজও এই গল্প, এই ছবি প্রাসঙ্গিক বলে মনে করেন সচেতন দর্শক।
নিমন্ত্রণ (১৯৭১) বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অরন্ধনের নিমন্ত্রণ’ গল্প নিয়ে তরুণ মজুমদার নির্মাণ করেন ‘নিমন্ত্রণ’। গ্রামবাংলার সমাজের ছবি। ছবিটিতে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও শৈল্পিক উপায়ে বিভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে তৎকালীন গ্রামীণ কুসংস্কার ও গোঁড়া রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ চিত্রায়িত হয়েছে। ছবিতে কুমুদিনী ও তার প্রেমিক হিরুর মধ্যে গভীর ভালোবাসা সত্ত্বেও তাদের বিয়ে সম্ভব হয়নি কোষ্ঠীবিচার, জাতপাত ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানসিকতার কারণে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের চেয়ে কবিরাজি বা ঝাড়ফুঁকের উপর অন্ধবিশ্বাসকে কটাক্ষ করা হয়েছে।
গণদেবতা (১৯৭৮) গ্রামীণ মানুষের সংগ্রাম ও মানবিকতার মর্মস্পর্শী দলিল তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘গণদেবতা’। সেটাই পর্দায় স্বকীয় ভঙ্গিতে তুলে আনেন তরুণ মজুমদার। এই গল্পে গ্রামসমাজের শোষণ-বঞ্চনার সঙ্গে সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের কথা যেমন উঠে এসেছে, তেমনই সমাজের কুসংস্কার, মানুষের স্বার্থপরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদও করেছে দেবু ঘোষ, জগন ডাক্তারের মতো কয়েকটি চরিত্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ববর্তী গ্রাম ভারতের এ এক অসামান্য আখ্যান।
আরও পড়ুন:
সদ্গতি (১৯৮১) মুন্সি প্রেমচন্দের বিখ্যাত ‘সদগতি’ ছোটগল্পটি ১৯৩০ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে ভারতীয় সমাজের গভীরে যে জাতপাত, অস্পৃশ্যতা, কুসংস্কারের শিকড় ছড়িয়ে আছে, তারই এক নির্মম ছবি তুলে ধরেছিলেন প্রেমচন্দ। সেই গল্পটিই সত্যজিৎ রায় চিত্রায়িত করলেন হিন্দিতে, তাঁর নিজস্ব চলচ্চিত্রীয় ভঙ্গিতে। তথাকথিত নিচু জাত চামার সম্প্রদায়ের যুবক দুখি কী ভাবে এক ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ঘাসিরামের শোষণের শিকার হয় ও মারা যায় এবং শেষপর্যন্ত তার মৃতদেহের সদ্গতি কী অমানবিক ভাবে সম্পন্ন হল— এই ছবি তারই জ্বলন্ত কাহিনি।
দেবশিশু (১৯৮৫) উৎপলেন্দু চক্রবর্তীর গুটিকয়েক ছবির মধ্যে অন্যতম আলোচিত এই ‘দেবশিশু’। এক বন্যায় আশ্রয়হীন হয়ে হতদরিত্র এক দম্পতি আশ্রয় পান এক আত্মীয়বাড়ির গোয়ালঘরে। সেখানেই তাদের একটি শারীরিক ত্রুটিযুক্ত পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। গ্রামের রক্ষণশীল ও ভণ্ড এক পুরোহিত শিশুটিকে ‘অভিশপ্ত’ বলে ঘোষণা করে এবং সমাজ থেকে পরিবারটিকে বহিষ্কারের ভয় দেখিয়ে শিশুটিকে বর্জন করতে বাধ্য করে। পরে এক মেলায় সেই দম্পতি আবিষ্কার করেন, তাঁদের পরিত্যক্ত সন্তানটিকে অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ‘দেবশিশু’ সাজিয়ে বুজরুকির ব্যবসা ফাঁদা হয়েছে। অস্পৃশ্যতা, কুসংস্কার আর অন্ধবিশ্বাস কী ভাবে দরিদ্র মানুষের উপর অত্যাচারের অস্ত্র হতে পারে— এই ছবি তার নিখুঁত দৃষ্টান্ত।
