কেন্দ্রীয় কমিটির ৩৩ জনকে ‘গলাধাক্কা’, ১৬ সেনাকর্তাকে বহিষ্কার! কুর্সি রাখতে দলেই ‘গুন্ডাগিরি’ চালাচ্ছেন জিনপিং
আগামী বছরে (২০২৭ সাল) জাতীয় কংগ্রেসের আয়োজন করবে চিনা কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিসি)। তার আগে মুঠো শক্ত করতে আরও ‘স্বৈরাচারী’ হয়ে ওঠার অভিযোগ উঠল প্রেসিডেন্ট তথা চেয়ারম্যান শি জিনপিঙের বিরুদ্ধে।
ড্রাগনভূমিতে ডামাডোল! শুদ্ধিকরণের নামে আচমকাই কেন্দ্রীয় কমিটির ৩৩ জন সদস্যকে ‘গলাধাক্কা’। চাকরি গেল ফৌজের ১৬ জন আধিকারিকেরও। কুর্সি হারানোর ভয়ে মুঠো শক্ত করছেন মান্দারিনভাষী ‘স্বৈরাচারী’ প্রেসিডেন্ট? ক্ষমতা ধরে রাখতে তাঁরই নির্দেশে এক এক করে উপড়োনো হচ্ছে ‘পথের কাঁটা’? চক্রান্তের গন্ধ মেলায় উত্তরের প্রতিবেশীর ঘরে সজাগ দৃষ্টি রাখছে নয়াদিল্লিও।
চলতি বছরের ২৬-২৯ অক্টোবর পঞ্চম ‘প্লেনারি সেশন’-এর (পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন) আয়োজন করে চিনা কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিসি)। বেজিঙের একটি হোটেলে চার দিন ধরে চলে সেই দলীয় কর্মসূচি। সেখানে রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে কেন্দ্রীয় কমিটির ৩৩ জন সদস্যকে বহিষ্কার করেন সিপিসির চেয়ারম্যান তথা ড্রাগনভূমির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এদের মধ্যে ১৬ জন সামরিক কর্তা।
‘প্লেনারি সেশন’ শেষে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদের বহিষ্কারের কারণ ব্যাখ্যা করে বিবৃতি দেয় সিপিসি। সেখানে বলা হয়েছে, ‘দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ’ এবং নানাবিধ ‘বেআইনি’ কাজে জড়িত থাকার কারণে কেন্দ্রীয় কমিটির ওই ৩৩ সদস্যকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন চেয়ারম্যান শি। এই পদক্ষেপ তাঁর দুর্নীতি-বিরোধী শুদ্ধিকরণ অভিযানের অংশ, যেটা গত কয়েক বছর ধরে চলছে ড্রাগনভূমিতে।
চিনা কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যসংখ্যা ৩৭৬। এঁদের মধ্যে ২০৫ জনের পূর্ণাঙ্গ এবং ১৭১ জনের বিকল্প সদস্যপদ রয়েছে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, পঞ্চম ‘প্লেনারি’তে এঁদের মধ্যে হাজির ছিলেন ২৭৯ জন। সিপিসির পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের নিরিখে এই উপস্থিতির হার সর্বনিম্ন। গত বছরের (২০২৫) অক্টোবরে চতুর্থ ‘প্লেনারি’তে হাজির ছিলেন ৩১৫ জন।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে তৃতীয় পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের আয়োজন করে সিপিসি। তাতে উপস্থিত ছিলেন ৩৬৪ জন। চিনা কমিউনিস্ট পার্টির বিভিন্ন শাখার মধ্যে কেন্দ্রীয় কমিটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একে সংগঠনের নীতি নির্ধারণকারী অংশ বলা যেতে পারে। কেন্দ্রীয় কমিটি আবার কয়েকটি ভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষমতাশালী হল পলিটব্যুরো এবং স্ট্যান্ডিং কমিটি।
আরও পড়ুন:
আগামী বছর (২০২৭ সাল) ২১তম জাতীয় কংগ্রেসের আয়োজন করবে চিনা কমিউনিস্ট পার্টি। বেজিঙের ‘প্লেনারি সেশনে’ সেই সিদ্ধান্তে সিলমোহর দিয়েছে সিপিসির কেন্দ্রীয় কমিটি। এ-হেন গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে প্রায় ১০০ সদস্যের হাজিরা না থাকায় ভুরু কুঁচকেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ। তবে কি চেয়ারম্যান জিনপিঙের নেতৃত্ব মানতে সমস্যা হচ্ছে তাঁদের?