অন্তর্জলি যাত্রা (১৯৮৭) কমলকুমার মজুমদারের গল্প ‘মহাযাত্রা’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৯ সালে, কৃত্তিবাস পত্রিকায়। তিন বছর পরে গ্রন্থাকারে। সেই গল্পই ‘অন্তর্জলি যাত্রা’ নামে ছবি করেন গৌতম ঘোষ। ছবির কাহিনির বিষয়বস্তু নামেই আন্দাজ করা যায়। এ দেশে উনবিংশ শতকের এক কুপ্রথা, যেখানে ম়ৃত্যুপথযাত্রী কোনও মানুষকে গঙ্গার তীরে জলের কাছে রেখে দেওয়া হত, যাতে গঙ্গার পবিত্রতার স্পর্শ নিয়ে সেই ব্যক্তির স্বর্গপ্রাপ্তি হয়। গল্পে রয়েছে, আরও এক কুপ্রথার শিকার এক তরুণী, যাকে তার ব্রাহ্মণ বাবা পুণ্যলোভের আশায় ও হিন্দুশাস্ত্রের বিধান মেনে সেই মরণোন্মুখ বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের সঙ্গে বিয়ে দেন। গঙ্গাতীরে জোয়ারের জলে বৃদ্ধ ও সেই তরুণী ডুবে যায়। প্রতিবাদ ও চেষ্টা করেও ওই বিয়ে আটকাতে এবং ওই তরুণীকে বাঁচাতে ব্যর্থ হয় সংলগ্ন শ্মশানের চণ্ডাল বাইজু। সে তরুণীকে উদ্ধার করতে চায়।
সতী (১৯৮৯) গল্পের সময়কাল উনবিংশ শতকের প্রথমার্ধ, সতীদাহ প্রথা বিরোধী আইন যে বছর চালু হয়, তার দু’বছর আগে। ছবির শুরুতেই রয়েছে এক কিশোরী বিবাহিতাকে সতী হিসেবে দাহ করার দৃশ্য। ছবিতে উমা নামে এক ব্ৰাহ্মণ কন্যা মূক ও অনাথ বলে তাঁর বিয়ে নিয়ে চিন্তায় মামাবাড়ির লোকজন। তার কোষ্ঠীতে নাকি অমঙ্গলসূচক লক্ষণ। তাই কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে উমার বিয়ে দেওয়া হয় একটি গাছের সঙ্গে। স্থানীয় এক শিক্ষকের যৌন-শিকার হয়ে সে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে সে আরও ব্রাত্য ও লাঞ্ছিত হয়। শেষে এক ঝড়বৃষ্টির রাতে স্বামীরূপী সেই গাছের পাশে দাঁড়ায় উমা, আর তখনই গাছটির উপর বজ্রপাতের জেরে মারা যায় সে।
গণশত্রু (১৯৯০) নরওয়েজ়িয়ান নাট্যকার হেনরিক ইবসেনের ‘দি এনিমি অফ দ্য পিপ্ল’ অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় তৈরি করলেন ‘গণশত্রু’। ছবির মূল বিষয়ই হল বিজ্ঞানের সঙ্গে কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের দ্বন্দ্ব। দ্বন্দ্বের একপক্ষ এক শহরের এক ডাক্তার এবং অন্যপক্ষ তার ভাই তথা পুরসভার চেয়ারম্যান। স্থানীয় মন্দিরের প্রতিমার চরণামৃত জল খেয়ে অসুস্থ শহরের অনেক বাসিন্দা। ডাক্তার চান মন্দির বন্ধ রেখে অসুস্থদের চিকিৎসা। অন্য দিকে, চেয়ারম্যান ভাই তাতে নারাজ। কারণ, মন্দির বন্ধ থাকলে সংশ্লিষ্ট নানা ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। তাতে আখেরে ক্ষতি পুরসভারই। অন্ধ ধর্মীয় সংস্কার ও স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাবে সত্য ও বিজ্ঞানকে অস্বীকারের চেষ্টা এবং এক বিবেকবান মানুষের আপসহীন সংগ্রামই এই ছবির উপজীব্য।
লক্ষ্মীছেলে (২০২২) কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় পরিচালিত এই ছবিটিতে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বার্তা দেওয়া হয়েছে। ছবিতে দেখানো হয়েছে, এক নবজাতক শিশুর চারটি হাত থাকায় তাকে এক দল মানুষ ‘অলৌকিক শক্তি’র রূপ বলে পুজো করতে শুরু করে এবং তাকে পুঁজি করে ব্যবসা শুরু হয়। তিন তরুণ ডাক্তার কী ভাবে এই অমানবিক প্রথার বিরুদ্ধে ও বিজ্ঞানের সমর্থনে লড়াই চালায়, তা এই ছবির মূল গল্প।
পুতুলনাচের ইতিকথা (২০২৫) মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস মানেই সমাজসচেতনতার জ্বলন্ত আখ্যান। তাও আবার ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ববর্তী সময়ে প্রকাশিত এই উপন্যাসকেই সুমন মুখোপাধ্যায়ের মতো রাজনৈতিক সচেতন নাট্য ও চলচ্চিত্র পরিচালক বেছে নেন, তখন তা অন্য মাত্রা পায়। ছবির মূল বিষয়ই হল গ্রামবাংলার কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস বনাম আধুনিক ভাবনার লড়াই। সেই লড়াই করতে গিয়ে নানা বাধার শিকার হয় গল্পের প্রধান চরিত্র শশী ডাক্তার।