প্রতি পাঁচ বছর অন্তর জাতীয় কংগ্রেসের আয়োজন করে থাকে সিপিসি। সেখানেই নির্বাচিত হন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যেরা। পাশাপাশি, দেশের প্রেসিডেন্ট পদে কে থাকবেন, তা-ও একরকম পরিষ্কার হয়ে যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, বর্তমানে দল ও প্রশাসনের যাবতীয় ক্ষমতা ধরে রাখার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন জিনপিং। আর তাই এখন থেকে ঘুঁটি সাজাতে হচ্ছে তাঁকে।
পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির একাংশের দাবি, সিপিসিতে শি-র বিরোধীর সংখ্যা নেহাত কম নয়। জিনপিঙের হাতে যাবতীয় ক্ষমতা থাকা নিয়ে প্রবল আপত্তি রয়েছে তাঁদের। আর তাই দলের অভ্যন্তরে চেয়ারম্যানের ‘ডানা ছাঁটতে’ চাইছেন তাঁরা। সে ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট থাকলেও বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না শি। সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে দলীয় সিলমোহরের অপেক্ষা করতে হবে তাঁকে।
সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে মুখ খুলেছেন অনাবাসী চিনা গবেষক চং জা ইয়ান। তাঁর কথায়, ‘‘ক্ষমতাকে আরও সুসংহত করতে এক এক করে সমস্ত বিরোধীকে রাস্তা থেকে সরাচ্ছেন জিনপিং। আমৃত্যু চেয়ারম্যান ও প্রেসিডেন্ট, দু’টি পদই আঁকড়ে থাকার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। কিন্তু, সে ব্যাপারে নিরাপদ বোধ না করা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট অভিযান শি চালিয়ে যাবেন বলেই মনে হচ্ছে।’’
আরও পড়ুন:
সামরিক বিশেষজ্ঞদের আবার দাবি, শৃঙ্গলাভঙ্গ এবং শুদ্ধিকরণের নামে এ ভাবে একের পর এক পদস্থ কর্তাকে ছেঁটে ফেলে চিনের ‘পিপল্স লিবারেশন আর্মি’ বা পিএলএ-কে ভিতর থেকে দুর্বল করছেন জিনপিং। এতে বাহিনীতে নেতৃত্বের সঙ্কট তৈরি হওয়া একেবারেই অসম্ভব নয়। আর তাই ড্রাগনভূমিতে সামরিক অভ্যুত্থানের ‘কালো মেঘ’ ঘনিয়ে ওঠার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না কেউই।
সংবাদসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের অগস্টের শেষ সপ্তাহে পিএলএ-র এই তিন শীর্ষ অফিসারকে ‘তাড়িয়ে’ দেন প্রেসিডেন্ট শি। তাঁরা হলেন, ঝাও জ়ঙ্গকি, ঝ্যাং ইউশিয়া এবং লিউ ঝেনলি। এঁদের মধ্যে প্রথম জন ডোকলাম এবং গলওয়ান সংঘাতের ‘মাস্টারমাইন্ড’। ভারতীয় ফৌজকে ‘শিক্ষা’ দিতে গিয়ে এ বার নিজেই প্যাঁচে পড়েছেন তিনি।
এই ঘটনার পর পিএলএ-কে নিয়ে প্রকাশ্যে আসে মার্কিন গবেষণা সংস্থা (পড়ুন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক) ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ়’-এর একটি রিপোর্ট। তাদের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে লালফৌজের শতাধিক উচ্চপদস্থ অফিসারকে বরখাস্ত করেছেন জিনপিং। তাঁদের বড় অংশই বর্তমানে নিখোঁজ। সব মিলিয়ে সংখ্যাটা ১০১ বা তার আশপাশে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ওই প্রতিষ্ঠান।
মার্কিন থিঙ্ক ট্যাঙ্কটির দাবি, শি সরকারের এ-হেন পদক্ষেপে চিনা লালফৌজে দেখা গিয়েছে নেতৃত্বের সঙ্কট। কারণ, এর জেরে আচমকা ৫২ শতাংশ শীর্ষ অফিসারকে হারিয়ে ফেলেছে পিএলএ। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, সংশ্লিষ্ট পদগুলিতে রাতারাতি কাউকে নিয়োগও করছে না বেজিং। ফলে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হলে ড্রাগন যে সমস্যায় পড়তে পারে, তা বলাই বাহুল্য।
চৈনিক সৈন্যবাহিনীর কাঠামো অন্যান্য দেশগুলির মতো নয়। বেজিঙের লালফৌজ সেখানকার একমাত্র রাজনৈতিক দল ‘কমিউনিস্ট পার্টি অফ চায়না’ বা সিপিসি-র সামরিক শাখা। পিএলএ পরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রণ করে থাকে সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশন। সিপিসির কেন্দ্রীয় কমিটির অধীনে কাজ করতে হয় তাদের। সেই কমিটির মাথায় আবার রয়েছে পলিটব্যুরো, যার নেতৃত্ব দেন দলেরই জেনারেল সেক্রেটারি।
বর্তমানে জেনারেল সেক্রেটারি এবং সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের চেয়ারম্যান— দুই গুরুত্বপূর্ণ পদেই রয়েছেন প্রেসিডেন্ট শি। এ বছরের জুলাইয়ে একটি দলীয় সমাবেশে লালফৌজের অভ্যন্তরের দুর্নীতি পুরোপুরি সাফ করার কথা বলতে শোনা যায় তাঁকে। তার পরই প্রায় একসঙ্গে অপসারিত হন জেনারেল পদমর্যাদার তিন অফিসার। এঁদের মধ্যে দু’জন সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের সদস্যও ছিলেন।
সংবাদসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, গত ২৬ অগস্ট সিপিসি-র রাজনৈতিক উপদেষ্টামণ্ডলী বা ‘চাইনিজ় পিপল্স পলিটিক্যাল কনসালটেটিভ কনফারেন্স’ থেকে অপসারিত হন ঝাও। তাঁকে আরও দু’টি পদ থেকে সরিয়েছেন শি। তাঁর বিরুদ্ধে কোনও দুর্নীতির তদন্ত শুরু হয়েছে কি না, তা অবশ্য জানা যায়নি। বরখাস্ত হওয়ার পর থেকে তাঁকে প্রকাশ্যে দেখাও যাচ্ছে না বলে উঠেছে অভিযোগ।
অন্য দিকে, সর্বশেষ বহিষ্কারের ফলে প্রেসিডেন্ট শি-র তৃতীয় মেয়াদের কেন্দ্রীয় কমিটির অপসারিত সদস্যসংখ্যা ৫১-তে গিয়ে পৌঁছেছে, যেটা রেকর্ড। তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় মেয়াদে সেটা ছিল যথাক্রমে ৩৫ ও পাঁচ। এ ছাড়া, চলতি বছরের প্রথম ন’মাসে দলীয় কাঠামোর বিভিন্ন স্তর থেকে প্রায় ছ’লক্ষ ৮০ হাজার ‘কমরেডের’ বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে চিনের শীর্ষ দুর্নীতিদমন সংস্থা।
‘প্লেনারি সেশন’ শেষে সংবাদিক বৈঠকে সিপিসির শৃঙ্খলা কমিশনের পদস্থ কর্তা ঝাং ফুহাই বলেন, ‘‘অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা, আমলাতান্ত্রিক মনোভাব, ভোগবাদ এবং অপচয় ঠেকাতে ২০ লাখের বেশি দলীয় সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’’ শুদ্ধিকরণের ধুয়ো তুলে কি ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবেন জিনপিং? আগামী বছরের জাতীয় কংগ্রেসে মিলবে তার জবাব।